মানুষ জ্ঞান অর্জন করে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার জন্য, সঠিক ও ভুলের পথ চিনে নেওয়ার জন্য। কিন্তু জ্ঞান যদি মানুষের আচরণে, চরিত্রে ও জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান তার জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনলÑএ প্রশ্ন থেকেই যায়।
একজন মানুষ হয়তো অনেক আয়াত, হাদিস ও ইসলামী বিধান জানে; কিন্তু নামাজে অবহেলা করে, হারাম থেকে নিজেকে বিরত রাখে না, মানুষের অধিকার নষ্ট করেÑতাহলে তার জ্ঞান এখনো কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনতে পারেনি।
ইসলামে জ্ঞান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। তবে সেই জ্ঞানের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সঞ্চয় নয়; বরং আল্লাহকে চেনা, তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করা এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। তাই একজন মুমিনের জীবনে ইলম ও আমলÑদুটিই পাশাপাশি চলতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
জ্ঞান মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে সত্যের আলোয় নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু গুণে উন্নীত করবেন।’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ১১)
অতএব জ্ঞান অর্জন করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে জ্ঞানের মর্যাদা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা আমলের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তাইতো ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর সহিহ বুখারি-তে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘কথা ও কাজের আগে জ্ঞান।’ এই অধ্যায়ে তিনি সুরা মুহাম্মাদ-এর ১৯ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেছেন, ‘জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।’ (সুরা : মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৯)
এ থেকে বোঝা যায়, সঠিক আমলের জন্য সঠিক জ্ঞান প্রয়োজন। কীভাবে নামাজ পড়তে হবে, কীভাবে রোজা রাখতে হবে, কোনটি হালাল ও কোনটি হারাম, মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবেÑএসব না জেনে আমল করলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে আমলের পূর্বশর্ত হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে।
এমনকি যারা নিজেরা কোনো কথা বলে অথচ নিজেরাই তা পালন করে না, কোরআন তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা করো না? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অসন্তোষজনক।’ (সুরা : সাফ, আয়াত : ২–৩)
মানুষকে নামাজের গুরুত্ব বোঝানো অথচ নিজে নামাজে অলস থাকা, তাকওয়ার কথা বলা অথচ নিজে গুনাহে লিপ্ত থাকা, হালাল-হারামের শিক্ষা দেওয়া অথচ নিজের জীবনে তা অনুসরণ না করাÑএ ধরনের বৈপরীত্য একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আল্লাহ তাআলা বলেন,‘তোমরা কি বুঝবে না?’
জ্ঞান এমন হওয়া উচিত, যা অহংকার বাড়াবে না; বরং বিনয় বাড়াবে। জ্ঞান এমন হওয়া উচিত, যা বিতর্কপ্রিয়তা বাড়াবে না; বরং সত্য গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করবে। জ্ঞান এমন হওয়া উচিত, যা শুধু অন্যের ভুল খুঁজে বের করবে না; বরং নিজের সংশোধনের পথ দেখাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১)
জ্ঞান ও আমলের সুন্দর উদাহরণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞান ও হিদায়াত গ্রহণকারী মানুষের উদাহরণ দিয়েছেন বৃষ্টিতে সিক্ত উর্বর জমির সঙ্গে। তিনি বলেছেন, কিছু জমি বৃষ্টির পানি ধারণ করে এবং তা থেকে ঘাস ও উদ্ভিদ জন্মে; আবার কিছু জমি পানি ধারণ করে, যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়। আর কিছু জমি এমন, যা পানি ধারণও করে না এবং উদ্ভিদও উৎপন্ন করে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৮২)
এই হাদিসে প্রথম দুই ধরনের জমি সেই মানুষের উদাহরণ, যে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান গ্রহণ করে, নিজে উপকৃত হয় এবং অন্যদেরও উপকার করে। আর তৃতীয় ধরনের জমি এমন ব্যক্তির উদাহরণ, যে জ্ঞান গ্রহণ করেও তা থেকে উপকৃত হয় না।
একজন মানুষ অনেক কিছু জানতে পারে, কিন্তু সব জ্ঞান তার জীবনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে জ্ঞান তাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়, ফরজ পালনে উদ্বুদ্ধ করে, হারাম থেকে বাঁচায়, মানুষের অধিকার আদায় করতে শেখায় এবং চরিত্রকে সুন্দর করেÑসেই জ্ঞানই তার জন্য প্রকৃত সম্পদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কোরআন শেখে এবং তা শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)
আল্লাহ তাআলা আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন, সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন এবং আমাদের জ্ঞানকে আমাদের জন্য হুজ্জত নয়, বরং নাজাতের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আমল করা অত্যন্ত জরুরি
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০২:৩১:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- 12
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























