সমাজে যখন ভ্রান্ত মতাদর্শ, বিভ্রান্তিকর চিন্তা ও সংশয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন একজন মুসলমানের প্রথম দায়িত্ব হলো নিজের ঈমান ও বিশ্বাসকে সুরক্ষিত রাখা। কেননা ফিতনা ও বিভ্রান্তি মানুষের চিন্তাকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায়।
কোরআন ও হাদিস মুসলমানকে এমন পরিস্থিতিতে আবেগের পরিবর্তে জ্ঞান, যাচাই, তাকওয়া ও সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছে।
ভ্রান্ত মতবাদের উত্থান হলে মুমিনের করণীয়
সমাজে ভ্রান্ত মতবাদের উত্থান হলে এবং ফিতনা ছড়িয়ে পড়লে মুমিনের করণীয় সম্পর্কে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—
১. কোরআন-সুন্নাহর দিকে ফিরে আসা : ভ্রান্ত মতাদর্শ মোকাবেলার প্রথম ভিত্তি হলো কোরআন ও সুন্নাহকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা। কেননা মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘কোনো বিষয়ে তোমাদের ভেতর মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের কাছে উপস্থাপন কোরো। এটাই উত্তম এবং পরিণতির দিক থেকে সর্বোত্তম।
’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)
সুতরাং কোনো দার্শনিকের দর্শন নয়, ধর্মীয় বিষয়গুলো কোরআন ও সুন্নাহ এবং সালফে সালেহিনদের ব্যাখ্যার আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে, যাচাই করে নিতে হবে।
২. আলেমদের দ্বারস্থ হওয়া : হাদিসের ভাষ্য মতে, আলেমরা নবীদের উত্তরসূরি এবং তাঁরা উম্মতে মুহাম্মদির জন্য সেসব কাজ আঞ্জাম দেবেন যা পূর্ববর্তী উম্মতের নবীরা করতেন। আর তা হলো দ্বিনি ইলমের সংরক্ষণ, সাধারণ মানুষের কাছে তা উপস্থাপন করা এবং দ্বিনের সঠিক রূপ ও ব্যাখ্যা মানুষের সামনে তুলে ধরা। মুসলিম সমাজে কোনো বিভ্রান্তি দেখা দিলে তার অসারতা প্রমাণ করা।
তাই সমাজে ভ্রান্ত মতবাদের সয়লাব হলে আলেমদের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন। বিভ্রান্তির সময়ে নিজের অল্প জ্ঞান দিয়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করা বিপজ্জনক। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কোরো।’ (সুরা : নাহল, ১৬ : ৪৩)
সুতরাং ভ্রান্ত মতাদর্শের সময়ে বিজ্ঞ, বিশ্বস্ত ও সুন্নাহনিষ্ঠ আলেমদের কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি।
৩. ধর্মের নামে প্রচারিত বক্তব্যের বিশুদ্ধতা যাচাই
করা : ভ্রান্ত দলগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিনের অপব্যাখ্যা করা এবং কোরআন ও সুন্নাহর অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণে পূর্বসূরিদের স্বতঃসিদ্ধ মত পরিহার করা।
তাই দ্বিনের নামে প্রচারিত বক্তব্যের বিশুদ্ধতা, সূত্র ও সনদ যাচাই করা আবশ্যক। মুহাম্মদ ইবনু সিরিন (রহ.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই জ্ঞান দ্বিনের অন্তর্ভুক্ত; অতএব তোমরা লক্ষ করো, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের দ্বিন গ্রহণ করছ।’ (সহিহ মুসলিমের ভূমিকা; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস : ২৭৩)
মুহাম্মদ ইবনু সিরিন (রহ.)-এর আরেক বর্ণনায় এসেছে, ফিতনা দেখা দেওয়ার পর লোকেরা বর্ণনাকারীদের পরিচয় জানতে চাইত। অতঃপর আহলুস সুন্নাহর অনুসারীদের বর্ণনা গ্রহণ করা হতো এবং বিদআতপন্থীদের বর্ণনা গ্রহণ করা হতো না। সুতরাং শুধু সুন্দর বক্তব্য বা আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেখে কারো কাছ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান নেওয়া যাবে না; তার জ্ঞান, বিশ্বাস, আমল ও নির্ভর যোগ্যতা বিবেচনা করতে হবে।
৪. ভালো আমল ও ইবাদত বৃদ্ধি করা : ফিতনার সময়ে শুধু তর্কবিতর্কে ব্যস্ত না হয়ে নিজের ঈমান ও আমলের প্রতিও মনোযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কেননা সবার আগে নিজের ঈমান ও আমল রক্ষা করা মুমিনের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফিতনা-হাঙ্গামার সময়ে ইবাদত করা আমার দিকে হিজরত করার মতো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৪৮)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দ্রুত নেক আমল করে নাও এমন ফিতনা আসার আগে, যা অন্ধকার রাতের টুকরার মতো; যখন মানুষ সকালে মুমিন থাকবে এবং বিকালে ঈমানহারা হবে অথবা বিকালে মুমিন থাকবে এবং সকালে ঈমানহারা হবে। আর সে পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে দ্বিন বেঁচে দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৮)
তাই নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির ও সৎকর্মের মাধ্যমে ঈমানকে দৃঢ় করা ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা।
৫. কুতর্ক পরিহার করা : যখন সমাজে ভ্রান্ত মতবাদের উত্থান ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সত্যপন্থী মানুষ তার প্রতিবাদ করে এবং প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে ইসলাম কোনো বিষয়ে কুতর্ক পছন্দ করে না। তা হলো অর্থহীন বিতর্ক করা। ভ্রান্ত মতবাদকে খণ্ডন করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলেও কারো সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘হ্যাঁ, তোমরা তো সেসব মানুষ যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে সে বিষয়ে তোমরাই তো তর্ক করেছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কেন তর্ক করছ? আল্লাহ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নও।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৬৬)
একইভাবে তাদের সঙ্গেও বিতর্ক করা উচিত নয়, যাদের কোরআন ও সুন্নাহ বোঝার ক্ষমতা নেই অথবা মনমানসিকতা নেই। কোরআনের শিক্ষা হলো, ‘(তারাই আল্লাহর বান্দা) তাদের যখন অজ্ঞ লোকেরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে সালাম।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৬৩)
৬. নিজেকে রক্ষা করা : সমাজে ভ্রান্ত মতবাদের উত্থান ঘটলে মুমিনের আরেকটি দায়িত্ব হলো নিজেকে নিরাপদ রাখা, বিতর্ক ও বিবাদ থেকে নিরাপদ দূরে থাকা। এমনটিই হাদিসে বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অচিরেই এমন ফিতনা হবে তাতে বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি চলমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম এবং চলমান ব্যক্তি তাতে ছুটে চলা ব্যক্তির চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৮২)
৭. ঈমান-আকিদার ব্যাপারে খামখেয়ালি নয় : ঈমান ও আকিদার ব্যাপারে মুসলমানদের সুদৃঢ় থাকা আবশ্যক। নিজের ঈমানকে কখনোই পরীক্ষার ক্ষেত্র বানানো উচিত নয় এবং দ্বিনের ব্যাপারে খামখেয়ালি ও উদাসীনতা গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং এই পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এটাই অনুসরণ করবে এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৩)
৮. সাহাবিদের দ্বিনের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা : আল্লাহ তাআলা কোরআনে এভাবে সুপথ লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন যে ‘তোমরা যাতে ঈমান এনেছ তারা যদি সেরূপ ঈমান আনয়ন করে, তবে নিশ্চয়ই তারা হেদায়েত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা নিশ্চয়ই বিরুদ্ধাভাবাপন্ন এবং তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৩৭)
৯. বিবাদ উসকে না দেওয়া : কোনো ভ্রান্ত মতবাদের উত্থান ঘটলে এবং সমাজে ফিতনা দেখা দিলে সবার উচিত সংযত আচরণ করা; যেন মুসলিম সমাজে বিবাদ ও সংঘাত ছড়িয়ে না পড়ে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে। তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৫)
১০. আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া : ভ্রান্ত মতবাদ ও ফিতনা ছড়িয়ে পড়লে মুমিনের আরেকটি দায়িত্ব হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা কোরো।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ২৮৬৭)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করেন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
ঈমান-আকিদার যেসব বিষয়ে মুমিনের সতর্কতা জরুরি
-
মুফতি আতাউর রহমান - আপডেট সময় ০৬:৩১:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- 10
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























