জীবনে আমরা অনেক কিছুই চাই—অঢেল সম্পদ, দীর্ঘ জীবন, সুস্থতা, সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য, ব্যবসায় উন্নতি, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য কিংবা সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু সবকিছু বেশি পাওয়াই কি জীবনের প্রকৃত সফলতা? বিপুল সম্পদ থাকার পরও যদি মনে শান্তি না থাকে, দীর্ঘ জীবন পেয়েও যদি তা নেক কাজে ব্যয় না হয়, অনেক সন্তান থাকলেও যদি তারা মা-বাবার জন্য কল্যাণের কারণ না হয়—তাহলে সেই প্রাচুর্যের প্রকৃত মূল্য কতটুকু? পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর ফেনা তো শুকিয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিনে থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১৭)
এই আয়াতের শিক্ষা হলো—যা বাহ্যিকভাবে বেশি বা বড় মনে হয়, তা সবসময় স্থায়ী ও কল্যাণকর নয়। ফেনা দেখতে অনেক হলেও তার স্থায়িত্ব নেই; পক্ষান্তরে মানুষের উপকারী বস্তু অল্প হলেও তার মূল্য ও স্থায়িত্ব রয়েছে। বরকতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমনই।
তাই কারো অর্থ কম হলেও যদি তা হালাল হয়, প্রয়োজন পূরণ করে, পরিবারকে স্বচ্ছল রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার সুযোগ দেয়—তাতে বরকত থাকতে পারে। আবার কারো সম্পদ বিপুল হলেও যদি তা হারাম উপায়ে অর্জিত হয়, অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করে কিংবা আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যয় হয়, তবে সেই প্রাচুর্য প্রকৃত বরকতের পরিচায়ক নয়।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকতের প্রয়োজন বরকত শুধু অর্থ-সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। সময়, জ্ঞান, স্বাস্থ্য, পরিবার, সন্তান, কর্মজীবন—সবকিছুতেই বরকত প্রয়োজন।
একজন মানুষ অল্প সময়ে এমন কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, যা অন্য কেউ অনেক সময় নিয়েও করতে পারেন না। কারো অল্প জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে; আবার কারো বিপুল জ্ঞানও কোনো কাজে আসে না। কারো অল্প সম্পদে পরিবার সুখী থাকে; আবার কারো বিপুল সম্পদও অশান্তি দূর করতে পারে না। সুতরাং মুমিনের জন্য বরকত হলো—আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত যথাযথভাবে কাজে লাগার সুযোগ পাওয়া এবং সেই নিয়ামতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করা।
বরকত লাভের কয়েকটি আমল
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা : ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে বরকতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি চায় তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)
অতএব আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, তাদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পর্ক ছিন্ন না করা শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের আমল।
২. বেচাকেনায় সততা অবলম্বন : ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকতের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সত্যবাদিতা ও স্বচ্ছতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা পৃথক না হওয়া পর্যন্ত তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের ইখতিয়ার থাকে। তারা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের দোষ-ত্রুটি স্পষ্ট করে, তবে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং দোষ-ত্রুটি গোপন করে, তবে তাদের বেচাকেনার বরকত মুছে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২১১০)
এ হাদিস ব্যবসায়িক জীবনের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—সততা শুধু নৈতিক গুণ নয়, এটি উপার্জনে বরকতের কারণ।
৩. বিবাহে সহজতা অবলম্বন করা : বিয়েতে অযথা ব্যয়, অতিরিক্ত দাবি ও কঠিন শর্ত আরোপ না করে সহজতা অবলম্বন করাও বরকতের কারণ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অধিক বরকতময় স্ত্রী হলো সে, যার মহর সহজ (কম) এবং যার বিবাহের ব্যয়ও সহজ।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৪৫৯৫)
অর্থাৎ বিবাহকে অহংকার, প্রতিযোগিতা ও অযথা ব্যয়ের উপলক্ষ না বানিয়ে সহজ ও শরিয়তসম্মত রাখা ইসলামের শিক্ষা।
৪. ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া : ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া শুধু সৌজন্য নয়; এতে আল্লাহর বরকত রয়েছে। আনাস (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘হে বৎস! তুমি যখন তোমার পরিবারের কাছে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দেবে। তা তোমার এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকতের কারণ হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৬৯৮)
তাই মুসলিমের ঘর শুরু হোক আল্লাহর নাম ও সালামের মাধ্যমে।
৫. আল্লাহর পথে ব্যয় করা : দান-সদকা সম্পদ কমিয়ে দেয়—এমন ধারণা ইসলামী শিক্ষার বিপরীত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি ব্যয় করো, আমি তোমার ওপর ব্যয় করব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫২)
অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করলে বান্দার সম্পদে কল্যাণ আসে। দানের বরকত সবসময় সংখ্যায় প্রকাশ পায় না; কখনো তা বিপদ থেকে রক্ষা, কখনো প্রয়োজন পূরণ, কখনো অন্তরের প্রশান্তি এবং কখনো আখিরাতের সঞ্চয় হিসেবে প্রকাশ পায়।
৬. একসঙ্গে খাওয়া এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করা : খাবারে বরকতের জন্য ইসলামে পারস্পরিক ভালোবাসা ও একত্রে খাওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা খাই কিন্তু তৃপ্ত হই না।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি আলাদা আলাদাভাবে খাও?’ তারা বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা তোমাদের খাবারের ওপর একত্র হও এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করো; তাতে তোমাদের জন্য বরকত দেওয়া হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৭৬৪)
এখানে খাবারের বরকত শুধু পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং একসঙ্গে খাওয়া, আল্লাহর নাম নেওয়া এবং পারস্পরিক ভালোবাসার মধ্যেও বরকত নিহিত।
বরকতের সবচেয়ে বড় উৎস তাকওয়া
বরকতের বিষয়টি কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ খুলে দিতাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৬)
পাপে বরকত নষ্ট হয়
যেভাবে নেক আমল বরকতের কারণ হয়, তেমনি পাপ ও অবাধ্যতা মানুষের জীবন থেকে বরকত নষ্ট করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা তার কোনো পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২৪৩৮)
অতএব, বরকত এমন এক অদৃশ্য নিয়ামত, যা মানুষের প্রাপ্তিকে অর্থবহ করে তোলে। বরকত থাকলে অল্প সম্পদেও প্রয়োজন পূরণ হয়, অল্প সময়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়, অল্প খাবারেও তৃপ্তি আসে, অল্প জ্ঞানও মানুষের উপকারে লাগে এবং সাধারণ জীবনও হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। তাই মুমিনের লক্ষ্য শুধু প্রাচুর্য নয়—কল্যাণময় প্রাচুর্য; শুধু দীর্ঘ জীবন নয়—বরকতময় জীবন; শুধু সম্পদ নয়—হালাল ও কল্যাণকর সম্পদ; শুধু সন্তান নয়—নেককার সন্তান; শুধু জ্ঞান নয়—উপকারী জ্ঞান।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ইলম ও আমলে বরকত দিন এবং জীবনের প্রতিটি নিয়ামতকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
মুমিনের জীবনে ‘বরকত’ বলতে যা বোঝানো হয়
-
ইসলাম ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৮:৫৩:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 11
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























