আসে উৎসব-জাগে উল্লাস, সাজে নবপল্লবে বনবিথী। নীল গগনে সাদা আর কালো মেঘের খেলা নিরবধি। প্রলয় হুংকার কত ভয়ংকর-ঝড়ে বৃষ্টি আনে তুষ্টি। গাঁয়ের মাঠে প্রাণের মেলায় সাজিয়াছে মন্ডা-মিষ্টি। নবরূপে সজ্জিত প্রকৃতির মাঝে ঘন কালো মেঘের গর্জন, সঙ্গে রং-বেরঙের উৎসব। এমন চিরায়ত রূপ নিয়ে বাংলায় আসে বৈশাখ, শুরু হয় নতুন বছর। আর নববর্ষ বরণ উৎসবকে আকর্ষণীয় করে তোলে বৈশাখী মেলা। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি, হিজরি, চন্দ্র ও সৌর সনকে ভিত্তি করে বঙ্গাব্দ প্রবর্তিত হওয়ার পর মোঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু হয়। নতুন বছরের প্রথম দিন ও মাস বৈশাখকে বরণ করতে তখন মেলাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। কালেক্রমে সেটির নাম হয় ‘বৈশাখী মেলা’। খেলনা টমটমের টুংটাং শব্দ, তালপাতার বাঁশির পু-পু-পু সুর, নাগরদোলায় দোল খাওয়া শিশু-কিশোরদের কলরবের সঙ্গে পুতুল নাচের আসর থেকে মাইকে ভেসে আসা লোকজ গান আর ঢাক ঢোলের শব্দ নিয়েই গ্রাম-বাংলায় বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় থাকে লোকজ খাদ্যদ্রব্য মুড়ি-মুড়কি, জিলাপি, রসগোল্লা, খই-চিড়া বাতাসা। গাঁয়ের বধূদের জন্য কাচের চুড়ি, পুঁতির মালা, রঙিন ফিতা, প্রসাধনীর সারি সারি দোকান। কারুপণ্য, কুটির শিল্প, হস্তশিল্পসহ নানা পণ্য ছাড়াও মাটির তৈরি পুতুল, কাঠের গাড়ি, বাঁশের কুলা-চালুনসহ নানা ধরণের শিশু-কিশোর খেলনা সামগ্রীর পসরা সাজায় ধনবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার দোকানিরা। পুতুল নাচ, সার্কাস, যাত্রাগান, কবিয়াল গান, লাঠি খেলা, যাদু প্রদর্শনী ইত্যাদি বিনোদনে মুখরিত থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। আর মেলার এ দিনটির জন্য বছরজুড়ে অপেক্ষায় থাকে গাঁয়ের বধূ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষ। মেলায় যেতে যেতে গাঁয়ের মেঠো পথে শিশু-কিশোরদের দুরন্তপনায় ছুটে চলা ও পাগলা হাওয়ায় দোল খাওয়া সবুজ ধানের ক্ষেতে ভাই-বোনের লুকোচুরি খেলা আনন্দটা আরও বাড়িয়ে দেয়। আর মেলা থেকে ফেরার পথে তালপাতার বাঁশি, খেলনা টমটম গাড়ি ও কিশোরীর হাতে কাচের চুরির ঝনঝন আওয়াজে মুখরিত থাকে ধনবাড়ী উপজেলার পথ-প্রান্তর। টাঙ্গাইল জেলা ধনবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধনবাড়ী সরকারি নওয়াব ইনস্টিটিউশন স্কুল মাঠে প্রতিবছরই বসে এমন এক ঐতিহ্যবাহী মেলা। শত শত বছর ধরে চলে আসা মেলাটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও এখানে কাঠের মেলাটিও ঐতিহ্যপূর্ণ। এসব মেলা তিনদিন থেকে সাত দিনব্যাপী হয়ে থাকে। বৈশাখ উপলক্ষে ধনবাড়ী উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলে বৈশাখী মেলা । প্রতি বছরের মতো এবারো এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ রোজ সম্বার দেকে শুরু হচ্ছে বৈশাখি মেলা। শত বছর ধরেই এ মেলা চলে আসছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। এছাড়াও চৈত্র সংক্রান্তি আর বৈশাখ উপলক্ষে অসংখ্য মেলা বসে ধনবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জ। শতাব্দী ধরে চলে আসা মেলাগুলোর কথাই লোকমুখে বেশি প্রচারিত। ধনবাড়ীতে বৈশাখী উৎসবে সকাল সকালেই অংশ নিয়ে থাকেন। সকালে মঙ্গল শোভাযাত্র আর শহরের বিভিন্ন স্থানে পান্তা-ইলিশের মেলার পাশাপাশি লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই নববর্ষ পালন করা হয়।