মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কিউবাকে জানিয়ে দিয়েছে, দেশটির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান আলোচনায়, কমিউনিস্ট শাসিত ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা এই ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ কিউবার শীর্ষ একজন নেতাকে সরিয়ে দেবে। তবে ৬৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা কমিউনিস্ট সরকার কাঠামো বহাল থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার প্রতিনিধিদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, প্রেসিডেন্টকে সরে যেতেই হবে। তবে পরবর্তী পদক্ষেপ কিউবাকেই নির্ধারণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো কাস্ত্রো পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইছে না। এই পরিবারের সদস্যরা এখনো দেশের মূল ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তারা শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি পরিবর্তন না করে, বরং তা নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার মতে, দিয়াজ-কানেলকে সরানো হলে কিউবায় অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের পথ খুলবে। কারণ তাকে কঠোরপন্থি হিসেবে দেখা হয়। যদি কিউবা এতে সম্মত হয়, তবে কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া এই আলোচনার পর এটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন।
এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের জন্য একটি প্রতীকী বিজয় হতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি মার্কিন জনগণকে দেখাতে পারবেন যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী একটি বামপন্থি সরকারের নেতাকে সরাতে সক্ষম হয়েছেন। একই কাজ তিনি ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও করেছেন। তবে এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক রক্ষণশীল কিউবান অভিবাসীর কাছে যথেষ্ট নাও হতে পারে। তারা কিউবার পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায় এবং কংগ্রেসের কিউবান-আমেরিকান আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার চাপ দিতে পারেন। মার্কিন আলোচকরা কিউবার আরও কিছু প্রবীণ কর্মকর্তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বলছে। এসব কর্মকর্তা ফিদেল কাস্ত্রোর আদর্শে বিশ্বাসী। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিও জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই আলোচনার লক্ষ্য হলো কিউবাকে ধীরে ধীরে মার্কিন ব্যবসা ও কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা, পাশাপাশি ট্রাম্পের জন্য কিছু রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করা। কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-কানেল ২০১৮ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর তিনিই প্রথম নেতা, যার পদবি কাস্ত্রো নয়। তাকে সাধারণত একজন প্রতীকী নেতা হিসেবে দেখা হয়। কারণ প্রকৃত ক্ষমতা এখনো সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে রয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে কিউবায় কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়। তখন দিয়াজ-কানেল কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেন, যার মধ্যে গণগ্রেপ্তার ও কারাদ- অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিউবার সামরিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গাইসা পর্যটন ও খুচরা খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং অনেকের মতে, এর প্রভাব প্রেসিডেন্টের থেকেও বেশি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও মানবিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে দিয়াজ-কানেলকে সহজেই দায়ী করা সম্ভব। তাই তাকে সরানো একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্তাটি সরাসরি হুমকি হিসেবে নয়, বরং ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই আলোচনায় যুক্ত কিউবান প্রতিনিধিরাও স্বীকার করেছেন যে, তার নেতৃত্বে সমস্যা ছিল। তবে তারা এমনভাবে পরিবর্তন আনতে চান যাতে মনে না হয় ওয়াশিংটন হাভানাকে নির্দেশ দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, দিয়াজ-কানেল ক্ষমতায় থাকলে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়। ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর চাপ বাড়াতে বিদেশি তেল আমদানিও বন্ধ করেছে, যার ফলে দেশটি জ্বালানি সংকটে পড়েছে।
রাউল গিলার্মো রদ্রিগেজ কাস্ত্রো হলেন রাউল কাস্ত্রোর নাতি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিনি এবং মার্কো রুবিও-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন। দিয়াজ-কানেল নিজেও প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কথা স্বীকার করেছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, সরকার বা বিপ্লব দায়ী নয়, দায়ী হলো আমাদের ওপর আরোপিত জ্বালানি অবরোধ।
এই পরিস্থিতির মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং পুরো কিউবা অন্ধকারে ডুবে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি কিউবাকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সম্মান আমারই হবে। তবে এটি কূটনৈতিক না সামরিক উপায়ে হবে- সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেননি। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার মতো কিউবাতেও প্রেসিডেন্টকে সরানো, তবে এবার সামরিক শক্তি ব্যবহার না করে। এর আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে তাদের তেল খাত বেসরকারিকরণের প্রস্তাবও দিয়েছে। তবে এতে কিউবার ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়বে বলে তারা এতে অনীহা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষক রিকার্ডো জুনিগা বলেন, দিয়াজ-কানেলকে সরানো মূলত প্রতীকী হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শুধু প্রেসিডেন্টকে সরানো যথেষ্ট নয়- পুরো রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন প্রয়োজন। বর্তমানে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন তা স্পষ্ট নয়, তবে সম্ভাব্য নতুন নেতাদের সামনে আনার চেষ্টা চলছে। এদের মধ্যে অস্কার পেরেজ-ওলিভা ফ্রাগা, যিনি ফিদেল ও রাউল কাস্ত্রোর আত্মীয়, সম্প্রতি বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন।