মানুষ একা বাঁচতে পারে না। পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তার জীবন পূর্ণতা পায়। কিন্তু সমাজে একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে মতের অমিল, ভুল বোঝাবুঝি, ঈর্ষা, রাগ-অভিমান ও স্বার্থের সংঘাত দেখা দিতেই পারে। মানুষের সঙ্গে কিভাবে সুন্দর আচরণ করতে হবে, কিভাবে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে এবং কিভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবেÑতারও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়। ’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
সমাজে সবার চোখে ভালো থাকার ১০ উপায়
১. কথাবার্তায় সংযমী হতে হবে
সমাজে ভালো থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা। একটি সুন্দর কথা যেমন মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে, তেমনি একটি কটু কথা বহু বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০)
তাই কথা বলার আগে ভাবতে হবে-আমার কথাটি কি সত্য? প্রয়োজনীয়? কারও মনে কষ্ট দেবে কি না? সমাজে সম্মান নিয়ে থাকতে চাইলে অপ্রয়োজনীয় তর্ক, গালমন্দ, অপমান, কটূক্তি ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
২. গিবত, অপবাদ ও সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে
সমাজের অনেক অশান্তির মূল কারণ হলো গুজব, পরনিন্দা ও অমূলক সন্দেহ। কারও সম্পর্কে না জেনে মন্তব্য করা, তার ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে আলোচনা করা কিংবা যাচাই না করে কোনো সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়াÑএসব মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয় কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
অতএব সমাজে ভালো থাকতে হলে অন্যের দোষ খোঁজার পরিবর্তে নিজের সংশোধনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
৩. মানুষকে সম্মান করতে হবে
মানুষের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও পোশাক, অর্থনৈতিক অবস্থা, পেশা, বংশ বা সামাজিক অবস্থান দেখে তাকে ছোট করা ইসলামের শিক্ষা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
তাই সমাজে ভালো থাকার জন্য প্রত্যেক মানুষকে সম্মানের চোখে দেখা, ছোটদের স্নেহ করা এবং বড়দের সম্মান করা প্রয়োজন।
৪. হাসিমুখে কথা বলতে হবে
মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো সুন্দর আচরণ। একটি আন্তরিক হাসি, সালামের জবাব, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা বিপদে পাশে দাঁড়ানোÑএসব ছোট কাজ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ইসলাম মানুষের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর জীবন ছিল মানুষের প্রতি দয়া, নম্রতা ও উত্তম চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই সমাজে নিজের অবস্থান সুন্দর করতে হলে মানুষের সঙ্গে অহংকার নয়, বিনয়; রূঢ়তা নয়, কোমলতা; অবজ্ঞা নয়, আন্তরিকতা দিয়ে আচরণ করতে হবে।
৫. ক্ষমা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে
সমাজে চলতে গেলে মানুষ আমাদের ভুল বুঝবে, কখনো কষ্ট দেবে, আবার আমরাও অনিচ্ছায় অন্যকে কষ্ট দিতে পারি। প্রতিটি বিষয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ক্ষমা করো, উপেক্ষা করো। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২২)
অতএব ক্ষমা করা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি মহৎ চরিত্রের লক্ষণ। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী ন্যায়সংগত উপায়ে সমস্যার সমাধান করাও জরুরি।
৬. ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দিতে হবে
একজন ভালো মানুষ শুধু নিজে শান্তিতে থাকেন না; বরং অন্যের মধ্যেও শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। দুই ব্যক্তির মধ্যে বিরোধ হলে আগুনে ঘি ঢালার পরিবর্তে সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে তুলনা করে তাদের মধ্যে মীমাংসা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
তাই কারও বিবাদ শুনে এক পক্ষের কথা অন্য পক্ষের কাছে বাড়িয়ে বলা নয়; বরং সম্ভব হলে ন্যায় ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাদের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা উচিত।
৭. অহংকার পরিহার করতে হবে
অহংকার মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। জ্ঞান, অর্থ, সৌন্দর্য, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক অবস্থানÑকোনোটিই কাউকে অন্যের চেয়ে স্বভাবগতভাবে শ্রেষ্ঠ করে না। আল্লাহর কাছে প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি হলো তাকওয়া। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
তাই যত বড় অবস্থানেই থাকি না কেন, বিনয়ী হতে হবে। কারণ মানুষ সাধারণত অহংকারীকে নয়, বিনয়ী ও অমায়িক মানুষকেই আপন করে নেয়।
৮. অন্যের উপকারে আসার চেষ্টা করতে হবে
সমাজে ভালো থাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হলো মানুষের উপকার করা। অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, দরিদ্রকে সাহায্য করা, প্রতিবেশীর প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোÑএসব কাজ মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। একজন মুসলমানের জীবন এমন হওয়া উচিত, যার মাধ্যমে অন্য মানুষ নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও কল্যাণ অনুভব করে।
৯. নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখতে হবে
‘আমি ভুল করি না’Ñএই মানসিকতা সম্পর্ক নষ্ট করে। ভুল হলে বিনয়ের সঙ্গে ‘আমি ভুল করেছি’ বলা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাওয়া মানুষের মর্যাদা কমায় না; বরং তার চরিত্রকে আরও সুন্দর করে। একটি আন্তরিক ক্ষমা অনেক সময় এমন একটি সম্পর্ককে বাঁচিয়ে দেয়, যা দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কও বাঁচাতে পারে না।
১০. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে
সমাজে সুন্দর থাকার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক। অন্তরে আল্লাহর ভয় ও জবাবদিহির অনুভূতি থাকলে মানুষ গোপনেও অন্যায় করতে ভয় পায়। তখন তার আচরণে সততা, আমানতদারি ও সংযম প্রকাশ পায়।
ভালো থাকতে হলে ভালো মানুষ হতে হবে। আর ভালো মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন সুন্দর ঈমান, উত্তম চরিত্র, সংযত জিহ্বা, বিনয়ী আচরণ, ক্ষমাশীল হৃদয় এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা। তাই আসুন, আমরা এমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করিÑযার কথায় মানুষ নিরাপদ, ব্যবহারে মানুষ স্বস্তিদায়ক, উপস্থিতিতে মানুষ আনন্দিত এবং অনুপস্থিতিতেও মানুষ যার প্রশংসা করে। এটাই একজন মুমিনের সুন্দর সামাজিক জীবনের অন্যতম পরিচয়।
সংবাদ শিরোনাম
সমাজে সবার চোখে ভালো থাকার ১০ উপায়
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০৮:৪৫:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 46
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























