আল্লাহর প্রতি সুধারণা মানে এই বিশ্বাস রাখা যে, আমার রব পরম দয়ালু, তিনি বান্দার কল্যাণ চান, তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত হিকমতপূর্ণ এবং তাঁর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না। বিপদে তিনি পথ খুলে দিতে পারেন, গুনাহের পর তওবা করলে তিনি ক্ষমা করতে পারেন, দোয়া করলে তিনি কবুল করতে পারেন এবং বান্দা তাঁর ওপর ভরসা করলে তিনি তার জন্য যথেষ্ট হতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)
পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মুমিনের হৃদয়ে হতাশার স্থান নেই। কারণ সে জানে—যে রব আসমান-জমিনের মালিক, তাঁর কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তাইতো আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণার গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার সঙ্গে তেমনই আচরণ করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫)
এই হাদিস মুমিনের হৃদয়ে আশার এক বিশাল দরজা খুলে দেয়। বান্দা যখন বিশ্বাস করে—আল্লাহ আমাকে দেখছেন, আমার দোয়া শুনছেন, আমার কষ্ট জানেন এবং আমার জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবেন—তখন তার অন্তরে প্রশান্তি জন্ম নেয়। তাই আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা মানে হলো—সাধ্যমতো চেষ্টা করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং ফলাফলের ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা।
আল্লাহর রহমত কত ব্যাপক, তা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি অসাধারণ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক যুদ্ধে কিছু বন্দি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আনা হলো। তাদের মধ্যে এক নারী তার সন্তানকে খুঁজছিল। সন্তানকে পাওয়ার পর সে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করাতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি মনে করো, এই নারী তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘না, যতক্ষণ তার পক্ষে তাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, সে কখনোই তা করবে না।
’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই নারীর তার সন্তানের চেয়েও বেশি দয়ালু।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৫৪)
তাই জীবনের কোনো মুহূর্তেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
সচ্ছলতার সময় আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা রাখা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা তখনই, যখন চারদিক থেকে বিপদ ঘিরে ধরে। যখন দোয়ার ফল তৎক্ষণাৎ দেখা যায় না, যখন দীর্ঘদিনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, যখন অসুস্থতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট কিংবা অন্য কোনো বিপদ জীবনকে ভারী করে তোলে—তখনই বোঝা যায়, আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের ধারণা কতটা দৃঢ়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা : আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫-৬)
অনেক সময় মানুষ অন্যের সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি কিংবা জীবনযাত্রা দেখে নিজের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে। অথচ রিজিকের পরিমাণ দিয়ে আল্লাহর ভালোবাসা কিংবা অসন্তুষ্টি পরিমাপ করা যায় না। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যাকে চান তার রিজিক প্রশস্ত করেন এবং যাকে চান সীমিত করেন।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৬)
আল্লাহর পথে দান করার সময়ও বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ শয়তান তখন মানুষকে ভয় দেখায়—‘এত টাকা দিলে ভবিষ্যতে তোমার অভাব হবে।’ কিন্তু আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার প্রতিদান দেবেন।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৯)
কখনো মানুষ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যায়, যেখানে পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে সাহায্য করতে পারে না। তখন সে অসহায় হয়ে একমাত্র আল্লাহকে ডাকে। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, কে তোমাদের স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেন, যখন তোমরা তাঁকে বিনয়ের সঙ্গে ও গোপনে ডাকো?’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৬৩)
আল্লাহর প্রতি সুধারণা নিয়ে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে—আল্লাহ তো পরম ক্ষমাশীল, তাই গুনাহ করতেই থাকি; পরে তওবা করে নেব। এটি হুসনে জন্ন নয়; বরং আল্লাহর রহমতকে ভুলভাবে ব্যবহার করা। সত্যিকারের আল্লাহভীতি ও সুধারণা মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তওবার দিকে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা রাতের বেলায় তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের গুনাহগার তওবা করে; আবার দিনের বেলায় তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের গুনাহগার তওবা করে। এভাবে চলতে থাকবে যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয় (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫৯
সংবাদ শিরোনাম
আল্লাহর প্রতি সুধারণা মুমিনের শ্রেষ্ঠ অবলম্বন
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০৮:৩৮:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- 9
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























