নবীজি (সা.) বলেন, দাজ্জাল পূর্বাঞ্চলীয় কোনো স্থান থেকে বের হবে। স্থানটির নাম হলো খোরাসান। কিছু লোক তার অনুসরণ করবে। তাদের চেহারা হবে স্ফীত চ্যাপ্টা ঢালের মতো। (তিরমিজি, আস-সুনান, ২২৪০)
খোরাসান মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। নবীযুগে বর্তমান উত্তর-পূর্ব ইরান (নিশাপুর, তুশ, মাসহাদ, গুরগান, দামাঘান), উত্তর-পশ্চিম আফগানিস্তান (হেরাত, বালখ, কাবুল, গাজনি, কান্দাহার), দক্ষিণ তুর্কমেনিস্তান (মেরি প্রদেশ-মার্ভ, সানজান), উত্তর-পশ্চিম তাজিকিস্তান (সুগ্ধ প্রদেশের খোজান্দ, পাঞ্জাকেন্ত), উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব উজবেকিস্তান (সামারকান্দ, বুখারা, সেহরিসাবজ, আমু নদী ও সীর নদীর মধ্যাঞ্চল), উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তান (মালাকান্দ, সোয়াত, দীর, চিত্রাল) ও দক্ষিণ কাজিকিস্তানের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল খুরাসানের অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হতো। এই অঞ্চলের উত্তরসীমায় ছিল আমু দরিয়া নদী, পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে মধ্য ইরানের মরু অঞ্চল ও পূর্বে মধ্য আফগানিস্তানের পার্বত্য উচ্চভূমি।
খুরাসানের একটি প্রসিদ্ধ এলাকা ছিল ‘ইসফাহান’।
বর্তমান ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালার পাদদেশে জায়েন্দে নদীর তীরে শহরটি অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে প্রাচীনকালের ব্যবসায়ী কাফেলার চলাচলের মহাসড়কের মাঝে অবস্থানের কারণে ইসফাহান যেমন আরব-অনারবদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায়, তেমনি ইউরোপ এবং দূরপ্রাচ্য আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক শহর হিসেবে পরিগণিত হয়। নবীজির (সা.) অন্য একটি হাদিসে দাজ্জাল প্রকাশের স্থান খোরাসানের ইসফাহানকে সুর্নিদিষ্ট করেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দাজ্জাল ইসফাহানের ইহুদিয়া থেকে বের হবে।’ (মুসনাদ আহমদ, মুসনাদ, ২৪৫১১)
ইরানের রাজধানী শহর তেহরান থেকে ৩৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম নগরী ইসফাহান। প্রদেশ হিসেবে তা কেন্দ্রীয় ইরানের এক লাখ ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। ইসলামী স্থাপত্য, ছাদ ঢাকা সেতু, মসজিদ ও মিনারের অসাধারণ সৌন্দর্য শহরটিকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে রেখেছে। ইসফহানের সৌন্দর্য কিংবদন্তিতুল্য। ইরানে প্রবাদ প্রচলিত আছে—‘ইসফাহান নেস্ফে জাহন আস্ত’ যার অর্থ ‘ইসফাহান পৃথিবীর অর্ধেক।
নবীজি (সা.) হাদিস অনুযায়ী, এখানকার ‘ইয়াহুদিয়া’ থেকে দাজ্জাল আতœপ্রকাশ করবে। ইবন কাসির (রহ.) বলেন, তার আবির্ভাবের সূচনা হবে ইসফাহান থেকে; এখাকার একটি এলাকা থেকে যাকে ‘আল-ইয়াহুদিয়া’ বলা হয়। (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, পৃ. ৫৯)
ইবন আল-ফাকিহ একটি ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন যে ইহুদিরা বখতনসরের ধ্বংসলীলা থেকে পালিয়ে আসার সময় সঙ্গে করে জেরুজালেম থেকে পানি এবং মাটির নমুনা নিয়ে এসেছিল। তারপর প্রতিটি জায়গার পানি এবং মাটি পরীক্ষা করে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু কোনো শহরে তারা বসতি স্থাপন করেনি। ইসফাহান শহরের পানি ও মাটি পরীক্ষা করে দেখল উভয়-ই জেরুজালেমের অনুরূপ। তারপরে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। ফলে মহল্লাটির নাম হয় ইয়াহুদিয়া। (ইবন আল-ফাকিহ, কিতাবুল বুলদান, পৃ. ২৬১-২৬২)
ইবন হাজার আসকালানী (রহ.) ইয়াহুদিয়া সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছেন। ব্যবিলনের রাজা বখতনসর যখন বাইতুল মাকদিসে আগ্রাসন চালিয়েছিল তখন ইহুদিদের একটি বড় অংশ জেরুজালেম ছেড়ে ইসফাহানে এ ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে ওই এলাকার নাম হয়ে যায় ইয়াহুদিয়া। ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসফাহানি ইহুদিদের বিশেষ এক মর্যাদা রয়েছে। (ফাতহুল বারি, ৩০/৪৫)
ইবন হাজারের মূল্যায়নে নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের সময়ে সন্দেহকৃত দাজ্জাল ইবন সাইয়্যাদ একসময় তার বন্ধুদের নিয়ে ইসফাহানে অদৃশ্য হয়েছে। (ফাতহুল বারি, ১৩/৩২৮)
ইসফাহানের অন্তর্গত ইরানের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী শহর ‘মারু’। ঐতিহাসিক ‘মারু’ ইরান ও তাজিকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চল। তাজিকিস্তানের অংশের বর্তমান নাম ‘মারু’। নাঈম ইবন হাম্মাদ (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী দাজ্জাল মারূর ইহুদিদের থেকে বের হবে। (নাঈম ইবন হাম্মাদ, কিতাবুল ফিতান, ১৪৯৫) তাঁর সংকলিত আরেকটি হাদিস অনুযায়ী, দাজ্জালের বের হওয়ার সঙ্গে একটি সাগর উপকূলীয় অঞ্চল সংশ্লিষ্ট (নাঈম ইবন হাম্মাদ, আল-ফিতান, ১৪৯৩)
আল-কাজবিনি (রহ.) ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী উপকূলে ‘কেলেস্তান’ পাহাড়কে এমনটি একটি এলাকা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। যেমনটা তিনি লিখেছেন—
‘খোরাসান একটি প্রসিদ্ধ ভূমি; পূর্বে ট্রানসক্সিয়ানা এবং পশ্চিমে কাহিস্তান; তার প্রধান শহরগুলো মারু, হেরাত, বালখ ও নিশাপুর। এটি আল্লাহর সৃষ্ট পৃথিবীর অপরূপ সৌদর্যময় , জনবহুল এবং অত্যধিক কল্যাণকর ভূমি। তার অধিবাসীরা রূপের অনুপম, বুদ্ধিতে নিখুঁত, স্বভাব-প্রকৃতিতে ন্যায়শ্রেষ্ঠ এবং ধর্ম ও জ্ঞানে অগ্রগামী। সেখানে ‘কেলেস্তান’ নামক একটি পাহাড় রয়েছে; খোরাসানের কোনো কোনো ফকিহ আমাকে বলেছেন যে এই পাহাড়ে একটি গুহা আছে যা খিলান সদৃশ এবং তাতে রয়েছে একটি প্রাসাদ যাতে আছে গলি সদৃশ পথ; একজন ব্যক্তি ঝুঁকে বাঁক নিয়ে অগ্রসর হতে পারে; তারপর ট্যানেলের শেষে কিছু আলো মিলে। দেখতে এটি যেনো পরিবেষ্টিত গোলাবাড়ি সদৃশ, তাতে রয়েছে একটি ঝর্ণা যা থেকে পানি প্রসবণ হয়; সে ঝর্ণার ওপরে রয়েছে একটি পাথর যা লোহা সদৃশ। আর সে গোলাবাড়িতে রয়েছে একটি গহবর যা দিয়ে প্রচ- বায়ু নিসরিত হয়; প্রবল ঝঞ্ঝায় কারো পক্ষে সেখানে প্রবেশ দুঃসাধ্য।’ (জাকারিয়া ইবন মুহাম্মদ আল-কাযবিনী, আসারুল বিলাদ ওয়া আখবারুল ইবাদ, পৃ. ৩৬১-৩৬২)
দাজ্জালের অবস্থান সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক সাহাবি তামিম আদ-দারির ঘটনা, যা নবীজি (সা.) সাহাবিদের বর্ণনা করে শুনিয়েছিলেন, সেখানে নবীজি (সা.) বলেন, ‘সাবধান! সে সিরিয়া সাগরে বা ইয়ামান সাগরে রয়েছে; না, বরং সে পূর্বদিকে আছে, সে পূর্বদিকে রয়েছে, সে পূর্বদিকে রয়েছে। এ সময় তিনি তার হাত দ্বারা পূর্ব দিকে ইশারাও করলেন।’ (মুসলিম, আস-সহিহ, ৭১১৯)
এ হাদিসে দাজ্জাল ছাড়াও ‘জাসসাসাহ’ নামক একটি অদ্ভুত প্রাণীর কথা বলা হয়েছে যে সে দ্বীপে দাজ্জালের জন্য গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে। আল-কাজবিনি ‘জাজিরাতুল জাসসাসাহ’ বলতে ‘কাস্পিয়ান সাগরের দ্বীপ বুঝিয়েছেন। (আল-কাজবিনি, আসরারুল বিলাদ, ১৭৮)
দাজ্জাল জাবালু কেলেস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে ইসফাহানের মারু হয়ে ইয়াহুদিয়া প্রবেশ করবে। আয়েশা (রা.) বলছেন যে ইয়াহুদিয়া থেকে তার গন্তব্য হবে মদিনা। (মুসনাদ আহমদ, মুসনাদ, ২৩৯৪)
তবে মদিনায় আসার পথে খুজিস্তান ও কিরমানে অবতীর্ণ হবে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি যে অবশ্য-ই দাজ্জাল সত্তর হাজার স্ফীত চ্যাপ্টা ঢালের মতো চেহারার লোক নিয়ে ‘খুজ’ ও ‘কিরমানে’ অবতীর্ণ হবে। (আহমদ, মুসনাদ, ৮২৪৮)
তারপর সে দজলার পারে কুসায় আসতে পারে। মুয়াবিয়ার (রা.) সামনে উপস্থিত আবদুল্লাহ ইবন আমরকে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি কি ‘কুসা’ নামক একটি এলাকা চেনো, যা খুব লবণাক্ত ভূমি? সে বলল, হ্যাঁ! তিনি বললেন, সেখান থেকে দাজ্জাল বের হবে। (নাঈম ইবন হাম্মাদ, আল-ফিতান, ১৫০৪)
কুসার বর্তমান নাম ‘তাল্ল ইবরাহিম যা দজলা নদীর পারে অবস্থিত। (জি. লে স্ট্রেঞ্জজ, বুলদান আল-খিলাফাহ আশ-শারকিয়্যাহ, পৃ. ৯৫-৯৬)
স্থানটিকে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর জন্মস্থান মনে করা হয়। একটি হাদিসে দাজ্জাল বের হওয়ার স্থান হিসেবে ‘ইরাক ও শামের মধ্যবর্তী ‘খুল্লা’ নামক স্থানের উল্লেখ রয়েছে, ‘নিশ্চয় সে (দাজ্জাল) সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী ‘খুল্লা’ নামক স্থান থেকে বের হবে। অতঃপর ডানে-বামে সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। (ইবন মাজাহ, আস-সুনান, ৪০৭৭)
‘খুল্লা’ মূলত দাজ্জালের জাজিরাতুল আরবে প্রবেশের পথ যা উভয় শহরের মধ্যবর্তী কোনো স্থান। কাজি আয়াজ অবশ্য ‘খুল্লা’ শব্দটিকে ‘হুল্লা’ মনে করেন, যা দজলার পারে অবস্থিত একটি গ্রাম।
আরব ভূমিতে প্রবেশের পূর্বে ডানে-বামে বিপর্যয়ের কথা বলা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) মনে করতেন, দাজ্জাল কর্তৃক কুফা আক্রান্ত হবে। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি দাজ্জাল কর্তৃক তোমাদের সর্বপ্রথম আক্রান্ত গৃহগুলোর অধিবাসীদের সম্পর্কে আমি অবহিত, হে কুফাবাসী!’ (ইবন আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৩৮৬৯৪)
কাব (রা.) বর্ণনা মতে, দাজ্জাল গুরুত্বপূর্ণ শহর বসরাতেও অবতীর্ণ হবে। তিনি বলেন, ‘সর্বপ্রথম দাজ্জাল যে পানিতে অবতীর্ণ হবে তা হলো বসরার উঁচু পাহাড়ের পাদদেশের পানি। সেখানে অনেক বালি মিশ্রিত পানি রয়েছে, তাতে দাজ্জাল সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হবে। (নাঈম ইবন হাম্মাদ, আল-ফিতান, ১৫০৭)
হাদিসগুলোতে বিধৃত একাধিক স্থানে দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের বর্ণনা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে পাঠ করলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে এসব স্থান সবই পূর্বদিকে অবস্থিত। হতে পারে কোনো এক স্থানে দাজ্জাল প্রকাশের পর আবার অদৃশ্য হয়ে আরেক স্থানে প্রকাশিত হবে, হতে পারে একেবারে পূর্বদিক থেকে প্রকাশিত হয়ে একেকটি স্থান অতিক্রম করে ক্রমাগত আরব ভূমিতে প্রবেশ করবে।
দাজ্জালের একমাত্র গন্তব্য মদিনা হলেও সে তাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি, আস-সহিহ, ৬৬৪৮)
তবে সে মদিনার বাইরে জুরুফের এক অনুর্বর লবণাক্ত ভূমিতে অবতরণ করবে এবং এখানেই সে তার শিবির স্থাপন করবে। (মুসলিম, আস-সহিহ, ৭১২৪)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, মাসিহ দাজ্জাল মদিনা আক্রমণের উদ্দেশে এসে উহুদ পাহাড়ের পশ্চাতে অবতরণ করবে এবং ফেরেশতারা তার মুখ (গতি) সিরিয়ার দিকে ফিরিয়ে দেবে আর তথায় সে ধ্বংস হবে।’ (মুসলিম, আস-সহিহ, ৩২১৭)
ফলে মদিনা থেকে সে সিরিয়ার অভিমুখে অগ্রসর হবে। মানুষেরা তার ভয়ে পাহাড়ে পালিয়ে যাবে। (মুসলিম, আস-সহিহ, ৭১২৬)
তারপর সিরিয়ার ‘আকাবা আফিক’ নামক স্থানে তার ধ্বংস হওয়ার কথা হাদিসে বিধৃত হয়েছে। (আহমদ, মুসনাদ, ২১৪২২)
‘আকাবা আফিক’ বর্তমানে জর্ডানের হাওরানের গ্রামগুলোর একটি। বর্তমানে তাকে ‘ফিক’ নামে ডাকা হয় যা আল-গাওরের পথে প্রথম আকাবার নিকট অবস্থিত। তার দৈর্ঘ্য প্রায় দুই মাইল (ইয়াকুত আল-হামাভি, মুজামুল বুলদান, ১/২৩৩)
নবী ঈসা (আ.)-এর ভয়ে দাজ্জাল পালিয়ে ‘লুদ্দ’ নামক শহরে আশ্রয় নেবে। নবী ঈসা (আ.) তাকে হত্যার জন্য খোঁজ করবেন এবং লুদ্দের নগরদ্বারে পেয়ে হত্যা করবেন। (তিরমিজি, আস-সুনান, ২২৪০)
লুদ্দ বর্তমান ইসরায়েল অধিকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখ-ের একটি ছোট শহর, যা তেলআবিব থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।
আল্লাহ তাআলা শেষ যুগের ফিতনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমিন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা