ইসলামীবিশ্ব সম্পদের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করে আছে। পেট্রোল ও গ্যাসের মজুদের দিক থেকে সে বিশ্বের প্রথম স্থানে রয়েছে। যদি বর্তমান উৎপাদন হারে হিসেব করা হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং নরওয়ের তেলের মজুদ দশ বছরের বেশি টিকবে না। কানাডায় এই মজুদের স্থায়িত্ব মাত্র আট বছর। কিন্তু ইসলামী বিশ্বের মজুদের আয়ুষ্কাল এটিকে ভবিষ্যৎ বিশ্বের একমাত্র শক্তির উৎস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। ইরানের তেলের মজুদের স্থায়িত্ব ৫৩ বছর। সৌদি আরবের ৫৫ বছর। আরব আমিরাতের ৭৫ বছর। কুয়েতের ১১৬ বছর। ইরাকের আশ্চর্যজনকভাবে ৫২৬ বছর। এছাড়া কাস্পিয়ান সাগরে, সুদান এবং মধ্য আফ্রিকায় আরো বিশাল তেলের মজুদ রয়েছে। এটাই সেই শক্তির কেক, যেটি দখল করতে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ মরিয়া। তারা একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মুসলিমবিশ্ব কপার ও ফসফেট উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়। আয়রন বা লোহা উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয়। লেড বা সীসা উৎপাদনে বিশ্বের পঞ্চম। কয়লা উৎপাদনে বিশ্বের সপ্তম। মুসলিমবিশ্বে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম নদীগুলো। মুসলিম বিশ্ব এমন উর্বর কৃষি ভূমি, যাদের বিলিয়ন মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এটি পশ্চিমা আমদানি এবং শোষণমুখী ব্যবস্থার প্রতি নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম। মুসলিমবিশ্বে রয়েছে বিশাল সমুদ্র এবং নদীর তটরেখা, যা বিশাল মাছের সম্পদ সরবরাহ করতে পারে। মুসলিম বিশ্বে রয়েছে বিশাল উদ্বৃত্ত অর্থ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ। এটি মুসলমানদের পশ্চিমা ঋণ থেকে মুক্তি দিতে পারে, যেটা তাদের অর্থনীতি, সম্পদ, ইচ্ছাশক্তি এবং সম্মানকে জিম্মি করে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষত ভূগর্ভস্থ সম্পদের উপর শতকরা ২০ শতাংশ করে কর আরোপের মাধ্যমে একটি উন্নয়ন তহবিল গঠন করতে পারে। মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ সম্পদ যেহেতু মাটির নিচে থাকে, তাই এটি বৈধ পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে এবং মুসলমানদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে পারে।
ইসলামীবিশ্ব থেকে সস্তা দামে পশ্চিমে সরবরাহ করা হয় ৪০ শতাংশ খনিজ সম্পদ, ৩৫ শতাংশ তেল, ৯৩ শতাংশ টিন, ৬৫ শতাংশ কাঠ, ৪০ শতাংশ তুলা। কিন্তু পশ্চিমারা ইসলামীবিশ্বকে এমন প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত করে যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। বিশেষ করে (ওয়ান ইলেভেনের পর) ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর, পশ্চিমারা মুসলমানদের বিজ্ঞানশিক্ষা এবং এর প্রয়োজনীয় গবেষণা থেকে বঞ্চিত করেছে এবং করছে। এমনকি বৈজ্ঞানিক সাময়িকগুলিও মুসলিম দেশগুলোর জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেমনটি তারা ইরাকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় আমাদের সামনে স্পষ্ট করেছে। এর উদ্দেশ্য একটাই- ইসলামীবিশ্বের বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাশক্তিকে ধ্বংস করা এবং মুসলমানদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে বিরত রাখা। এছাড়াও মুসলমানদের এমন প্রতিরক্ষা অস্ত্র অর্জন করতে বিরত রাখা, যা তাদের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করতে পারে। মুসলিমবিশ্বের সম্পদ এই পৃথিবীর মুক্তির ময়দানে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই মুক্তি এমন এক মহান উদ্দেশ্য বহন করে, যা ইসলামী পুনর্জাগরণের মূল লক্ষ্য। এই জাগরণকে পশ্চিমারা ফান্ডামেন্টালিজম বলে আখ্যায়িত করে। অতীতের পুনর্জাগরণ এবং ইসলামী শরিয়া বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই আন্দোলন ইসলামী সভ্যতার পুনরুত্থান চায়। এই আন্দোলনের আহ্বান, ইসলাম শুধু ধর্ম নয়, কোন ব্যক্তি জীবনে পালনীয় জিনিসের নাম নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থারও নাম, পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম। অতীতেও ইসলামী সভ্যতাকে দিশারী হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে মুসলমানরা সবখানে সফল হয়েছে। এই কারণেই মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে-ইসলাম আজও পশ্চিমা বিশ্বের নিষ্ঠুর ও অন্যায় আক্রমণের শিকার। এটি ইসলামের অজ্ঞতার কারণে নয়, নয় ইসলামের কোন অভ্যন্তরীণ ত্রুটির জন্যও।
বিশ্ব অর্থনীতির সেই দৃশ্যপট, যা পাশ্চাত্যের হিংস্র পুঁজিবাদ ধরে রাখতে এবং স্থায়ী করতে চায় এবং একে ইতিহাসের চূড়ান্ত অবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তারা নিজের আধিপত্য দেখাতে গিয়ে ঘোষণা করে: পৃথিবীর ২০ শতাংশ জনসংখ্যা উত্তর গোলার্ধের মানুষ বিশ্বের ৬৮ শতাংশ সম্পাদ ভোগ করে, অথচ ৮০ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ গোলার্ধের বাসিন্দারা বিশ্বের মাত্র ১৪ শতাংশ সম্পদের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। উত্তরের ২২৫ জন ব্যক্তি এমন সম্পদের মালিক যা দক্ষিণ গোলার্ধের আড়াই বিলিয়ন মানুষের সম্পদের সমান-অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক মানবজাতি। আমেরিকার মাত্র তিন ব্যক্তি এমন সম্পদের মালিক যা জাতিসংঘের ৪৮ টি সদস্য দেশের মধ্যে মোট জাতীয় সম্পদের সমান, যা জাতিসংঘের এক তৃতীয়াংশ সদস্য দেশের সমান। এই পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যবসা হল অস্ত্র-গোলাবারুদ ও মানব ধ্বংসের ব্যবসা; এরপর মাদক ব্যবসা; তারপর দেহব্যবসা। পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা দক্ষিণ গোলার্ধ-বিশেষত ইসলামীবিশ্ব থেকে সম্পদ লুটে নিচ্ছে, তারা নিউওয়ার্কের ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ নেয় এবং সেটা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর কাছে প্রায় ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ সুদের পুনঃঋণ দেয়। এর ফলে এসব অঞ্চলের জনগণের রক্ত শুষে নেয়া হয়। ফলে এসব দেশে এসব দেশ নিজেদের রপ্তানি আয় বাড়াতে ব্যর্থ হয় এবং ঋণের সুদ পরিশোধ করতেও অপারগ হয়, ঋণের মূলধনের কথা না হয় বাদই দিলাম। দক্ষিণ গোলার্ধের ৮০ শতাংশ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা এতই নি¤œস্তরে পৌঁছেছে যে, পশ্চিমা পুঁজিবাদের দ্রুত ও অতিরিক্ত লাভের খোঁজে থাকা মূলধন উৎপাদন ও সেবাখাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা তাদের ৯৭ শতাংশ মূলধন শেয়ার বাজারের দালালি, জুয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ব্যয় করে। এর ফলে উৎপাদন ও সেবাখাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের প্রবাহ কমে যায়। এই প্রক্রিয়া দক্ষিণ গোলার্ধে- এমনকি উত্তরেও দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বাড়িয়ে তোলে এবং অনেক দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। পাশ্চাত্যের এই আধিপত্যবাদী পুঁজিবাদ মানুষের ৯০ শতাংশ মেধাকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অস্ত্র ও ধ্বংসের শিল্পে নিযুক্ত করে। এটাই বর্তমান অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার নিষ্ঠুর চিত্র।
এটাই সেই শোচনীয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চিত্র, যা পশ্চিমারা ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করে রক্ষা করতে চায় এবং স্থায়ী করতে চায়। তারা এটিকে ইতিহাসের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কারণ, তারা জানে, ইসলামী জাগরণ- যা তারা মৌলবাদ বা ফান্ডামেন্টালিজম বলে অভিহিত করে। ১৯ শতকে জামাল উদ্দিন আফগানির(১৮৩৮-১৮৯৭) নেতৃত্বে শুরু হওয়া প্যান ইসলামিজম আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতিকে এই পশ্চিমা শোষণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। এই আন্দোলন দেড় শতাব্দী আগে জামাল উদ্দিন আফগানির কণ্ঠে ঘোষণা করেছিল যে, ইসলামীঐক্যের অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো: মুসলমানদের সম্পদ শুধু মুসলমানদের জন্য ব্যবহৃত হবে। মুসলমানদের ভূমি, শিল্প ও বাণিজ্যের সুফল তাদের জন্যই বরাদ্দ থাকবে। এগুলো পশ্চিমা খ্রিস্টানরা লুটপাট করতে পারবে না। পশ্চিমা মূলধনের উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি এবং ইসলামী মূলধনের উপর ভিত্তে স্থাপন। ইউরোপের শক্তি ধ্বংস করা, যারা মুসলমানদের আবাসভূমির প্রাকৃতিক সম্পদের উপর দাঁত বসিয়ে আছে। এজন্য মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের ভূমি, খনিজ সম্পদ, বনভূমি, রেলপথ এবং কাস্টম শক্তির পুনরায় নবায়ন না করার আহ্বান জানানো হয়েছিলো। যতদিন এসব বিষয় মুসলিম বিশ্বের বাইরে থাকবে, মুসলমানরা পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল হয়েই থাকবে। আধুনিক ইসলামী জাগরণের শুরু থেকেই যেটাকে তারা মৌলবাদ নামে আখ্যায়িত করে, মুসলিম বিশ্বের সম্পদকে পশ্চিমা শোষণ থেকে মুক্ত করার প্রধান লক্ষ্য ছিল। অথচ শুধু বাহ্যিক ধার্মিকতা পশ্চিমাদের জন্য কোন হুমকি নয়। বরং, আমাদের মনোযোগ এইসব বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে পশ্চিমারা এতে আনন্দিত হয় এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ক্রুসেডের পরিকল্পনা আরও সহজ হয়। তারা ভালই জানে যে, ইসলামী জাগরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? তবে পুরো পশ্চিমাবিশ্ব এক ও অভিন্ন নয়। সব পশ্চিমারাও বিশ্বব্যাপী এই আধিপত্য প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে না। বরং সে সব দেশেও বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে এবং মুসলিমবিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করে অনেক বিক্ষোভ হয় ও তাদের দেশেও এসবের বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদ দেখা যায়। এসব ঘটননা প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা বিশ্বের ভেতরেও ন্যায় বোধ এবং অন্যায়ের বিরোধিতা রয়েছে। কারণ, ইসলাম আমাদের ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার শিক্ষা দেয়, যা মানুষ সম্পর্কে বাড়াবাড়ি ধারণা বা চূড়ান্ত খারাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরোধী।
লেখক: গবেষক ও কলামলেখক
সংবাদ শিরোনাম
মুসলিমবিশ্ব নিয়ন্ত্রণে সাম্রাজ্যবাদীরা এত মরিয়া কেন
মুসলিমবিশ্ব নিয়ন্ত্রণে সাম্রাজ্যবাদীরা এত মরিয়া কেন
-
ইলিয়াজ হোসেন রানা - আপডেট সময় ০৩:২১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- 196
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























