যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশ ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কেননা দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা, কলকারখানা, কৃষির জন্য সেচব্যবস্থা এবং যানবাহনের মতো অনেক কিছুই জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যদিও যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে সহনীয় পর্যায়ে আসতে আরও অনেক সময় লাগবে। ফলে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে কৃচ্ছ্রসাধনের দিকে যেতে হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং দামের ওঠানামা মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি সব অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে সরকার। এগুলো সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ। যুদ্ধের কারণে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থাটা খুবই নাজুক পরিণতির দিকে যাচ্ছে। এমনিতেই আমাদের অর্থনীতির শ্লথগতি আগে থেকেই চলে আসছিল; যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এটি এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এ খাতে বিশাল পরিমাণ ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে সরকারকে। আর এ ভর্তুকিকে সমন্বয় করতে গেলে মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত হবে দেশ। দেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়বে মূল্যস্ফীতি; যার ফলে দেখা যাবে আমাদের এক্সচেঞ্জ রেটও ঠিক রাখা যাচ্ছে না। বলতে গেলে যুদ্ধের দামামায় সবকিছুই আমাদের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। পুরো ম্যাক্রো ইকোনমি বা সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্রটি আমাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। বিনিয়োগ, সুদের হার, জিডিপি গ্রোথ রেট, রপ্তানি, মুদ্রা বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-যে ব্যাপারটিই বলি, এ সবকিছুই আমাদের অর্থনীতির বলয়ের ভেতরেই রয়েছে। সুতরাং একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িত। অতএব, আমাদের হিসাবের অঙ্কটি একটু সতর্কতার সঙ্গেই দেখতে হবে। এখন আমাদের কাজ হবে যুদ্ধের এ প্রভাবকে যতটা সম্ভব ঠেকিয়ে রাখা। সেজন্য কৃচ্ছ্রসাধনে সরকার অফিস সময় ৯টা-৪টা করেছে। স্কুলগুলোর ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিচ্ছে। সামনে সরকারকে হয়তো এগুলো আরও করতে হতে পারে। কারণ, যুদ্ধের শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটা হয়তো আমরা জানি না। সুতরাং, আমাদের সজাগ দৃষ্টি রেখেই সামনে এগোতে হবে। ঘাটতি বাজেটের লাগাম টেনে ধরার জন্য আমি সব সময় বলে আসছি। আমরা বারবার ঘাটতি বাজেটের ভারের নিচে চাপা পড়ছি। এ ঘাটতি বাজেটের ভারের নিচ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়বে। ঘাটতি বাজেট ইতোমধ্যেই ৬ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ মাত্রা বোধহয় সঞ্চয়পত্র ধরলে আরও বেশি হবে। সুতরাং, এটিকে সামাল দেওয়া সরকারের জন্য দুঃসহ হয়ে উঠবে। কেননা আমাদের খরচের পাল্লা অনেক ভারী। বিশাল আকারের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি সুদ-আসলে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ সুদ পরিশোধ করতেই আমাদের বিপুল পরিমাণ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
সরকারের পরিচালনাগত ব্যয়কে রাজস্ব বাজেট বলা হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন-রাজস্ব বাজেটের এত বৃদ্ধি হচ্ছে কেন? বিশেষ করে গত ১৫ বছরে রাজস্ব বাজেট সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এটি তো কাক্সিক্ষত ছিল না; কিন্তু এটি আনুভূমিক সম্প্রসারণ হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের আকারের এটির একটি সম্পর্ক আছে। সরকারের আকার যত বাড়বে, রাজস্ব বাজেট তত বাড়বে। দেশে লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে, এর সঙ্গে পাবলিক ইউনিভার্সিটি, পাবলিক মেডিকেল কলেজ, হাইস্কুল, কলেজগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যদি ধরি, তাহলে এর ব্যাপ্তি যে বিপুল অঙ্কের গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলাই বাহুল্য। এ বৃদ্ধিটা ইকোনমিক টোটাল জিডিপি প্রবৃদ্ধি যে হারে বাড়ছে, তার থেকে বেশি হারে বাড়ছে সরকারের এ ধরনের সম্প্রসারণ। অতএব, সরকারের এ আয়তন যে হারে বাড়ছে, এর লাগাম টানা না গেলে দেশের অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ৬১টি মন্ত্রণালয়, এত ডিভিশন, এত ডাইরেক্টরির প্রয়োজন আছে কি না, আমার জানা নেই। আমার কাছে আশ্চর্য মনে হয়েছে, একেকটি জেলায় ৭-৮ জন করে ডিস্ট্রিক্ট জাজ রয়েছেন। যেখানে আগে একজন মাত্র ডিস্ট্রিক্ট জাজ ছিলেন। আর একজন অ্যাডিশনাল জাজ ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের দিকেও তাই ছিল। এ বিষয়গুলো এখন সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোকে সামাল দেওয়া সরকারের জন্য একটা কঠিন কাজ হয়ে উঠছে। এ কঠিন কাজগুলো যারা ভোক্তা রয়েছেন, তাদেরও দেখতে হবে। দেখতে হবে যে আমাদের সীমাবদ্ধতা কোথায়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বহু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের বিপরীতে আমরা যে ঋণ করেছি, সে ঋণের বোঝা সুদে-আসলে যে অনেক বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ১১৫ বিলিয়ন ডলার এক্সটার্নাল ঋণ করা হয়েছে। এত বিশাল অঙ্কের ঋণ সরকারকে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। এসব ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গেলে আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ থেকেই সেটা করতে হবে। এর ফলে ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভের ওপর একটা টান পড়বে। যেটা দেশের অর্থনীতির নি¤œমুখিতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এমন অবস্থায় আরও ঋণ করার মতো পরিস্থিতি কি আমাদের পক্ষে আসবে? অর্থাৎ আমরা কি আর কোনো ঋণ পাব? আইএমএফ আমাদের সামান্য টাকা দিচ্ছে, আর খবরদারি করছে। ওরা তো খবরদারি করবেই; কারণ আমরা তাদের মুখাপেক্ষী। যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কাহিল হয়, তখন রাইটে লেফটে যারাই অর্থ দেয়, তাদের কাছ থেকেই অর্থ নিতে চাইবে সরকার। ঠিক তাই হচ্ছে। কিন্তু আমার জানামতে, আইএমএফ-এর ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য থেকে ঋণ করে কোনো দেশের অর্থনীতিই সুবিধা করতে পারেনি। এখন দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা প্রাণ ফেরাতে গেলে যেটা করতে হবে, সেটা হলো-সুদের হার কমানো। সুদের হার কমালে মানুষের হাতে যখন টাকা আসবে, তখন তারা উদ্যোগী হবে। দেশে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে, উৎপাদন বাড়বে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে। বেকার সমস্যা দূর হবে। সুতরাং, মানুষের হাতে সহজে যাতে টাকা পৌঁছানো যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারকেও নিজস্ব উদ্যোগে কিছু প্রকল্প হাতে নিতে হবে। কারণ, লোকের হাতে টাকা না গেলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হবে না। ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে চাহিদা তৈরি হবে না। চাহিদা তো এমনি এমনি বাড়বে না। তাই চাহিদা বাড়াতে যা করা প্রয়োজন, সেটা করতে হবে। কারণ, চাহিদা না থাকলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো যাবে না। ইন্টার্নাল ডিমান্ড যদি অতিমাত্রায় কমে যায়, তাহলে তো অর্থনীতি মন্দায় আক্রান্ত হবেই। তাই এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে ঋণের সুদ সংস্কার করতে হবে।
অর্থনীতিকে মন্দা অবস্থায় যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে হলে প্রাইভেট সেক্টরে অবশ্যই নিয়োগকারী বেশি হতে হবে। পাবলিক সেক্টরেও বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। তবে পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগকারী বাড়াতে হলে রাজস্ব বাজেটের আকারটা একটু কমাতে হবে। যেভাবেই হোক এ ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছুটা আলোর রেশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাইরে ট্রেনিংয়ের জন্য যাওয়া আপাতত রোধ করা হয়েছে। ডেপুটি সেক্রেটারিদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং মন্ত্রী-এমপিদের করমুক্ত গাড়ি আমদানি এখন আপাতত বাদ দেওয়াই উচিত। অর্থাৎ, সরকারের সর্বত্রই সাশ্রয় করতে হবে। সরকার সে পথেই হাঁটছে। আসলে এ বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আগে থেকেই ভাবা দরকার ছিল। তাহলে অর্থনীতি এতটা ম্লান হতো না। যাই হোক, আবার যদি আর কোনো দৈবদুর্বিপাক না আসে এবং বিশ্ব যদি যুদ্ধের দামামা থেকে রেহাই পায়, তাহলে এ আলোর দ্যুতি দেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়বে। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়; সেটা হলো, আমাদের ঋণের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কারণ, আমরা যদি ঋণের বোঝার তলে চাপা পড়ে যাই, তাহলে আমাদের কোনো পরিত্রাণ নেই। গরিব মানুষ যেটা করে, সেটা হলো একটা ঋণকে শোধ করতে গিয়ে আরেকটা ঋণ করে। ফলে ঋণের বলয় থেকে তারা আর বেরোতে পারে না। আমাদের অবস্থাটাও তাই হবে। যেটা পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও ঘানায় হয়েছে; যেটি একসময় আর্জেন্টিনায়ও হয়েছে। সুতরাং, নতুন প্রকল্প আমরা যাই করি না কেন, ঋণের করাল গ্রাস যেন আমাদের নিঃস্ব করে না দেয়, এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এজন্যই আমাদের অনুসরণ করতে হবে, ‘আয় বুঝে ব্যয় করো’। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)
অধ্যাপক আবু আহমেদ : অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
সংবাদ শিরোনাম
আয় বুঝে ব্যয় করো
-
আবু আহমেদ - আপডেট সময় ০৩:২৯:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- 192
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























