ঢাকা ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় যুক্তরাজ্য : ব্রিটিশ হাইকমিশনার Logo ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলের সদর দপ্তর পরিদর্শন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের Logo ১৯ কার্গো এলএনজি আসছে ঘাটতির আশংকা নেই Logo দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের প্রতি সহায়তার আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo বিএনপি সরকারের উদ্যোগ : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু Logo বাংলাদেশের বিপক্ষে শক্তিশালী স্কোয়াড ঘোষণা করল অস্ট্রেলিয়া Logo ফোন নীরবে যে ৪ কাজ করে Logo ডেঙ্গু প্রতিরোধ ঘর থেকেই শুরু হোক Logo মনের জটিল জট খোলার মতো ১০টি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমা

উপমহাদেশে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক ক্রমধারা

ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামী চিন্তার ইতিহাস কোনো একক ধারায় প্রবাহিত হয়নি। মোগল সাম্রাজ্যের শেষপর্ব, রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্রমাবনতি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ যখন এক গভীর পরিবর্তনের মুখোমুখি, তখন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাতেও শুরু হয় নতুন এক রূপান্তর।
সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষাধারা পরবর্তী সময়ের আলেম-সমাজ, ধর্মীয় চিন্তা ও সংস্কার আন্দোলনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
সেসময় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শিক্ষাধারা গড়ে উঠে—লক্ষ্ণৌর ফিরিঙ্গী মহল, দিল্লির মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়া এবং খায়রাবাদের জ্ঞানচর্চার ধারা। এই তিনটি শিক্ষাধারা-ই স্বতন্ত্র অথচ পরস্পর-সংশ্লিষ্ট ধারায় বিকশিত হয়েছিল। আর পরবর্তী শতাব্দীর উপমহাদেশীয় আলেম-সমাজের বৈচিত্র্যময় চিন্তাজগৎ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই ধারার ভূমিকা অত্যন্ত গভীর।
প্রথম ধারাটি হলো- লক্ষ্ণৌকেন্দ্রিক ফিরিঙ্গী মহল এবং তার প্রবর্তিত দারস-ই-নিজামী পাঠক্রম। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৯৫ সালে একটি ইউরোপীয় বণিক-পরিবারের পরিত্যক্ত ভবন মোল্লা নিজামুদ্দীন সিহালভীকে দান করেন, যা কালক্রমে ‘ফিরিঙ্গী মহল’ নামে পরিচিতি পায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসা-শিক্ষার এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। আঠারো শতকের গোড়ায় মোল্লা নিজামুদ্দীন যে পাঠক্রম রচনা করেন, তাতে ফিকহ, তাফসির ও হাদিসের মতো ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রের পাশাপাশি মানতিক তথা যুক্তিবিদ্যা, হিকমত বা ফালসাফা এবং ইলমুল হিসাবের মতো বিষয়ও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। এই পাঠক্রম মূলত প্রশাসক, কাজি ও রাষ্ট্র-পরিচালনার উপযোগী পণ্ডিত তৈরির লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল, ফলে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রতি এর ঝোঁক ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।
দ্বিতীয় ধারাটি হলো- দিল্লিকেন্দ্রিক মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়া, যা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর পিতা শাহ আবদুর রহিম মোগল আমলে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭১৮ সালে শাহ আবদুর রহিমের ইন্তেকালের পর শাহ ওয়ালিউল্লাহ নিজেই এই মাদ্রাসার শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এবং অচিরেই এটি উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার এক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ফিরিঙ্গী মহলের তুলনায় রহিমিয়া ধারা ছিল অধিকতর দ্বীনী-চেতনাসমৃদ্ধ, হাদিস ও তাসাউফের প্রতি গভীর মনোযোগী এবং উম্মাহর ঐক্য ও সংস্কারের প্রশ্নে অধিক সচেতন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ ও ‘ আল ইনসাফ ফি বায়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ’ গ্রন্থদ্বয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে কোরআন-সুন্নাহর মূল সূত্র ধরে ফিকহি মাসলাকসমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব, এবং কীভাবে হাদিসশাস্ত্রকে কেন্দ্র করে দ্বীনী জ্ঞানের এক সুসংহত সংশ্লেষণ গড়ে তোলা যায়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মাধ্যমেই এই ধারা পরবর্তীকালে দারুল উলুম দেওবন্দ, নদওয়াতুল উলামা ও আলীগড়ের মতো ঊনবিংশ শতকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বীজ বপন করে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর এই সমন্বয়ী চিন্তা পরবর্তী উপমহাদেশীয় ইসলামী চিন্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উত্তরসূরিদের মধ্য থেকেই পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংস্কার ও শিক্ষাধারা বিকশিত হয়।
তৃতীয় ধারাটি হলো- খায়রাবাদ-কেন্দ্রিক, যা মূলত মানতিক ও ফালসাফার অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল এবং গ্রিক-পারস্য দর্শনের প্রভাবযুক্ত বিমূর্ত জ্ঞানচর্চাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। মোল্লা হাসান খায়রাবাদী ও পরবর্তীকালে ফজলে হক খায়রাবাদীর মতো পণ্ডিতরা এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন।
এভাবে উপমহাদেশে তখন একদিকে ছিল শাস্ত্রনির্ভর ধর্মীয় শিক্ষা, অন্যদিকে যুক্তি ও দর্শনভিত্তিক জ্ঞানচর্চা; আবার শাহ ওয়ালিউল্লাহর মাধ্যমে কোরআন-হাদিস, ফিকহ ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত সংস্কারী চিন্তাও বিকশিত হচ্ছিল। আর এই বহুমাত্রিক পরিবেশই পরবর্তী শতাব্দীর ইসলামী চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষত ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর, এই তিন ধারার মিথস্ক্রিয়া থেকে যে নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়, তার মধ্যে তিনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য
১৮৫৭-এর পর : নতুন বাস্তবতা, নতুন শিক্ষাধারা
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ও মোগল সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অবসানের পর ভারতীয় মুসলমানদের সামনে এক সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়। মুসলিম সমাজের শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলেম, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি জ্ঞান সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেন, কেউ পুরোনো ও নতুন শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় খোঁজেন, আবার কেউ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন।
এই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার মধ্য থেকেই উনিশ শতকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে সামনে আসে—দেওবন্দ, নদওয়া ও আলীগড়।
দেওবন্দ মাদ্রাসা
১৮৬৬ সালের ৩০ মে উত্তর ভারতের দেওবন্দে ছাত্তা মসজিদে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী ও তাঁদের সহযোগীরা এ প্রতিষ্ঠানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেওবন্দের শিক্ষাদর্শে শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইলমি ঐতিহ্যের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে মুসলিম সমাজের নিজস্ব অর্থায়নে কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আকিদা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। পরবর্তীকালে দেওবন্দি ধারার বহু আলেম হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও ইসলামী চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, আশরাফ আলী থানভী, হুসাইন আহমদ মাদানী, মুফতি মুহাম্মদ শফী প্রমুখ এই বিস্তৃত ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
নদওয়াতুল উলামা
১৮৯৪ সালে লক্ষ্ণৌতে প্রতিষ্ঠিত নদওয়াতুল উলামা উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজের বিভিন্ন ইলমি ও মাজহাবি ধারার মধ্যে দূরত্ব কমানো এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সমকালীন জ্ঞান ও চিন্তার একটি কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা। শিবলী নোমানী, মুহাম্মদ আলী মুঙ্গেরীসহ বহু আলেম ও চিন্তাবিদ নদওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নদওয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু ফিকহ ও হাদিস নয়; আরবি সাহিত্য, ইতিহাস, সীরাত, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও সমকালীন জ্ঞানচর্চার প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়
অন্যদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সমাজের সামনে ভিন্ন একটি পথ তুলে ধরেন। ১৮৭৫ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুহাম্মাডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ, যা ১৯২০ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। স্যার সৈয়দের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজকে ইংরেজি ভাষা, আধুনিক বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করা, যাতে পরিবর্তিত ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে মুসলমানরা নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

উপমহাদেশে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক ক্রমধারা

আপডেট সময় ০৯:১৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামী চিন্তার ইতিহাস কোনো একক ধারায় প্রবাহিত হয়নি। মোগল সাম্রাজ্যের শেষপর্ব, রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্রমাবনতি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ যখন এক গভীর পরিবর্তনের মুখোমুখি, তখন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাতেও শুরু হয় নতুন এক রূপান্তর।
সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষাধারা পরবর্তী সময়ের আলেম-সমাজ, ধর্মীয় চিন্তা ও সংস্কার আন্দোলনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
সেসময় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শিক্ষাধারা গড়ে উঠে—লক্ষ্ণৌর ফিরিঙ্গী মহল, দিল্লির মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়া এবং খায়রাবাদের জ্ঞানচর্চার ধারা। এই তিনটি শিক্ষাধারা-ই স্বতন্ত্র অথচ পরস্পর-সংশ্লিষ্ট ধারায় বিকশিত হয়েছিল। আর পরবর্তী শতাব্দীর উপমহাদেশীয় আলেম-সমাজের বৈচিত্র্যময় চিন্তাজগৎ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই ধারার ভূমিকা অত্যন্ত গভীর।
প্রথম ধারাটি হলো- লক্ষ্ণৌকেন্দ্রিক ফিরিঙ্গী মহল এবং তার প্রবর্তিত দারস-ই-নিজামী পাঠক্রম। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৯৫ সালে একটি ইউরোপীয় বণিক-পরিবারের পরিত্যক্ত ভবন মোল্লা নিজামুদ্দীন সিহালভীকে দান করেন, যা কালক্রমে ‘ফিরিঙ্গী মহল’ নামে পরিচিতি পায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসা-শিক্ষার এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। আঠারো শতকের গোড়ায় মোল্লা নিজামুদ্দীন যে পাঠক্রম রচনা করেন, তাতে ফিকহ, তাফসির ও হাদিসের মতো ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রের পাশাপাশি মানতিক তথা যুক্তিবিদ্যা, হিকমত বা ফালসাফা এবং ইলমুল হিসাবের মতো বিষয়ও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। এই পাঠক্রম মূলত প্রশাসক, কাজি ও রাষ্ট্র-পরিচালনার উপযোগী পণ্ডিত তৈরির লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল, ফলে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রতি এর ঝোঁক ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।
দ্বিতীয় ধারাটি হলো- দিল্লিকেন্দ্রিক মাদ্রাসা-ই-রহিমিয়া, যা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর পিতা শাহ আবদুর রহিম মোগল আমলে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭১৮ সালে শাহ আবদুর রহিমের ইন্তেকালের পর শাহ ওয়ালিউল্লাহ নিজেই এই মাদ্রাসার শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এবং অচিরেই এটি উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার এক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ফিরিঙ্গী মহলের তুলনায় রহিমিয়া ধারা ছিল অধিকতর দ্বীনী-চেতনাসমৃদ্ধ, হাদিস ও তাসাউফের প্রতি গভীর মনোযোগী এবং উম্মাহর ঐক্য ও সংস্কারের প্রশ্নে অধিক সচেতন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ ও ‘ আল ইনসাফ ফি বায়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ’ গ্রন্থদ্বয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে কোরআন-সুন্নাহর মূল সূত্র ধরে ফিকহি মাসলাকসমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব, এবং কীভাবে হাদিসশাস্ত্রকে কেন্দ্র করে দ্বীনী জ্ঞানের এক সুসংহত সংশ্লেষণ গড়ে তোলা যায়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মাধ্যমেই এই ধারা পরবর্তীকালে দারুল উলুম দেওবন্দ, নদওয়াতুল উলামা ও আলীগড়ের মতো ঊনবিংশ শতকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বীজ বপন করে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর এই সমন্বয়ী চিন্তা পরবর্তী উপমহাদেশীয় ইসলামী চিন্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উত্তরসূরিদের মধ্য থেকেই পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংস্কার ও শিক্ষাধারা বিকশিত হয়।
তৃতীয় ধারাটি হলো- খায়রাবাদ-কেন্দ্রিক, যা মূলত মানতিক ও ফালসাফার অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল এবং গ্রিক-পারস্য দর্শনের প্রভাবযুক্ত বিমূর্ত জ্ঞানচর্চাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। মোল্লা হাসান খায়রাবাদী ও পরবর্তীকালে ফজলে হক খায়রাবাদীর মতো পণ্ডিতরা এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন।
এভাবে উপমহাদেশে তখন একদিকে ছিল শাস্ত্রনির্ভর ধর্মীয় শিক্ষা, অন্যদিকে যুক্তি ও দর্শনভিত্তিক জ্ঞানচর্চা; আবার শাহ ওয়ালিউল্লাহর মাধ্যমে কোরআন-হাদিস, ফিকহ ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত সংস্কারী চিন্তাও বিকশিত হচ্ছিল। আর এই বহুমাত্রিক পরিবেশই পরবর্তী শতাব্দীর ইসলামী চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষত ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর, এই তিন ধারার মিথস্ক্রিয়া থেকে যে নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়, তার মধ্যে তিনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য
১৮৫৭-এর পর : নতুন বাস্তবতা, নতুন শিক্ষাধারা
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ও মোগল সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অবসানের পর ভারতীয় মুসলমানদের সামনে এক সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়। মুসলিম সমাজের শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলেম, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি জ্ঞান সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেন, কেউ পুরোনো ও নতুন শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় খোঁজেন, আবার কেউ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন।
এই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার মধ্য থেকেই উনিশ শতকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে সামনে আসে—দেওবন্দ, নদওয়া ও আলীগড়।
দেওবন্দ মাদ্রাসা
১৮৬৬ সালের ৩০ মে উত্তর ভারতের দেওবন্দে ছাত্তা মসজিদে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী ও তাঁদের সহযোগীরা এ প্রতিষ্ঠানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেওবন্দের শিক্ষাদর্শে শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইলমি ঐতিহ্যের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে মুসলিম সমাজের নিজস্ব অর্থায়নে কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আকিদা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। পরবর্তীকালে দেওবন্দি ধারার বহু আলেম হাদিস, ফিকহ, তাফসির ও ইসলামী চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, আশরাফ আলী থানভী, হুসাইন আহমদ মাদানী, মুফতি মুহাম্মদ শফী প্রমুখ এই বিস্তৃত ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
নদওয়াতুল উলামা
১৮৯৪ সালে লক্ষ্ণৌতে প্রতিষ্ঠিত নদওয়াতুল উলামা উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজের বিভিন্ন ইলমি ও মাজহাবি ধারার মধ্যে দূরত্ব কমানো এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সমকালীন জ্ঞান ও চিন্তার একটি কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা। শিবলী নোমানী, মুহাম্মদ আলী মুঙ্গেরীসহ বহু আলেম ও চিন্তাবিদ নদওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নদওয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু ফিকহ ও হাদিস নয়; আরবি সাহিত্য, ইতিহাস, সীরাত, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও সমকালীন জ্ঞানচর্চার প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়
অন্যদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সমাজের সামনে ভিন্ন একটি পথ তুলে ধরেন। ১৮৭৫ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুহাম্মাডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ, যা ১৯২০ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। স্যার সৈয়দের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজকে ইংরেজি ভাষা, আধুনিক বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করা, যাতে পরিবর্তিত ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে মুসলমানরা নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারে।