গল্প
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
(হে নবী ) মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত। এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে।
১
: না এভাবে চলতে পারে না। এক ছাদের নীচে আর দু’জনের থাকা হবে না। সাজিদ মনে মনে এ কথা ভাবছে অনেক দিন থেকেই,কিন্তু সাকিলাকে মুখ ফুটে বলতে পারছে না। কারণ এখনো সে তাকে অনেক অনেক ভালোবাসে। সমীকরণ মিলাতে গিয়ে ফলাফল তাই বলে। কিন্তু শরীর..
: ছি! নিজকে সে নিজেই ধিক্কার দেয়,, । এমন বিচ্ছিরি ভাবনা তার মতো স্মার্ট সম্ভ্রান্ত মানুষের জন্য খুবই বেমানান।
সাজিদ হারিয়ে যায় স্মৃতির পাতায়।
কী দারুণ আর দুরন্তই না ছিলো সেই দিনগুলো বিশ্বসুন্দরীর চেয়েও সুন্দর মতো হতো সাকিলাকে। তাকে ছাড়া একটি দিন একটি রাত না.. সে আর ভাবতে পারছে না…।
সাকিলা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজেকে পরিপাটি করছে।
বিছানায় শুয়ে আয়নাতে সাজিদ তার প্রিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখছে। আল্লাহতায়ালা যেন তাকে নিজ হাতে অনেক যতœ করে গড়েছেন। সাজিদ কোথাও একটু খুঁত খুৃজে পায় না। তার কাছে মনে হয় সে আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দরী হয়েছে। তারপরও তার মন তাকে আগের মতো করে …। কেন কাছে টানতে পারে না? অথচ সাকিলা যখন ছিলো নববধূ। একটুও তর সই তো না, পরিপাটি হয়ে সাজার সময়টুকু দিতে চাই তো না। এখন তাহলে সমস্যটা কোথায়? সে কী তাহলে নিজেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে.. না তা কী করে হয়? সে যদি নিঃশেষই হবে, না অংক মিলছে না। কারণ পাপী , মানে পাপিয়াকে দেখলে তার শরীরে বিদ্যুতের তরঙ্গ জাগে কেন? তাই তো অফিসের অন্য সবাই পিউ কিংবা পাপু নামে পাপিয়াকেও ডাকলেও সাজিদ চুপিচুপি পাপি বলে ডাকে।
পাপিয়া মেয়েটি মিষ্টি এবং দুষ্টু। সাজিদের পাপি ডাকের অর্থ সে বুঝে। তাই তো মিষ্টি হেসে বলে,‘ কে পাপী, আমি না তুমি।
: আরে ধরলাম ছুইলাম না, আমি কেন পাপী হতে যাবো? সাজিদ প্রতিবাদ করে
: ধরার মতো সাহস তোমার থাকলে তো.., বলে ছিনানির হাসি হাসে পাপিয়া
: জাহেদ ভাইয়ের আমানত, আমি ছুইতে যাবো কোন সাহসে..
: ও তো একটা শয়তান,প্রতারক. ঠক…? তুমি সাহস করলে শয়তানটাকে ছুড়ে ফেলে দিবো, একা তো আর থাকা যায় না, তাই তোমার নিশ্চয়তা পাওয়ার আগে তো ডিভোর্স দিতে পারছি না..
: সত্যি তুমি পাপী…।’
: হ্যা আমি পাপী.. তোমরা পুরুষরা সাধু সন্ন্যাসী..।
পাপিয়ার সাথে আলাপচারিতার ছোট ছোট কথাগুলো মনে পড়তেই সাজিদের মনে দুষ্টু হাসির খেলা চলে, সে গুন গুন করে গেয়ে ওঠে: মনে মাঝে বাস করে কোন জনা ওদের পাগল মনা…
: কী মহামানব, সাধু পুরুষ? স্বপ্ন দেখছো নাকি? সাকিলার ডাকে সাজিদের ভাবনায় ছেদ পড়ে।
: হু খুব, ঘুম পাচ্ছে, অফিসে যা ধকল গেছে। ঘুম ঘুম ভান করে সাজিদ বলে।
সাকিলা ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে এসে সাজিদের মাথায় হাত রাখে। এই তো কিছু দিন আগেও এমন অবস্থায় সাজিদের মনের প্রেমতরঙ্গ কামের বান হয়ে আসতো, আজ তা আসছে না। আলতো করে হাতটা সরিয়ে নাক ডাকতে থাকতে। সাকিলার ঘুম আসছে না। সারা শরীরে ব্যথা। তার মনটা চাচ্ছে। অনেক আদর। ভালোবাসা আর আদরের স্পর্শে শান্তির ঘুম। সে ডিম লাইটের আলতো আলোয় সাজিদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটা কত ভালো, তাকে কত ভালোবাসে। সারা দিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই তো আগের মতো আদর করে তাকে ঘুম পারিয়ে দিতে পারে না। তার খুব ইচ্ছে করে এই ইট পাথরের শহর আর কাজের পাহাড় ছুড়ে ফেলে দিয়ে সাজিদকে নিয়ে দূরের কোন অচেনা দ্বীপে চলে যেতে, যেখানে থাকবে শুধু দু’জন মানব-মানবী। সাজিদ আর সাকিলা। না। সে আর ভাবতে পারে না। পাশের রুমে তাদের দু’জনের ভালোবাসার ধন আদরের সন্তান শাহেদ ঘুমাচ্ছে। সাকিলা আস্তে আস্তে ছেলের রুমে যায়। আলতো করে ছেলের মাথায় হাত বুলায়। মশারিটা ঠিক করে। চলে যায় ডাইনিং রুমে। টেবিলে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে পান করে। আবার নিজের রুমে চলে আসে। সাজিদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার খুব মায়া হয়। বিয়ের পরের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনের অজান্তে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে সাজিদের মুখের ওপর।
সাজিদের ঘুম ভেঙে যায়।
: তুমি এখনো জেগে আছো? সাকিলাকে প্রশ্ন করে সাজিদ?
: ঘুম আসছে না, তুমি ঘুমাও।
সাজিদ আলতো করে সাকিলাকে কাছে টেনে নেয়। সাথে সাথে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাপিয়ার মুখ নিজেকে বড় অসার আর অসহায় মনে হয়। সে ততই চেষ্টা করে ঐ অপছায়া দূর হয় না।
তার কানে বাজে পাপিয়ার ছিনানিপনা হাসি: সাহস থাকতে তো, ধরবে…। সাজিদ আরো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অন্যেিদক মুখ ঘুরিয়ে শোয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে সত্যি কি আমি পাপী, নাকি পাপিয়া অপরাধী।
না আমি কেন পাপী হব, পাপী তো জাহেদ, সে তার স্ত্রীকে.. সুখী করতে পারছেনা? পরক্ষণেই তার মনে পড়ে সে কি পারছে, তার স্ত্রী সাকিলাকে সুখী করতে।
আত্মপক্ষ সমর্থন করে সাজিদ: কে বলছে, পারছে না, কোন কিছুর তো অভাব দেয়নি। ধন,সম্পদ, সন্তান সবই দিয়েছে..।
৩
: আল্লাহ আমি তোমার এক অধম,গুনাহগার বান্দী। আমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও..।
সাজিদ আফসা আলোয় দেখে সাকিলা জায়নামাজে বসে মুনাজাত করছে। এটি তার নিয়মিত রুটিন যত দিন সে পবিত্র থাকে। নিয়মিত ফজরের আগে ওঠে তাহাজ্জদ পড়ে। ফজরের আজানের পর সাজিদকে ডেকে তুলে। শাহেদকেও ডাকে। নামাজের পর পরই সবার হাতে চা ও নাস্তা তুলে দেয়।
সাজিদ আজ পণ করেছে অফিস শেষে বন্ধুদের সাথে আড্ডা নয়। একজন মনোবিজ্ঞানীর সাথে দেখা করবে। তার সমস্যার কথা তাকে জানাবে। অফিস শেষে আড্ডার অভ্যাস আগে ছিলো না তার। সব সময় মনটা পড়ে থাকতো সাকিলার কাছে। কখন অফিস শেষ হবে, কত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে পারবে। কিন্তু ইদানিং কেন যেন আড্ডাই বেশি ভালো লাগে। সাকিলার ভালোবাসা আর আগে মতো তাকে টানে না। মাঝে মনে হয় বিয়েটা যদি পাপিয়ার সাথে হতো, কিন্তু কেন?
্এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সে আজ মনোবিজ্ঞানী মনির হাসানের চেম্বারে এসেছে।
সাজিদের সমস্যার কথা জানার পর মনির হাসান বলেন: আপনি ঠিক কাজ করেছেন। আসল জায়গায় এসেছেন।
: কেন? সাজিদ প্রশ্ন করে।
: কারণ আপনার সমস্যা শরীরে নয়, মনে। মনির হাসান বলেন।
: তাহলে আমাকে এখন কী করতে হবে?
: তেমন কিছু নয়। স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবার খাবেন। আর আপনি মুসলমান তো..
: হ্যা।
: পবিত্র কুরআন হাদীস পড়েন।
: মাঝে মাঝে
: নামাজ?
: চেষ্টা করি..
: তাহলে শুনুন, আর একটা কাজ করবেন?
: কী কাজ?
: পবিত্র কুরআনের সূরা নূরের একটি আয়াত আমি লিখে দিচ্ছি, এটি নিষ্ঠার সাথে মানবেন।
: ওষুধ
: লাগবে না, এটাই আমার প্রেসক্রিপশন। কথা শেষ করে তিনি আর প্যাডে লিখলেন,‘ (হে নবী) মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত। সূরা নূর:৩০। টানা এক মাস আল্লাহর এই নির্দেশ যথাযথভাবে অনুসরণ করবেন। তারপর আমার সাথে দেখা করবেন।
৪
সাজিদ মনোবিজ্ঞানী মনির হাসানের ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ করছে।
সে মনে প্রাণে আল্লাহর এ আদেশ পালন করছে। বিষয়টি আর কাছে বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। এ ব্যবস্থাপত্র মানলে সাকিলার প্রতি তার মন ও শরীরের টান আবার আগের মতো বাড়বে। ভালোবাসার বন্ধন এতটাই অটুট হবে যে ,অন্য কারো জন্য বিদ্যুৎ তরঙ্গ বাঁধ ভাঙবে না। সত্যি …।
অনেক কিছূই তার মনে হয়েছে। বাঁধ ভাঙার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সে খূব শক্তভাবে নিজেকে ঠিক রেখেছে।
১৫ দিন পর।
সাজিদ ইতোবাচক ফলাফল পেতে থাকে। তার আর তর সয় না। সে মনোবিজ্ঞানী মনির হায়দারের চেম্বারে আসে।
: কী ব্যাপার ,এক মাস তো হয়নি। এত তাড়াতাড়ি এলেন যে..
: না ,কাজ হয়ে গেছে।
: কী কাজ হয়েছে?
: সমস্যা কেটে গেছে? কিন্তু কীভাবে সম্ভব জানতে ইচ্ছে করছে..
: মনোবিজ্ঞানের এ জটিল বিষয় জেনে কি করবেন, কাজ হয়ে গেছে খুশী থাকুন
: তা ঠিক তারপরও জানতে চাই। বলে সাজিদ।
তাহলে বলছি শুনেন: মাটির তৈরির এ শরীরের মধ্যে আমাদের আমাদের মনের বসবাস। মনটা কোথায় থাকে তা বিজ্ঞানীরা এখনো নির্ণয় করতে পারেননি। অনেকে মনে করেন, মনের বসবাস হৃদয়ে আর কারো অভিমত মস্তিকে। কিন্তু এমন কোন যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি যা দিয়ে মন দেখা যায়, দেখানো যায়। তাই এটিকে বলা হয় মনোরাসায়নিক বিক্রিয়া। মনকে আত্মার অংশও মনে করা হয়। আত্মা যেমন দেখা যায় না। মনও দেখা যায় না। কিন্তু এর অস্তিত্ব আছে এবং তা খুবই শক্তিশালী। ধর্মতাত্ত্বিকরা বলেন, আমাদের এ মাটির দেহের বাইরেও একটি দেহ আছে যা আলোর মতো অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী। আমি মনে করি বিজ্ঞানীরা যাকে মনোরাসায়নিক বলে মনে করেন. ধর্মতাত্ত্বিকরা তাকেই আলো বা আত্মার অংশ বলেছেন। মানুষের মনের গতি মাটির দেহকেও গতিশীল করে। আপনি যখন অন্য কোন নারীর দিকে তাকিয়ে তাকে নিয়ে ভালো কিংবা মন্দ কিছূ কল্পনা করেন। আপনার আলোর তৈরি দেহটি তার আলোর তৈরি দেহে সেই কল্পনার বাস্তায়ন ঘটায়। এমি ভাবে কোন পর্নচিত্র, সিনেমায় যা দেখেন তাও মনের ভিতর চলতে থাকে। সেই প্রক্রিয়া দেহেও সঞ্চারিত হয়। এভাবে আপনার মন পরনারী সংস্পর্শে ক্লান্ত ও কলুষিত হয়। সেই কলুষতা ও ক্লান্তি দেহে এসে ভর করে। এভাবেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব রাড়তে থাকে। কারণ অজান্তে কলুষিত মনের মাঝে বসত করতে শুরু করেছে আরেকজনা। সেই আরেকজনার টানে সংসারে চলে বিচ্ছেদ ও ভাঙা-গড়ার খেলা।
: তাহলে উপায় সাজিদ প্রশ্ন করে।
মনির হাসান আবার শুরু করেন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের যে আদেশ আমি আপনার সমস্যার সমাধানে প্রেসক্রিপশনে লিখেছি তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা।
: কোন আদেশ?
: ‘(হে নবী) মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত। এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে, যা আপনিই প্রকাশ পায় তা ছাড়া এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয় এবং নিজেদের ভূষণ যেন স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনেয়, আপন নারীগণ, যারা নিজ মালিকানাধীন, যৌনকামনা নেই এমন পুরুষ খেদমতগার এবং নারীদের গোপনীয় অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া আর কারও সামনে প্রকাশ না করে। মুসলিম নারীদের উচিত ভূমিতে এভাবে পদক্ষেপ না করা, যাতে তাদের গুপ্ত সাজ জানা হয়ে যায়। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা কর, আশা করা যায় সফলতা অর্জন করবে।’
মনোবিজ্ঞানী মনির হাসানের কথা শুনে সাজিদের দু’চোখ ভারী হয়ে ওঠে। সে ভাবে মানব সভ্যতাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে আল্লাহর এ আদেশের অনুসণ করা কতই জরুরি..।
মনোবিজ্ঞানী মনির হাসানের চেম্বার থেকে বের হয়ে সাজিদ মুক্ত বাতাসে মন ভরে শ্বাস নেয়।
: আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর …. মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনিতে তার মনে অন্য রকম ভালোবাসা জাগে। মনের মাঝে বসত করা অন্যজনা… পাপী পাপিয়ারা হারিয়ে যায় দূরে বহু দূরে ..।
হারুন ইবনে শাহাদাত 
























