পৃথিবীর জীবনে মানুষ কতভাবেই না অন্যকে খুশি করার চেষ্টা করে! কখনো সম্পদ ব্যয় করে, কখনো নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, আবার কখনো প্রিয় মানুষের মন রক্ষায় নানা ত্যাগ স্বীকার করে। অথচ যে মহান সত্তার সন্তুষ্টির ওপর মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা নির্ভরশীল, সেই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার চিন্তা কতটুকু আমাদের মনে জাগ্রত থাকে? আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় বিষয়।
এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭২)
নি¤েœ কোরআন ও হাদিসের আলোকে এমন কিছু আমলের কথা তুলে ধরা হলো যেসব আমলে আল্লাহ বেশি খুশি হন।
১. আন্তরিকভাবে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা : মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে পাপ ও ত্রুটির শিকার হয়।
কিন্তু আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা সে নয়, যে কখনো ভুল করে না; বরং সে, যে ভুল করার পর নিজের অপরাধ উপলব্ধি করে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। পাপের পর তাওবা করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২২)
আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় ওই ব্যক্তির চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া তার বাহন ফিরে পায়।
’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৪৭)।
২. ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা : আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো তাঁর ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা। অনেক মানুষ নফল ইবাদতে আগ্রহী হলেও ফরজ ইবাদতের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। অথচ ফরজ আমলের বিকল্প কোনো নফল আমল হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,: ‘তাদের তো কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।
’ (সুরা : বাইয়িনাহ, আয়াত : ৫)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,আমার বান্দা যেসব কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো সেই কাজগুলো, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)
সুতরাং আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে হলে প্রথমেই নামাজ, রোজা, জাকাতসহ যাবতীয় ফরজ বিধান যথাযথভাবে পালন করতে হবে। এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
৩. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করা : আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় না তার সম্পদ, বংশ, পদমর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে। বরং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যার অন্তরে রয়েছে সবচেয়ে বেশি তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
তাকওয়া হলো প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। মানুষ যখন নির্জনেও পাপ থেকে বিরত থাকে, হারাম উপার্জন পরিহার করে এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, তখনই তার মধ্যে প্রকৃত তাকওয়ার পরিচয় ফুটে ওঠে।
৪. মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ ও সদাচার করা : ইসলাম শুধু আল্লাহর হক আদায়ের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের অধিকার রক্ষা এবং তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করারও নির্দেশ দেয়। মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, অসহায়কে সহযোগিতা করা এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনÑএসবই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
তাই মানুষের প্রতি দয়া, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; বরং এগুলো আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম।
৫. ধৈর্য ও বিপদে অবিচল থাকা : মুমিনের জীবনে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও বিপদাপদ আসবেই। কখনো অসুস্থতা, কখনো দারিদ্র্য, কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, আবার কখনো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
و ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি কতই না বিস্ময়কর! তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।’ এরপর তিনি বলেন, মুমিন সুখ-শান্তি লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর বিপদে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)।
অর্থাৎ মুমিনের জীবনে সুখ এলে সে অহংকারী হয় না, আবার দুঃখ এলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশও হয় না। বরং প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে।
৬. আল্লাহর পথে ব্যয় করা ও অসহায়দের সহযোগিতা করা : সম্পদ মানুষের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এই সম্পদ শুধু নিজের ভোগবিলাসে ব্যয় করার জন্য নয়; বরং অসহায়, দরিদ্র, এতিম ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় সম্পদ থেকে অন্যকে সাহায্য করে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। আল্লাহ তাআলা বলেন,‘যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের জন্য সহজতা সৃষ্টি করে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সহজতা সৃষ্টি করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
সুতরাং মানুষের অভাব দূর করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া এবং বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অত্যন্ত মহৎ কাজ।
৭. রাগ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করা : মানুষের প্রতি রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা অনেক সময় সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। অথচ যে ব্যক্তি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যকে ক্ষমা করে দেয়, সে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান করলে সম্পদ কমে না। ক্ষমা করার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সম্মানই বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
অতএব, রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, মানুষের ভুল ক্ষমা করা এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া একজন মুমিনের মহৎ গুণ।
৮. আল্লাহর ওপর ভরসা করা : জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষ চেষ্টা করবে, পরিকল্পনা করবে, উপায়-উপকরণ গ্রহণ করবে; কিন্তু ফলাফলের ব্যাপারে নির্ভর করবে একমাত্র আল্লাহর ওপর। কারণ সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাঁরই হাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর নিজের বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা। যে বান্দা বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, অভাবের সময় তাঁর কাছেই সাহায্য চায় এবং সফলতার সময় তাঁরই শুকরিয়া আদায় করে, সে প্রকৃত তাওয়াক্কুলের পরিচয় দেয়।
৯. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ইনসাফ করা : ইসলামে ন্যায়বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। নিজের স্বার্থ, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতার কারণে কারো প্রতি অন্যায় করা যাবে না। বরং সব অবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৪২)
অতএব, পরিবার, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম উপায়।
১০. নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা : ফরজ ইবাদত আদায়ের পাশাপাশি নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা মুমিনের জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য। তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও দোয়াÑএসব আমল বান্দাকে আল্লাহর আরো কাছাকাছি নিয়ে যায়। সহিহ বুখারির হাদিসে আল্লাহ তাআলা বলেন,: ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)।
এরপর আল্লাহ বলেন, যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, হাত ও পা হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শোনে, দেখে, ধরে ও চলে। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাকে তাঁর পছন্দনীয় কাজে পরিচালিত করেন এবং তাঁর অপছন্দনীয় কাজ থেকে রক্ষা করেন। এটি আল্লাহর বিশেষ সাহায্য ও তাওফিকের বর্ণনা; সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার একীভূত হওয়ার অর্থ নয়। সুতরাং যে বান্দা ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করার পাশাপাশি নিয়মিত নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হয়, সে আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
সংবাদ শিরোনাম
বান্দার যে ১০ আমলে আল্লাহ বেশি খুশি হন
-
মুফতি ওমর বিন নাছির - আপডেট সময় ০৯:৪৭:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- 10
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























