ঢাকা ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo নেত্রকোনা হাওরাঞ্চলের হাটবাজারে ধানের চারা ব্যাপক চাহিদা Logo জামালপুরে প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ বঞ্চিত ৫১ জন আমরণ অনশনে Logo খাল খনন নামে ৩০ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ Logo অফিস বন্ধ করে সদস্যদের তিন কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন সমিতির সভাপতি Logo টুঙ্গিপাড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান গাঁজা সেবনে ১ মাস, ইয়াবা সেবনে ৩ মাসের কারাদন্ড Logo গাইবান্ধায় প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে মানববন্ধন Logo কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে ফ্রেন্ডশিপের ভেড়া বিতরণ Logo তাড়াশে অতিরিক্ত টাকা দিলেই মিলছে গুদামজাত সার Logo ধনবাড়ীতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বৃক্ষরোপণ অভিযান Logo ৯ প্রতারক গ্রেফতার, উদ্ধার নগদ টাকা-২০ সিম-১১ মোবাইল

ট্রাস্টিদের অর্থ লোপাট বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ

বাংলাদেশে অনাথ, অসহায় শিশুদের শিক্ষা, আশ্রয় ও নৈতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বৌদ্ধ বিহার বা আশ্রম কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিশু সদন। পার্বত্য চট্রল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, মোনঘর শিশু সদন, কাচালং শিশু সদন এসবেরই এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মোনঘর শিশু সদনের প্রতিষ্ঠাতা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে ১৯৯০ সালে গড়ে তোলেন বনফুল শিশু সদন ও বনফুল প্রাথমিক বিদ্যালয়। নানাবিধ চক্রান্তের কারণে শিক্ষা নিয়ে আজীবন কাজ করা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর একটি সুন্দর উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যাবসিত হয়। সাময়িকভাবে হেরে গেলেও থেমে যাননি সন্ন্যাসী ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো। গঠন করেন ‘বনফুল আদিবাসী ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’ এবং ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন ‘বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ’। শিশু সদনের মতোই এক শ্রেণির সুবিধাভোগী কলেজটির সূচনালগ্নে তৈরি করে নানাবিধ বাধা বিপত্তি। সকল ষড়যন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলে আলোর মুখ দেখে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ। দীর্ঘ প্রায় দু’যুগের পথ চলায় কলেজটি রাজধানীর সেরা কলেজগুলো কাতারে নাম লেখানোর পাশাপাশি জয় করে নেয় বৃহত্তর মিরপুরবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, মানসম্মত পাঠদানের মাধ্যমে এগিয়ে চলা বনফুল কলেজটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। আনুপাতিক হারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পায় ফলে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতনাদি দিতেও হিমশিম খেতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, একটি সফল কলেজকে বর্তমান রূগ্ন অবস্থায় এনে দাঁড় করানোর পেছনে কাজ করেছে কয়েকজন ট্রাস্টির অতি লোভ, অসহযোগিতা, অর্থ আত্মসাৎ ও স্বেচ্ছাচারিতার মতো নানাবিদ ঘটনা।
▪ ট্রাস্টিদের অর্থ লোপাট
অভিযোগকারীরা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন,চড়াই উতরাই পেরিয়ে কলেজটি যখন সফলতার মুখ দেখে ঠিক তখনই কলেজটির আয়ের উপর কুনজর দেয় ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমনি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান ও কামনা দেওয়ান।
সূত্রে প্রকাশ, প্রধান ট্রাস্টি ২০১৪ সালে তার নির্ধারিত সফরের অংশ হিসেবে কানাডা ও আমেরিকা সফরে যান। তারা প্রধান ট্রাস্টির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি সভা আহবান করেন এবং সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে নিজেদের পদপদবি বন্টন করে তার বিপরীতে বেতন গ্রহণের রীতি চালু করেন। এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, প্রসেনজিৎ চাকমা নিজের পদবি উল্লেখ করেন অর্থ ও নিয়োগ বিষয়ক পরিচালক, ধনমনি চাকমার পদবি বাজেট ব্যবস্থাপনা, রিয়েল দেওয়ানের পদবি উন্নয়ন এবং আইন বিষয়ক পরিচালক, কামনা দেওয়ানের পদবি হোস্টেল ও নারী বিষয়ক পরিচালক এবং বছরখানেক আগে ট্রাস্টি হিসেবে আসা কল্যাণ মিত্র চাকমার পদবি দেখানো হয় অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক পরিচালক। প্রধান ট্রাস্টি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো ও ট্রাস্টি প্রীতিময় চাকমার নামের পাশেও রাখা হয় আলাদা দুটি পদবি। যদিও প্রধান ট্রাস্টি দেশের ট্রাস্ট আইন বিবেচনায় অদ্যবধি এ ধরনের অবৈধ কোন রেজুলেশনে তার সম্মতি বা স্বাক্ষর করেননি। অর্থাৎ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দেশের প্রচলিত ট্রাস্ট আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের কাজটি নির্বিঘেœই চালিয়ে যাচ্ছিলো ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমনি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান, কামনা দেওয়ান ও কল্যাণমিত্র চাকমা।
যদিও অন্য দু’জন ট্রাস্টির দাবী তারা চুক্তি অনুযায়ী সার্বক্ষণিক শ্রমের বিনিময়ে বেতন বা সম্মানী গ্রহণ করছেন। মূলত: প্রধান ট্রাস্টির অনুপস্থিতিতে করা রেজুলেশনের সাথে তাদের পারিশ্রমিক গ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে বাস্তবতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা দীর্ঘদিন প্রবাসে চাকরি করছেন, ধনমনি চাকমা বনফুল কলেজের পাশেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ট্রাস্টি রিয়েল দেওয়ান, কামনা দেওয়ান ও কল্যাণ মিত্রকেও কোনরূপ কর্মসূত্রে বনফুল কলেজের সাথে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জানা যায়, প্রধান ট্রাস্টি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছেন ট্রাস্টিদের অনৈতিক অর্থ আত্মসাৎ বন্ধের কিন্তু নানামুখী চাপ আর হুমকি ধমকির কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যখনই ট্রাস্টিদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করা হয়েছে তখনই কলেজটিকে পড়তে হয়েছে নানামুখী চক্রান্তের চাপে। ইতোমধ্যে এসকল ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন কলেজের শিক্ষকÑশিক্ষিকাগণ। সংশ্লিষ্টরা থানায়ও অভিযোগ করেছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
সম্প্রতি বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের অর্থ লোপাটের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয় দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী কয়েকজন ট্রাস্টি কলেজের তহবিল থেকে গত এক দশকে অবৈধভাবে নিয়ে গেছে প্রায় ৪ কোটি টাকার উপরে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর খোদ রাজধানীতে একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এরূপ অর্থ লোপাটের বিষয়টি নজরে আসে শিক্ষাবোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। নড়েচড়ে বসে কলেজের গভর্নিংবডি। সময় মতো বেতন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত শিক্ষক, কর্মচারীগণ এ নিয়ে প্রতিবাদমুখর হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবরে পত্র মারফত অভিযোগ দেন একজন সম্মানিত অভিভাবক। তিনি একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে সন্তানের প্রিয় ক্যাম্পাসটিকে ট্রাস্টিদের লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা করতে বোর্ড চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ নিয়ে কথা হয় দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এমএনআরএস ট্রাস্টের সদস্য লে. কর্নেল মোস্তফা কামালউদ্দিন ভূঁইয়া (অব.) এর সাথে। তিনি জানান, ‘ট্রাস্টিরা যদি এরূপ পদপদবি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের টাকা তছরূপ করে তবে তা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ বলে বিবেচিত হবে। এটা কোনভাবেই সমর্থন যোগ্য না’।
▪ তদন্ত কমিটি গঠন
গত ৬ জুলাই ২০২৬, সার্বিক বিবেচনায় জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সমন্বয় করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটি তাদের লিখিত প্রতিবেদন পেশ করেন। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে সময় মতো বেতন না পেয়ে শিক্ষক, কর্মচারীদের অসহায়ত্বের কথা যেমন এসেছে তেমনি সুপারিশ করা হয়েছে কলেজ তহবিল থেকে যে কোন ধরনের অর্থ অপচয় ও অর্থ লোপাট বন্ধের। কলেজের হিসাব শাখা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেও এরূপ অসহায়ত্বের বিষয়টি জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের হিসাব শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, ‘কয়েকজন ট্রাস্টির অনিয়ম আর স্বেচ্ছারিতার কারণে কলেজটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে ফলে শিক্ষকদের বেতন দিতে কষ্ট হচ্ছে, গত মাসের বেতন দিতেও অনেক দেরি হয়েছে। অথচ ট্রাস্টিরা নানা পদপদবির বিপরীতে মোটা অংকের টাকা সবার আগেই তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাস্টিরা স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষমতাধর হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরে থাক কথা বলাও বিপদের।’
▪ অর্থ লোপাট বন্ধের উদ্যোগ
অবশেষে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের অবৈধভাবে অর্থ লোপাট বন্ধে শক্তভাবে উদ্যোগী হয়েছেন কলেজটির গভর্নিংবডি। আগস্টের শুরু দিকে গভর্নিংবডির নিয়মিত সভায় সকল সদস্যের ঐক্যবদ্ধ সম্মতিতে ট্রাস্টিদের যে কোন ধরনের অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি কার্য বিবরণী আমাদের হাতে এসেছে। আমাদের হাতে থাকা ডকুমেন্ট অনুযায়ী গত মে মাসেও ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমনি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান, কামনা দেওয়ান ও কল্যাণমিত্র চাকমা প্রত্যেকেই ৫০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কলেজ তহবিল থেকে তুলে নিয়েছে। শিক্ষক কর্মচারীদের বঞ্চিত করে এভাবে ট্রাস্টিদের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে গভর্নিংবডির সভাপতি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো জানান, ‘আমি কোন প্রকার অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে সমর্থন করি না। ট্রাস্টিগণ অবশ্যই দেশের প্রচলিত ট্রাস্ট বিধি মেনে চলবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বনফুল আদিবাসী ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিলো একটি সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে। আমাদের চিন্তায় ছিলো অরাজনৈতিক ও অলাভজনক ধারণা। আমার বিশ^াস, ট্রাস্টিরা অবশ্যই নিয়মের মধ্যেই চলবেন।’

 

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

নেত্রকোনা হাওরাঞ্চলের হাটবাজারে ধানের চারা ব্যাপক চাহিদা

ট্রাস্টিদের অর্থ লোপাট বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ

আপডেট সময় ০৬:১৬:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে অনাথ, অসহায় শিশুদের শিক্ষা, আশ্রয় ও নৈতিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বৌদ্ধ বিহার বা আশ্রম কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিশু সদন। পার্বত্য চট্রল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম, মোনঘর শিশু সদন, কাচালং শিশু সদন এসবেরই এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মোনঘর শিশু সদনের প্রতিষ্ঠাতা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে ১৯৯০ সালে গড়ে তোলেন বনফুল শিশু সদন ও বনফুল প্রাথমিক বিদ্যালয়। নানাবিধ চক্রান্তের কারণে শিক্ষা নিয়ে আজীবন কাজ করা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর একটি সুন্দর উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যাবসিত হয়। সাময়িকভাবে হেরে গেলেও থেমে যাননি সন্ন্যাসী ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো। গঠন করেন ‘বনফুল আদিবাসী ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’ এবং ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন ‘বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ’। শিশু সদনের মতোই এক শ্রেণির সুবিধাভোগী কলেজটির সূচনালগ্নে তৈরি করে নানাবিধ বাধা বিপত্তি। সকল ষড়যন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলে আলোর মুখ দেখে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ। দীর্ঘ প্রায় দু’যুগের পথ চলায় কলেজটি রাজধানীর সেরা কলেজগুলো কাতারে নাম লেখানোর পাশাপাশি জয় করে নেয় বৃহত্তর মিরপুরবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, মানসম্মত পাঠদানের মাধ্যমে এগিয়ে চলা বনফুল কলেজটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। আনুপাতিক হারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পায় ফলে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতনাদি দিতেও হিমশিম খেতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, একটি সফল কলেজকে বর্তমান রূগ্ন অবস্থায় এনে দাঁড় করানোর পেছনে কাজ করেছে কয়েকজন ট্রাস্টির অতি লোভ, অসহযোগিতা, অর্থ আত্মসাৎ ও স্বেচ্ছাচারিতার মতো নানাবিদ ঘটনা।
▪ ট্রাস্টিদের অর্থ লোপাট
অভিযোগকারীরা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন,চড়াই উতরাই পেরিয়ে কলেজটি যখন সফলতার মুখ দেখে ঠিক তখনই কলেজটির আয়ের উপর কুনজর দেয় ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমনি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান ও কামনা দেওয়ান।
সূত্রে প্রকাশ, প্রধান ট্রাস্টি ২০১৪ সালে তার নির্ধারিত সফরের অংশ হিসেবে কানাডা ও আমেরিকা সফরে যান। তারা প্রধান ট্রাস্টির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি সভা আহবান করেন এবং সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে নিজেদের পদপদবি বন্টন করে তার বিপরীতে বেতন গ্রহণের রীতি চালু করেন। এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, প্রসেনজিৎ চাকমা নিজের পদবি উল্লেখ করেন অর্থ ও নিয়োগ বিষয়ক পরিচালক, ধনমনি চাকমার পদবি বাজেট ব্যবস্থাপনা, রিয়েল দেওয়ানের পদবি উন্নয়ন এবং আইন বিষয়ক পরিচালক, কামনা দেওয়ানের পদবি হোস্টেল ও নারী বিষয়ক পরিচালক এবং বছরখানেক আগে ট্রাস্টি হিসেবে আসা কল্যাণ মিত্র চাকমার পদবি দেখানো হয় অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক পরিচালক। প্রধান ট্রাস্টি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো ও ট্রাস্টি প্রীতিময় চাকমার নামের পাশেও রাখা হয় আলাদা দুটি পদবি। যদিও প্রধান ট্রাস্টি দেশের ট্রাস্ট আইন বিবেচনায় অদ্যবধি এ ধরনের অবৈধ কোন রেজুলেশনে তার সম্মতি বা স্বাক্ষর করেননি। অর্থাৎ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দেশের প্রচলিত ট্রাস্ট আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের কাজটি নির্বিঘেœই চালিয়ে যাচ্ছিলো ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমনি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান, কামনা দেওয়ান ও কল্যাণমিত্র চাকমা।
যদিও অন্য দু’জন ট্রাস্টির দাবী তারা চুক্তি অনুযায়ী সার্বক্ষণিক শ্রমের বিনিময়ে বেতন বা সম্মানী গ্রহণ করছেন। মূলত: প্রধান ট্রাস্টির অনুপস্থিতিতে করা রেজুলেশনের সাথে তাদের পারিশ্রমিক গ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে বাস্তবতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা দীর্ঘদিন প্রবাসে চাকরি করছেন, ধনমনি চাকমা বনফুল কলেজের পাশেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ট্রাস্টি রিয়েল দেওয়ান, কামনা দেওয়ান ও কল্যাণ মিত্রকেও কোনরূপ কর্মসূত্রে বনফুল কলেজের সাথে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জানা যায়, প্রধান ট্রাস্টি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছেন ট্রাস্টিদের অনৈতিক অর্থ আত্মসাৎ বন্ধের কিন্তু নানামুখী চাপ আর হুমকি ধমকির কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যখনই ট্রাস্টিদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করা হয়েছে তখনই কলেজটিকে পড়তে হয়েছে নানামুখী চক্রান্তের চাপে। ইতোমধ্যে এসকল ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন কলেজের শিক্ষকÑশিক্ষিকাগণ। সংশ্লিষ্টরা থানায়ও অভিযোগ করেছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
সম্প্রতি বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের অর্থ লোপাটের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয় দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী কয়েকজন ট্রাস্টি কলেজের তহবিল থেকে গত এক দশকে অবৈধভাবে নিয়ে গেছে প্রায় ৪ কোটি টাকার উপরে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর খোদ রাজধানীতে একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এরূপ অর্থ লোপাটের বিষয়টি নজরে আসে শিক্ষাবোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। নড়েচড়ে বসে কলেজের গভর্নিংবডি। সময় মতো বেতন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত শিক্ষক, কর্মচারীগণ এ নিয়ে প্রতিবাদমুখর হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবরে পত্র মারফত অভিযোগ দেন একজন সম্মানিত অভিভাবক। তিনি একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে সন্তানের প্রিয় ক্যাম্পাসটিকে ট্রাস্টিদের লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা করতে বোর্ড চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ নিয়ে কথা হয় দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এমএনআরএস ট্রাস্টের সদস্য লে. কর্নেল মোস্তফা কামালউদ্দিন ভূঁইয়া (অব.) এর সাথে। তিনি জানান, ‘ট্রাস্টিরা যদি এরূপ পদপদবি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের টাকা তছরূপ করে তবে তা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ বলে বিবেচিত হবে। এটা কোনভাবেই সমর্থন যোগ্য না’।
▪ তদন্ত কমিটি গঠন
গত ৬ জুলাই ২০২৬, সার্বিক বিবেচনায় জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সমন্বয় করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটি তাদের লিখিত প্রতিবেদন পেশ করেন। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে সময় মতো বেতন না পেয়ে শিক্ষক, কর্মচারীদের অসহায়ত্বের কথা যেমন এসেছে তেমনি সুপারিশ করা হয়েছে কলেজ তহবিল থেকে যে কোন ধরনের অর্থ অপচয় ও অর্থ লোপাট বন্ধের। কলেজের হিসাব শাখা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেও এরূপ অসহায়ত্বের বিষয়টি জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের হিসাব শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, ‘কয়েকজন ট্রাস্টির অনিয়ম আর স্বেচ্ছারিতার কারণে কলেজটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে ফলে শিক্ষকদের বেতন দিতে কষ্ট হচ্ছে, গত মাসের বেতন দিতেও অনেক দেরি হয়েছে। অথচ ট্রাস্টিরা নানা পদপদবির বিপরীতে মোটা অংকের টাকা সবার আগেই তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাস্টিরা স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষমতাধর হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরে থাক কথা বলাও বিপদের।’
▪ অর্থ লোপাট বন্ধের উদ্যোগ
অবশেষে বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের অবৈধভাবে অর্থ লোপাট বন্ধে শক্তভাবে উদ্যোগী হয়েছেন কলেজটির গভর্নিংবডি। আগস্টের শুরু দিকে গভর্নিংবডির নিয়মিত সভায় সকল সদস্যের ঐক্যবদ্ধ সম্মতিতে ট্রাস্টিদের যে কোন ধরনের অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি কার্য বিবরণী আমাদের হাতে এসেছে। আমাদের হাতে থাকা ডকুমেন্ট অনুযায়ী গত মে মাসেও ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা, ধনমনি চাকমা, রিয়েল দেওয়ান, কামনা দেওয়ান ও কল্যাণমিত্র চাকমা প্রত্যেকেই ৫০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কলেজ তহবিল থেকে তুলে নিয়েছে। শিক্ষক কর্মচারীদের বঞ্চিত করে এভাবে ট্রাস্টিদের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে গভর্নিংবডির সভাপতি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো জানান, ‘আমি কোন প্রকার অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে সমর্থন করি না। ট্রাস্টিগণ অবশ্যই দেশের প্রচলিত ট্রাস্ট বিধি মেনে চলবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বনফুল আদিবাসী ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিলো একটি সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে। আমাদের চিন্তায় ছিলো অরাজনৈতিক ও অলাভজনক ধারণা। আমার বিশ^াস, ট্রাস্টিরা অবশ্যই নিয়মের মধ্যেই চলবেন।’