ঢাকা ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চরম হতাশায় মুমিনের করণীয়

জীবন কখনোই শুধু সুখের সমষ্টি নয়। কখনো হাসি, কখনো কান্না; কখনো প্রাপ্তি, কখনো অপূর্ণতা; কখনো স্বস্তি, আবার কখনো এমন দুঃখ—যার ভারে মানুষ মনে করতে পারে, আর বুঝি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তখন কারো কারো মনে মৃত্যুর চিন্তা উঁকি দেয়। কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো—জীবন আমার নিজের সৃষ্টি নয়; এটি মহান আল্লাহর দেওয়া আমানত।
আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য রয়েছে।

আজকের অসহনীয় কষ্ট আগামী দিনের স্বস্তির দরজা খুলে দিতে পারে। যে রাতকে শেষ মনে হয়, তার পরেই আসে সকাল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।
’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত
মানুষ নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি। তার জন্ম, জীবন, স্বাস্থ্য, সময়—সবই আল্লাহর দান। তাই নিজের জীবন সম্পর্কে মানুষের দায়িত্বশীল হতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
মানুষের কাছে কোনো পথ বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর কাছে পথ কখনো বন্ধ হয় না।

দুঃখ-কষ্টে মুমিনের করণীয়
১. আল্লাহর কাছে নিজের কষ্ট উজাড় করে দিন : মানুষের কাছে সব কথা বলা যায় না। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কথা গোপন থাকে না। নিজের কষ্ট, কান্না, ভয়, হতাশা—সব তাঁর কাছে প্রকাশ করা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
তাই দুঃখের মুহূর্তে একাকী হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। সিজদায় গিয়ে নিজের ভাষায় কান্না করে বলুন, ‘হে আল্লাহ, আমি দুর্বল; আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণ করার শক্তি দিন।’
২. নামাজকে আশ্রয় বানান : কষ্টের সময় নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি মুমিনের আত্মিক আশ্রয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বিপদে পড়লে নামাজের দিকে মনোযোগী হতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩১৯)
তাই বিপদের সময় নামাজ ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং নামাজকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হবে।
৩. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন : বিপদের সময় মুমিনের মুখে থাকতে পারে,
‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৩)
এটি শুধু একটি বাক্য নয়; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার ঘোষণা। মানুষ যখন বলে, ‘আমি পারছি না’, তখন মুমিন বলে—‘আল্লাহ পারবেন।’
৪. বিপদের সময় এই দোয়া পড়ুন : উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোনো মুসলিম বিপদে পড়ে যদি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী দোয়া করে—
হে আল্লাহ! আমার বিপদের বিনিময়ে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।’ তাহলে আল্লাহ তাকে তার বিপদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দান করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)
কী অসাধারণ শিক্ষা! বিপদ শুধু কষ্টের কারণ নয়; ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর আস্থার মাধ্যমে সেটিই সওয়াব ও কল্যাণের কারণ হতে পারে।
৫. মনে রাখুন—কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে : আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জকভাবে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা : আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫-৬)
একই কথা পরপর দুবার বলা হয়েছে। অর্থাৎ মুমিনের জীবনের কষ্ট চিরস্থায়ী নয়। আজ যে সমস্যা অসহনীয় মনে হচ্ছে, কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর হয়তো সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। তাই সাময়িক কষ্টের কারণে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৬. আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না : মানুষ যত বড় গুনাহগারই হোক, যত গভীর সমস্যায়ই পড়ুক—আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য খোলা। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
তাই ‘আমার আর কোনো পথ নেই’—এমন চিন্তা একজন মুমিনের জন্য বিপজ্জনক। আমরা হয়তো পথ দেখতে পাচ্ছি না; কিন্তু আল্লাহ পথ দেখতে পাচ্ছেন।
আর রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর আসবেই। আর মুমিনের জীবনে দুঃখ যত গভীরই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও ব্যাপক। যে জীবনকে আজ বোঝা মনে হচ্ছে, আল্লাহ চাইলে সেই জীবনই আগামীকাল অন্যের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। তাই মৃত্যু নয়—আশা; হতাশা নয়—সবর; একাকিত্ব নয়—সহযোগিতা; আর মানুষের দরজা বন্ধ মনে হলে—আল্লাহর দরজায় ফিরে আসাই মুমিনের পথ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হতাশামুক্ত জীবন দান করুন। আমিন।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

চরম হতাশায় মুমিনের করণীয়

আপডেট সময় ১২:৪৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

জীবন কখনোই শুধু সুখের সমষ্টি নয়। কখনো হাসি, কখনো কান্না; কখনো প্রাপ্তি, কখনো অপূর্ণতা; কখনো স্বস্তি, আবার কখনো এমন দুঃখ—যার ভারে মানুষ মনে করতে পারে, আর বুঝি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তখন কারো কারো মনে মৃত্যুর চিন্তা উঁকি দেয়। কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো—জীবন আমার নিজের সৃষ্টি নয়; এটি মহান আল্লাহর দেওয়া আমানত।
আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য রয়েছে।

আজকের অসহনীয় কষ্ট আগামী দিনের স্বস্তির দরজা খুলে দিতে পারে। যে রাতকে শেষ মনে হয়, তার পরেই আসে সকাল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।
’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত
মানুষ নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি। তার জন্ম, জীবন, স্বাস্থ্য, সময়—সবই আল্লাহর দান। তাই নিজের জীবন সম্পর্কে মানুষের দায়িত্বশীল হতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
মানুষের কাছে কোনো পথ বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর কাছে পথ কখনো বন্ধ হয় না।

দুঃখ-কষ্টে মুমিনের করণীয়
১. আল্লাহর কাছে নিজের কষ্ট উজাড় করে দিন : মানুষের কাছে সব কথা বলা যায় না। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কথা গোপন থাকে না। নিজের কষ্ট, কান্না, ভয়, হতাশা—সব তাঁর কাছে প্রকাশ করা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
তাই দুঃখের মুহূর্তে একাকী হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। সিজদায় গিয়ে নিজের ভাষায় কান্না করে বলুন, ‘হে আল্লাহ, আমি দুর্বল; আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণ করার শক্তি দিন।’
২. নামাজকে আশ্রয় বানান : কষ্টের সময় নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি মুমিনের আত্মিক আশ্রয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বিপদে পড়লে নামাজের দিকে মনোযোগী হতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩১৯)
তাই বিপদের সময় নামাজ ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং নামাজকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হবে।
৩. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন : বিপদের সময় মুমিনের মুখে থাকতে পারে,
‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৩)
এটি শুধু একটি বাক্য নয়; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার ঘোষণা। মানুষ যখন বলে, ‘আমি পারছি না’, তখন মুমিন বলে—‘আল্লাহ পারবেন।’
৪. বিপদের সময় এই দোয়া পড়ুন : উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোনো মুসলিম বিপদে পড়ে যদি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী দোয়া করে—
হে আল্লাহ! আমার বিপদের বিনিময়ে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।’ তাহলে আল্লাহ তাকে তার বিপদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দান করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)
কী অসাধারণ শিক্ষা! বিপদ শুধু কষ্টের কারণ নয়; ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর আস্থার মাধ্যমে সেটিই সওয়াব ও কল্যাণের কারণ হতে পারে।
৫. মনে রাখুন—কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে : আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জকভাবে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা : আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫-৬)
একই কথা পরপর দুবার বলা হয়েছে। অর্থাৎ মুমিনের জীবনের কষ্ট চিরস্থায়ী নয়। আজ যে সমস্যা অসহনীয় মনে হচ্ছে, কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর হয়তো সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। তাই সাময়িক কষ্টের কারণে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৬. আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না : মানুষ যত বড় গুনাহগারই হোক, যত গভীর সমস্যায়ই পড়ুক—আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য খোলা। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
তাই ‘আমার আর কোনো পথ নেই’—এমন চিন্তা একজন মুমিনের জন্য বিপজ্জনক। আমরা হয়তো পথ দেখতে পাচ্ছি না; কিন্তু আল্লাহ পথ দেখতে পাচ্ছেন।
আর রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর আসবেই। আর মুমিনের জীবনে দুঃখ যত গভীরই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও ব্যাপক। যে জীবনকে আজ বোঝা মনে হচ্ছে, আল্লাহ চাইলে সেই জীবনই আগামীকাল অন্যের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। তাই মৃত্যু নয়—আশা; হতাশা নয়—সবর; একাকিত্ব নয়—সহযোগিতা; আর মানুষের দরজা বন্ধ মনে হলে—আল্লাহর দরজায় ফিরে আসাই মুমিনের পথ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হতাশামুক্ত জীবন দান করুন। আমিন।