ইতিহাসে কিছু যুদ্ধের গুরুত্ব শুধু কে জিতল আর কে হারলÑএ হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো কোনো যুদ্ধ হয়ে ওঠে নেতৃত্ব, কৌশল ও ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এক জীবন্ত পাঠশালা। ইরাক বিজয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে পারস্য সাম্রাজ্যের সংঘর্ষগুলোও তেমনই। আবু উবায়দ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফি (রা.) ও মুসান্না ইবনে হারিসা (রা.)-এর ঘটনাপ্রবাহে যেমন সাহস ও বিজয়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভুল সিদ্ধান্ত, কঠিন পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ উদাহরণ।
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ইরাকে মুসলিম বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেন। তিনি আবু উবায়দ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফি (রা.)-কে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।
আবু উবায়দার নাম উচ্চারিত হলে অনেকের মনে প্রথমেই ‘সেতুর যুদ্ধ’-এর কথা আসেÑযে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী কঠিন পরাজয়ের মুখোমুখি হয় এবং আবু উবায়দ (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। কিন্তু তাঁর সামরিক জীবনের পুরো চিত্র শুধু সেই পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর আগে তিনি পারস্যদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কয়েকটি যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। নামারিকের যুদ্ধে জাবানের নেতৃত্বাধীন পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করেন।
এরপর সাকাতিয়ায় নারসির বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মুসলিমরা বিজয়ী হয়। পরে জালিনুসের নেতৃত্বাধীন আরেকটি পারস্য বাহিনীর সঙ্গেও বারুসুমার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে আবু উবায়দ একাধিক পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু ধারাবাহিক সাফল্য কখনোই একজন সেনাপতিকে পরবর্তী ভুল সিদ্ধান্ত থেকে নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা দেয়না।
আগের পরাজয়গুলোর পর পারস্যরা বাহমান জাদহুইয়ার নেতৃত্বে নতুন একটি শক্তিশালী বাহিনী প্রস্তুত করে। তাদের সঙ্গে ছিল যুদ্ধহাতিও। দুই বাহিনীর মাঝখানে ছিল ইউফ্রেটিস নদী। এখানেই আবু উবায়দের সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত আসে। পারস্য বাহিনী নদী পার হয়ে মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আবু উবায়দ নিজ বাহিনী নিয়ে নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে মুসলিম বাহিনী নদীর অপর পারে এমন এক অবস্থানে গিয়ে যুদ্ধ শুরু করে, যেখানে তাদের চলাচল ও পশ্চাদপসরণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। যুদ্ধের ময়দানে পারস্যদের হাতিগুলো মুসলিমদের ঘোড়ার মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠলেও আবু উবায়দ অসাধারণ ব্যক্তিগত সাহস প্রদর্শন করেন। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে একটি হাতির দিকে এগিয়ে যান এবং সেটিকে আঘাত করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতিটির আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং পদদলিত হয়ে শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর পর একে একে আরো কয়েকজন সেনাপতি শহীদ হন।
সেতুর যুদ্ধের আরেকটি বড় সমস্যা ছিল পশ্চাদপসরণের পথ। যুদ্ধের একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর পেছনের সেতুটি কেটে দেওয়া হয়, যাতে সৈন্যরা পালিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতি যখন মুসলিমদের অনুকূলে থাকল না, তখন সেই সেতুই হয়ে উঠল বিপদের অন্যতম কারণ। নদী পেছনে থাকায় সৈন্যদের নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বাহিনী সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সেতুর যুদ্ধে যখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে, তখন মুসান্না ইবনে হারিসা (রা.)-এর নেতৃত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন, এই মুহূর্তে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে অবশিষ্ট মুসলিম সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই জরুরি। তিনি নতুন করে সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেন এবং মুসলিম বাহিনীর শেষ সৈন্যটিও নদী পার না হওয়া পর্যন্ত নিজে ও তাঁর লোকেরা পেছনে অবস্থান করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তিনি সৈন্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা তোমাদের পেছনে আছি। তোমরা নিশ্চিন্তে পার হও, ভয় পেয়ো না। তোমরা অপর পারে পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা এখান থেকে যাব না।’
সেতুর যুদ্ধের পরাজয়ের সংবাদ মদিনায় পৌঁছালে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনেক সৈন্য ফিরে এসেছিলেন এবং নিজেদের পরাজয়ের জন্য লজ্জিত ছিলেন। কিন্তু কেউ তাদের ভর্ৎসনা করলেন না। বরং ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আল্লাহর কাছে মুসলিমদের ব্যাপারে নিজের দায়িত্বের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! প্রত্যেক মুসলমান আমার পক্ষ থেকে দায়মুক্ত। আমি প্রত্যেক মুসলমানের রক্ষক। আল্লাহ আবু উবায়দের প্রতি রহম করুন!’
সেতুর যুদ্ধের কিছুদিন পর মুসান্না (রা.) আবার পারস্য বাহিনীর মুখোমুখি হন। এবার স্থান ছিল আল-বুওয়াইব। সেতুর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তখনও তাঁর মনে তাজা। দুই বাহিনীর মাঝে আবারও নদী ছিল। কিন্তু এবার তিনি আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেন এবং পারস্য বাহিনীকে মুসলিমদের দিকে নদী পার হয়ে আসতে দেন। এরপর শুরু হয় ভয়াবহ যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে এবং পারস্য সেনাপতি মেহরান নিহত হয়। বিজয়ের পর মুসান্না (রা.) পারস্য বাহিনীর আগে সেতুতে পৌঁছে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি উপলব্ধি করেনÑএটিও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কারণ শত্রুর পেছনে যদি পালানোর পথ সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে তারা আত্মসমর্পণের বদলে শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করতে পারে।
ইতিহাসের কয়েকটি গভীর শিক্ষা
প্রথমত, অতীতের বিজয় ভবিষ্যতের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে নিরাপদ থাকার কোনো নিশ্চয়তা নয়।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত সাহসের পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, পশ্চাদপসরণ সব সময় পরাজয় নয়; কখনো তা ভবিষ্যৎ বিজয়ের জন্য বাহিনীকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়।
চতুর্থত, পরাজিত বাহিনীকে ভর্ৎসনা না করে তাদের আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন করাও নেতার দায়িত্ব।
পঞ্চমত, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া নেতৃত্বের অন্যতম বড় গুণ।
ষষ্ঠত, নিজের ভুল প্রকাশ্যে স্বীকার করার সাহস একজন নেতাকে ছোট করে না; বরং অনুসারীদের জন্য বাস্তব শিক্ষা তৈরি করে।
সংবাদ শিরোনাম
পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐতিহাসিক বিজয়
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ১১:৪৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 22
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























