ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কথা মনে হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোমল হৃদয়ের এক মহান সাধকের প্রতিচ্ছবি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, আল্লাহভীতি, বিনয় ও অশ্রুসিক্ত হৃদয় তাঁকে মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংকট মোকাবিলায় অসাধারণ দৃঢ়তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহ এক গভীর সংকটে পতিত হয়। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মত্যাগ, ভণ্ড নবীদের আবির্ভাব এবং জাকাত দিতে অস্বীকৃতির ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা তখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
এমন পরিস্থিতিতে খলিফা আবু বকর (রা.)-কে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, বহিরাগত শত্রুর আশঙ্কা এবং মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ঐক্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
এই কঠিন সময়ে তিনি এমন তিনটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যেগুলো ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. সংকটের মধ্যেও ওসামা (রা.)-এর সেনাবাহিনী প্রেরণ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ পর্যায়ে রোমানদের মোকাবিলার উদ্দেশ্যে হজরত ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু বাহিনীটি মদিনা থেকে যাত্রা করার আগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন।
ফলে সেনা অভিযানটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এ অবস্থায় কয়েকজন সাহাবি পরামর্শ দেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ওসামা (রা.)-এর বাহিনীকে আপাতত মদিনায় রেখে দেওয়া হোক। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, সেনাবাহিনী বাইরে চলে গেলে রাজধানী শত্রুদের আক্রমণের মুখে পড়তে পারে।
কিন্তু আবু বকর (রা.) বিষয়টিকে শুধু সামরিক কৌশলের দৃষ্টিতে দেখেননি; তিনি এটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ ও মুসলিম রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রক্ষার বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করেন। তাই তিনি সেনা অভিযান স্থগিত করার পরামর্শ গ্রহণ করেননি।
বরং দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সেনাবাহিনীর পতাকা বেঁধে দিয়েছেন, তা তিনি খুলে দিতে পারেন না। ফলে ওসামা (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী নির্ধারিত অভিযানে যাত্রা করে।
আবু বকর (রা.)-এর এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত, এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গৃহীত সিদ্ধান্ত তাঁর ওফাতের পরও যথাযথ মর্যাদা পাবে। দ্বিতীয়ত, মুসলিম রাষ্ট্র যে অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে তার পূর্বনির্ধারিত দায়িত্ব থেকে সরে আসবে না, সে বার্তাও স্পষ্ট হয়। তৃতীয়ত, সেনাবাহিনীর অভিযান মুসলিম নেতৃত্বের মনোবল ও কর্তৃত্বের দৃঢ়তা প্রকাশ করে। (ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি রচিত ‘আবু বকর সিদ্দিক : শাখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু’)
২. জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সংকট দেখা দেয়, ইতিহাসে তা ‘রিদ্দার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এ সময়ের ঘটনাগুলোকে মোটামুটিভাবে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
একদল ইসলাম ত্যাগ করে পূর্বের ধর্মবিশ্বাসে ফিরে যায়। আরেক দল মুসায়লিমা কাজ্জাবসহ বিভিন্ন ভণ্ড নবীর অনুসারী হয়। অন্যদিকে কিছু গোত্র নামাজ আদায়ের কথা স্বীকার করলেও রাষ্ট্রকে জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের মধ্যে কারও কারও দাবি ছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর জাকাত প্রদানের বাধ্যবাধকতা আর আগের মতো বহাল নেই।
এ পরিস্থিতিতে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) প্রথমদিকে তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে আপত্তি জানান। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে কালিমা পাঠকারী ব্যক্তির জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার কথা এসেছে। কিন্তু আবু বকর (রা.) ব্যাখ্যা করেন, ইসলামের মৌলিক বিধানগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করা যায় না। নামাজ ও জাকাত—উভয়ই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, আর জাকাত আদায় করা সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যারা নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’ তিনি আরো বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জাকাত হিসেবে দেওয়া একটি রশিও যদি কেউ দিতে অস্বীকার করে, তবে সেই অস্বীকৃতির বিরুদ্ধেও তিনি ব্যবস্থা নেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪০০)
আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় অবস্থানের ফলে মুসলিম সমাজের মৌলিক ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষার সংগ্রাম নতুন গতি লাভ করে। এভাবে রিদ্দার যুদ্ধের অবসানের মধ্য দিয়ে আরব উপদ্বীপে মুসলিম নেতৃত্বের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. পবিত্র কোরআন একত্রে সংকলনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের অন্যতম যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হলো পবিত্র কোরআনকে একটি সংকলিত গ্রন্থে একত্র করা। মূলত, রিদ্দার যুদ্ধের সময় ইয়ামামার যুদ্ধে বহু মুসলমান শাহাদাতবরণ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কোরআনের হাফেজ ছিলেন। তাঁদের শাহাদাতের পর ওমর (রা.) আশঙ্কা করেন, ভবিষ্যতে বিভিন্ন যুদ্ধে আরো হাফেজ শহিদ হলে কোরআনের সংরক্ষণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই তিনি খলিফা আবু বকর (রা.)-কে পবিত্র কোরআন একত্রে সংকলনের পরামর্শ দেন।
প্রথমে আবু বকর (রা.) দ্বিধা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) যে কাজ করেননি, তা তিনি কীভাবে করবেন? কিন্তু ওমর (রা.) তাঁকে বোঝান যে এটি নতুন কোনো ধর্মীয় বিধান প্রবর্তন নয়; বরং আল্লাহর কিতাব সংরক্ষণের জন্য একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। বিষয়টি উপলব্ধি করার পর আবু বকর (রা.)-ও এর গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম, এটি একটি কল্যাণকর কাজ। এরপর তিনি হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে কোরআন সংকলনের দায়িত্ব দেন।
জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওহি লেখকদের অন্যতম। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লিখিত কোরআনের উপকরণ এবং সাহাবিদের সংরক্ষিত পাঠের ভিত্তিতে কোরআনের আয়াতগুলো একত্র করেন। এ কাজ ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ; তাই তিনি শুধু নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর না করে লিখিত উপকরণ সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেন।
সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, সংকলিত পাণ্ডুলিপিটি প্রথমে আবু বকর (রা.)-এর কাছে, তাঁর ওফাতের পর ওমর (রা.)-এর কাছে এবং পরে ওমর (রা.)-এর কন্যা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯৮৬)
সংবাদ শিরোনাম
খিলাফতের সূচনায় আবু বকর (রা.)-এর ৩ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত
-
ইসলাম ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৭:৩৯:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- 9
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























