বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ভোলা-২ আসনের এমপি হাফিজ ইব্রাহিম বাজেট বক্তৃতায় গতকাল ২৫ জুন বৃহস্পতিবার বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি, চরাঞ্চলভিত্তিক এগ্রি-সোলার উন্নয়ন মডেল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অভিযোজনের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। ভোলাসহ দেশের সকল চরাঞ্চলের মানুষেল সমস্যাকে সম্ভাবনায় পরিণত করার এক বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন।
তিনি আরো বলেছেন, বর্তমান সরকার এমন একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই পেক্ষাপটে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার।
তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যর পূর্ণ বিবরণ দৈনিক খবরপত্রের পাঠকের জন্য পত্রস্থ করা হলো।
মাননীয় স্পিকার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের উপর বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। প্রথমেই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী সকল শহীদকে।
মাননীয় স্পিকার,
বর্তমান সরকার এমন একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই পেক্ষাপটে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার।
মাননীয় স্পিকার,
আমি ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) আসনের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের উপকূলীয় ও চরাঞ্চলবাসীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই সংসদের সামনে তুলে ধরতে চাই। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস এবং লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তচ্যুত হচ্ছে। বিশেষ করে ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর ভাঙনে বহু পরিবার তাদের বসতভিটা ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছে।
মাননীয় স্পিকার,
আমার নির্বাচনী এলাকার অন্তত ১০টি ইউনিয়ন নদীভাঙনের সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে। দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিনের বহু চরাঞ্চলে এখনো নিরাপদ বেড়িবাঁধ, মানসম্মত সড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। তাই আমি নদীভাঙন প্রতিরোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং চরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছি।
মাননীয় স্পিকার,
বিশেষ করে ভোলার চরসমূহসহ দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমি একটি জাতীয় এগ্রিভোল্টাইক বা এগ্রি-সোলার নীতি প্রণয়নের প্রস্তাব করছি। একই জমিতে কৃষি উৎপাদন এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারিত হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকার যদি একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে, তবে চরাঞ্চলগুলোকে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষি উৎপাদনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আমি বিশ্বাস করি, চরাঞ্চলভিত্তিক এগ্রি-সোলার উন্নয়ন মডেল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অভিযোজনের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে।
মাননীয় স্পিকার,
উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় বাস্তবতা হলো ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। রাজধানী ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো থেকে দূরে অবস্থানের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, নদীপথ তদারকি এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয় প্রয়োজন হয়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আমি একটি অও-ভিত্তিক স্মার্ট কোস্টাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পাবলিক সেফটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব করছি।
মাননীয় স্পিকার,
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের নদী অববাহিকা ও বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ দিয়ে থাকে। চীনের ণধহমঃুব ্ ণবষষড়ি জরাবৎ ইধংরহ এবং ভিয়েতনামের গবশড়হম উবষঃধ অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ তহবিল রয়েছে। আমি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, ভোলার দৌলতখান বোরহানউদ্দিন, মনপুরা, চরফ্যাশন এবং হাতিয়াসহ দেশের সকল চরাঞ্চলের জন্য একটি পৃথক “চরাঞ্চল উন্নয়ন তহবিল” গঠন করা হোক।
মাননীয় স্পিকার,
জলবায়ু পরিবর্তন এবং ব্লু-ইকোনমি আগামী দিনের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ভৌগোলিক অবস্থান, সামুদ্রিক সম্পদ এবং জলবায়ু বাস্তবতা বিবেচনায় ভোলায় একটি “জলবায়ু পরিবর্তন ও ব্লু-ইকোনমি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা করা হলে তা জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মাননীয় স্পিকার,
ভোলা বাংলাদেশের অন্যতম গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। আমি বোরহানউদ্দিন এলাকায় একটি এলএনজি টার্মিনাল, ২টি বিদ্যুাৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং গ্যাসভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছি, যা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একইসঙ্গে ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের গৃহীত তেঁতুলিয়া নদী তীরবর্তী সারকারখানা প্রকল্প চালুর উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি এজন্য নেভিগ্যাশনাল ব্রিজও স্থাপন করে উদ্বোধন করেছিলেন, মাননীয় স্পীকার সেই উদ্বোধনে আপনিও উপ¯ি’ত ছিলেন।
মাননীয় স্পিকার,
স্বাস্থ্যসেবা আমাদের মানুষের অন্যতম বড় সংকট। বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলার ১০০ শয্যার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। আমি উভয় হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ এবং ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে প্রস্তাবিত ভোলা মেডিকেল কলেজটি বোরহানউদ্দিন ও লালমোহনের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপনের অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে জেলার অধিকাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। ভোলা-বরিশাল ব্রিজ, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরিশালের সমাবেশে গত ০৪/০২/২০২৬খ্রি. তারিখে বাস্তবায়নের জন্য কথা দিয়েছিলেন। তা আশু বাস্তবায়ন কামনা করছি।
মাননীয় স্পিকার,
আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। তাই ভোলা-২ আসনে একটি আধুনিক মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি। কৃষি উন্নয়নের স্বার্থে একটি আধুনিক হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপনেরও অনুরোধ করছি।
মাননীয় স্পিকার,
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিশ্বাস করিÑএই দেশকে এগিয়ে নিতে হলে উপকূল, চরাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতেই হবে। পরিশেষে, প্রস্তাবিত বাজেটে উপকূলীয় ও চরাঞ্চল উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পরিশেষে মাননীয় অর্থ মন্ত্রীকে জনআকাঙ্খা পূরণের বাজেট প্রদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
ইকবাল হোসেন 
























