বাংলার জলাভূমি, বিল-ঝিল ও নিম্নাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম এক অনুষঙ্গ জলজ উদ্ভিদ শাপলা। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া এ জলজ উদ্ভিদটি এখন শরীয়তপুরে স্থানীয় অর্থনীতির একটি দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠেছে।
বর্ষা এলেই নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানিতে ফুটে থাকা লাল, সাদা ও বেগুনি শাপলা ফুলের অপরুপ সৌন্দর্য গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে করে তুলত আরও মনোরম। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই শাপলা এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ হয়েই নেই, নদীবেষ্টিত শরীয়তপুরের বহু প্রান্তিক মানুষের কাছে এটি পরিণত হয়েছে জীবিকা ও আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বনে।
বর্ষা মৌসুমে শরীয়তপুর জেলার বিভিন্ন বিল, ডোবা, জলাশয় ও নিচু জমিতে প্রচুর শাপলা জন্মে। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এসব শাপলা সংগ্রহ করে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করছেন নিম্নআয়ের মানুষ। ভোর থেকে নৌকা কিংবা ছোট ছোট জলযানে বিলের পানিতে নেমে শাপলা সংগ্রহ করেন তারা। পরে সেগুলো পরিষ্কার করে মুঠি বা আঁটি বেঁধে বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন নিম্নবিত্তের মানুষেরা। কারও কাছে এটি পারিবারিক আয়ের সহায়ক, আবার কারও কাছে বর্ষা মৌসুমে প্রধান আয়ের একটি উৎস।
শরীয়তপুরের বিভিন্ন বাজার ঘুরলে দেখা যায়, অন্যান্য সবজির পাশাপাশি শাপলারও আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে। জেলার সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের হাট-বাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শাপলা বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এর একটি অংশ আশপাশের জেলাগুলোর বাজারেও যাচ্ছে।
স্থানীয় বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাপলা সাধারণত মুঠি বা আঁটি হিসেবে বিক্রি করা হয়। বাজার ও মৌসুম ও প্রকারভেদে শাপলার দাম ওঠানামা করে। ১০ থেকে ১২টি শাপলা নিয়ে একটি মুঠি তৈরি করা হয়। প্রতি মুঠি শাপলা ১০ থেকে ২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়ে কমে।। কোনো মূলধন বিনিয়োগ ছাড়াই জলাশয় থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করা যায় বলে দরিদ্র মানুষের কাছে এটি আকর্ষণীয় জীবিকার উৎস হয়ে দাড়িঁয়েছে।
শাপলা সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত মানুষের অধিকাংশই নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। তাদের অনেকের নিজস্ব জমি নেই, বড় কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করার সামর্থ্য নেই। বর্ষাকালে যখন অনেক কৃষি শ্রমিকের নিয়মিত কাজ কমে যায়, তখন শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি তাদের জীবীকায়নের অবলম্বন হয়ে ওঠে। ফলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া কিংবা অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় মেটাতে শাপলা বিক্রির অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শাপলা শুধু বিক্রির ক্ষেত্রেই নয়, খাদ্য হিসেবেও গ্রামবাংলায় দীর্ঘদিনের পরিচিত সবজি। শরীয়তপুরের মানুষের খাদ্যতালিকায় শাপলার রয়েছে বিশেষ স্থান। শাপলা ভাজি, শাপলা দিয়ে ডাল, বিভিন্ন মাছের সঙ্গে শাপলার তরকারি এবং ইলিশের সঙ্গে শাপলা রান্না এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে তাজা শাপলা সহজলভ্য হওয়ায় অনেক পরিবারের খাদ্য তালিকায় শাপলার স্থান বিদ্যমান থাকে।
শরীয়তপুরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য শাপলা উৎপাদন ও সংগ্রহের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। পদ্মা, মেঘনা, কীর্তিনাশা, জয়ন্তীসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও শাখা-প্রশাখা ঘেরা এ জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল বর্ষাকালে পানিতে প্লাবিত হয়। বিভিন্ন বিল, জলাশয় ও নিচু জমিতে তখন প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় শাপলা। কোনো কোনো এলাকায় পানির বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে শাপলার পাতা ও ফুল দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহযোগ্য এসব শাপলা অনেক দরিদ্র মানুষের কাছে আয়ের উৎস।
তবে শাপলা সংগ্রহের এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক। যারা শাপলা সংগ্রহ করেন, তাদের অধিকাংশের কোনো সংগঠিত বাজারব্যবস্থা নেই। তারা সাধারণত স্থানীয় আড়তদার, পাইকার কিংবা খুচরা বিক্রেতার কাছে সরাসরি বিক্রি করেন। ফলে প্রকৃত সংগ্রহকারীরা অনেক সময় বাজারদরের পুরো সুবিধা পান না। পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক বাজারজাত এবং পরিকল্পিতভাবে শাপলা সংগ্রহ করা গেলে এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয়ের আরও কার্যকর উৎস হতে পারে। শাপলা সংগ্রহকারীদের সমবায়ভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা, বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা এবং পাইকারি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। পাশাপাশি শাপলা পরিষ্কার, বাছাই ও পরিবহনের জন্য সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে বাজারমূল্যও বাড়ানো সম্ভব।
জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে শাপলা বিক্রির দৃশ্য এখন বর্ষাকালের পরিচিত চিত্র। মাথায় বা হাতে শাপলার আঁটি নিয়ে বাজারে আসছেন নারী-পুরুষ। কেউ বিল থেকে সংগ্রহ করেছেন, কেউ আবার সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করছেন। ক্রেতারাও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী শাপলা কিনে বাড়ি ফিরছেন। এভাবে শাপলাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে একটি ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা।
সকালের সূর্য উঠতে না উঠতেই কাক ডাকা ভোরে পানিতে নেমে শাপলা সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাজারে নিয়ে আসা, বাছাই করা, আঁটি বাঁধা এবং বিক্রি করা, প্রতিটি ধাপেই শ্রম দিচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ। তাদের কাছে শাপলা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সংসারের আয়-রোজগারের একটি বাস্তব মাধ্যম। এ পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের শ্রম।
শাপলা সংগ্রহকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তালিকা তৈরি, তাদের সংগঠিত করা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারজাতকরণে সহায়তা এবং জলাভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে শাপলা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমের সম্ভাবনাও যাচাই করা যেতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজর দেওয়া দরকার।
এ প্রসঙ্গে পালং বাজারে শাপলা বিক্রেতা শরীয়তপুর সদর উপজেলার আড়িগাঁও গ্রামের আব্দুল গফুর বলেন, প্রতিদিন সকালে আমি বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করি। এ দিয়ে সংসারে খরচ মিটিয়ে ভালোভাবেই দিনযাপন করছি। ১০ টাকা মুঠি দরে প্রতিদিন আমি প্রায় ২শ” শাপলা বিক্রি করি।
শরীয়তপুরের পাশ্ববর্তী মাদারীপুরের গোবিন্দ বালা প্রতিদিন শাপলা নিয়ে শরীয়তপুরে আসেন। তিনি বলেন, আমি রাজৈর আমগ্রাম বিল থেকে শাপলা নিয়ে শরীয়তপুর আসি। বিক্রি খুব ভালো। প্রতি মোটা শাপলা ২০ টাকা দরে বিক্রি করি।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-সহকারী পরিচালক মাসুমা জান্নাত বাসসকে বলেন, শাপলা এখনো কৃষি পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়। এ সম্পর্কে আমাদের কোন গবেষণা নেই। শরীয়তপুরের বিল, ডোবা, জলাশয় ও নিচু জমিতে প্রচুর শাপলা জন্মে। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এসব শাপলা সংগ্রহ করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন নিম্নআয়ের মানুষ। তবে আগের তুলনায় এটা এখন বাণিজ্যিক ভাবে বাজারে আসছে। এটা বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টি ভেবে দেখবো।
সংবাদ শিরোনাম
শাপলা এখন শরীয়তপুরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকায়নের অংশ
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৯:০৭:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
- 3
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























