বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম ::
খুলনাঞ্চলে নদী খননে বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত, শতাধিক যাত্রী আহত আত্রাই এলাকার উন্নয়নে আমার চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না-এমপি রেজু শেখ রাজশাহীতে সমাহিত করা হবে অভিনেতা শামস সুমন ধামইরহাটে দল ও জনগণের সমর্থন পেলে পৌরবাসীর সেবা করতে চান আনোয়ারুল ইসলাম কয়রায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ করলেন এমপি আবুল কালাম আজাদ তারাকান্দায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেক অসহায় ও দুঃস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ এনাম ডেন্টাল অ্যান্ড আই কেয়ারের উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পৌঁছাল নিহত বিএনপি নেতা অলিউল্লাহ মোল্যার বাড়িতে নড়াইলের লোহাগড়ায় জিয়া পরিষদের আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল

মো. শাহ্জাহান আলীর দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী আজ

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি :
  • আপডেট সময় সোমবার, ৯ আগস্ট, ২০২১

দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক খবরপত্র’র টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা প্রতিনিধি মো. সেলিম হোসেনের পিতা মো. শাহ্জাহান আলীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট এই দিনে হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। এ উপলক্ষে উপজেলার আলমনগর ইউনিয়নের নবগ্রাম মরহুমের নিজ বাড়ীতে কোরআন খতম, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং কবর জিয়ারত করা হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাক্সক্ষীদের কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়েছে। মো. শাহ্জাহান আলী নবগ্রাম উত্তরপাড়ার মন্ডল বংশের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মো. মোকছেদ আলী ও সুমারী দম্পত্তির একমাত্র সন্তান ছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষা সনদানুযায়ী তার জন্ম তারিখ ১অক্টোবর ১৯৬৮ খ্রি.। মাত্র ৫১বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে নাফেরার স্বর্গের দেশে চলে যান। তিনি গোপালপুর পৌরসভার সূতী হিজুলী পাড়ার দরাজ আলী মন্ডলের মেয়ে শিরিনা বেগমকে বিয়ে করে দাম্পত্যজীবন শুরু করেছিলেন। তাদের ঘরে তিনপুত্র মো. সেলিম হোসেন, মো. শিহাব উদ্দিন ও মো. সাব্বির হোসেন এবং দুই মেয়ে মোছা. সালমা খাতুন ও শাপলা। কর্মজীবনে তিনি নবগ্রাম দাখিল মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি পদে চাকরি করতেন। পাশাপাশি তিনি কবিরাজী চিকিৎসায় পারদর্শী ছিলেন। রাতদিন রোগীদের সেবায় নিযুক্ত থেকে মানুষের কাছ থেকে সুনাম, ভালোবাসা, আস্থা ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসকের খেতাব অর্জন করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি সমাজসেবা ও মানুষের কল্যাণার্থে সকলপ্রকার সেবামূলক কাজে সারাক্ষণ নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তাঁর স্মৃতিচারণ করে বড় ছেলে সেলিম হোসেন বলেন, ২০১৯ সালের ২২ জুন শনিবার সকালে পেশাগত কাজে গোপালপুর থেকে সিএনজিযোগে ধনবাড়ী যাচ্ছিলাম। মাঝপথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করি। সেময় জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে আমার ডান পায়ের হাঁটু থেকে কেটে ফেলতে হয়। টানা দুই মাস হাসপাতালে থাকার পর, ঈদুল আযহা উপলক্ষে আমার ছুটি মেলে। হাসপাতাল থেকে সাত আগস্ট ২০১৯ইং বাড়ি ফিরে আসি। আমার বাবা ছিলেন হার্টের রোগী। তিনি আমার ক্ষতস্থানটি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি। রাতদিন আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট শনিবার দুপুরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের মত স্বর্গের দেশে চলে যায়। বাবার এই অকাল চলে যাওয়া আট-দশটা মানুষের চলে যাওয়ার মত না। তিনি শুধু আমার শোকে দিনরাত ধুকে ধুকে কষ্ট পেয়ে চলে গেছেন। সন্তানের জন্য পিতার এভাবে চলে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আমার পা কেটে ফেলার পর থেকে আমাকে নিয়ে বাবা সারাক্ষণ চিন্তিত থাকতেন। কারো সাথে ঠিকমত মিশতেন না। কথা কম বলতেন। সারাক্ষণ তাঁর চোখে মুখে কান্নার ছাপ লক্ষ করা যেত। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বাবা আমার চিকিৎসা করান। জমিজমা যা আছে সব বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বাবার কথা, ‘যে কোনো মূল্যে ছেলেকে জীবিত দেখতে চান। এতে তাঁর জমিজমা ও জমানো অর্থ সব চলে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। তবু ছেলেকে বাঁচাতে হবে।’ মহান আল্লাহ পাক আমাকে বাঁচিয়ে বাবার সেই স্বপ্নকে পূরণ করেছেন। কিন্তু বাবাকে নিয়ে গেছেন পরপারে। মনে হয়, তিনি প্রভূর দরবারে তাঁর আয়ুর পরিবর্তে আমার জীবন বাঁচানোর প্রার্থনা করেছিলেন। আর মহান আল্লাহ সেই প্রার্থনা কবুল করেছেন। সন্তানের জন্য পিতার এই আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি বাড়ী ফেরার পর, কেটে ফেলা পায়ের অবশিষ্ট অংশের ভয়ংকর ক্ষতস্থানটি দেখে অনেকের পিলে চমকে যেত। একবার একপলক যে আমাকে দেখতো, সে আর দ্বিতীয়বার তাকানোর সৎ সাহস পেতো না। অনেকে ঘুমের ঘরে আমার ক্ষতটির কথা মনে করে ভয়ে ঘুমাতে পারতেন না। সে সময় আমার এই করুণ পরিনতি দেখে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মুখে মুখে রটে গিয়েছিল, এ ছেলে আর বাঁচবেনা। বাঁচার কোনো লক্ষণ নেই। এ সব কথাবার্তা বাবার কানে পৌছে। তিনি আরো ব্যথিত ও মর্মাহত হন। সব সময় তাঁর মনে হতাশার কালো মেঘ জমে থাকতো। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী, বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ। এ লাশ কাঁধে নেওয়ার স্বপ্ন কোনো বাবারাই দেখেন না। আমার বাবাও দেখতে চাননি। তাই সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। শুক্রবার রাতে আমার কক্ষে মেঝভাই শিহাব ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করে দেওয়ার সময় হঠাৎ করে বাবা রুমে প্রবেশ করে ভয়ংকর ক্ষতস্থানটি দেখে ফেলেন। যা বাবাকে এর আগে দেখাইনি। কারণ আমরা জানি, এতবড় আঘাত বা ক্ষতটি দেখে বাবা নিজেকে সামাল দিতে পারবেন না। তারপরেও অসাবধনার কারণে বাবা আমার রুমে এসে এ দৃশ্য দেখে নিজের অজান্তেই চেয়ারে বসে ঘামতে শুরু করেন। মেঝ ভাইটি তখন দ্রুত ক্ষতস্থানটি লুঙ্গি দিয়ে ডেকে ফেলে। কিছুক্ষণ পরে বাবা তাঁর পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে হিসাব দিলো। তাতে লেখা, সেদিন পর্যন্ত আমার চিকিৎসায় খরচ হয়েছে আট লাখ টাকা। এ টাকা কিভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। কার কাছ থেকে কত টাকা নেয়া হয়েছে। এ সব হিসাব সুন্দর করে লিখে রেখেছেন তিনি। আমাকে এ অবস্থায় দেখে তিনি নিজেকে বেশি সময় ধরে রাখতে পারলেন না। হিসাবটি দিয়েই কান্নাভেজা বদন লুকিয়ে তিনি তাঁর ঘরে চলে গেলেন। পরের দিন শনিবার (১০ আগস্ট) ঈদুল আজহার একদিন আগের দিন ও মক্কায় হাজীদের পবিত্র হজ্জ পালনের দিন। বাবা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ করে আমাকে দেখতে ঘরে আসেন। খুব ভোরে ঘরটা ছিলো কিছুটা অন্ধকার। তখনো আমি ঘুমিয়ে আছি। ঘরের আলো না জ্বালিয়ে আধোআলো ছায়াতে বাবা আমাকে দেখে চলে যান। সকাল এগারোটার দিকে নবগ্রাম বাজার থেকে খবর আসে, বাবা রেজাইল করিম তুলা কাকার দোকান ঘরের বেঞ্চের উপর বসে থাকাবস্থায় মাটিতে পরে যান। স্থানীয় লোকজন বাবাকে ধরে পাশের পল্লী চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম বাদশার কাছে নিয়ে যান। তিনি তাঁকে দেখে দ্রুত গোপালপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পরামর্শ দেন। আমার দু’ভাই বাবাকে দ্রুতই একটি অটো ইজিবাইকে করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। দুপুর বারটার দিকে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক বাবাকে মৃত ঘোষণা করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এ খবর শুনে আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। দু’চোখে শুধুই অন্ধকার দেখতে লাগলাম। দৌড়ে বাবার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে হলো। অথচ বিছানা থেকে নামার শক্তি তখন আমার নেই। বালিশ থেকে মাথা তুলে কাউকে দেখার শক্তি নেই। এমতাবস্থায় বন্ধি খাচায় আহত পাখির মত ছটফট করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। যোহর নামাজের পর বাবার লাশ বাড়ীতে আনা হলো। প্রতিবেশি ও স্বজনরা মিলে লাশের গোসল করালেন। কাফনের কাপড় পড়ালেন। কেউবা আবার কবর খনন করলেন। বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটলেন। কিন্তু এ সবের কোনো কিছুই আমি করতে পারলাম না। এমনকি বাবার মুখটিও দেখতে পারলাম না। কি করে দেখবো-কাটা পা ও দুর্বল শরীর নিয়ে আমি তো বিছানা থেকে নামতেই পারিনা। জানিনা পিতার মৃত্যুতে পৃথিবীর কোনো সন্তান আমার মত এমন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে কি না। পরিবারের একমাত্র উপর্জনশীল ব্যক্তি ছিলেন আমার বাবা। বটবৃক্ষের ছায়ার মতো আমরা বাবার ছায়াতলে নিরাপদ ছিলাম। আজ আমি পা হারিয়ে পঙ্গু। বাঁচনো কি না, তা কেউ বলতে পারছেনা। বলার কথাও না। কারণ সে ক্ষমতা আল্লাহ মানুষকে দেন নাই। এমতাবস্থায় আমার মৃত্যু না হয়ে বাবার মৃত্যু। এ যেনো মরার উপর খাড়ার ঘা। অবশেষে কয়েকজন মিলে বাবার লাশটি খাঁটিয়ায় তুলে কাঁধে করে আমার ঘরের দরজায় নিয়ে আসে আর আমাকে কয়েকজনে ধরে বিছানা থেকে তুলে দরজার কাছে নিয়ে যায়। তখন আমার বাবার মুখটা শেষ বারের মত দেখতে পাই। কেন জানি এ সময় আমার কান্নার পরিবর্তে মুখে হাসির ঝিলিক ঢেউ খেয়ে যায়। তার কারণ হলো, আমি হাদীসে পড়েছি, মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে যাঁদের বেহেস্ত নসীব করবেন, তাঁদের চেহারায় মৃত্যুর সময় নূর চমকাবে। অর্থাৎ তাঁদের চেহারা জীবতাবস্থার চেয়ে আরো উজ্জ্বল হবে। আমি শেষ দর্শনে আমার বাবার মুখে সেই নূরানীর নূর চমকাতে দেখেছি। আমার বিশ্বাস মহান আল্লাহ বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করবেন, ইনশাআল্লাহ্। এক পলক দেখতেই লাশটি জানাজা করার জন্য নবগ্রাম দাখিল মাদরাসা মাঠে নিয়ে যায়। হাজারো মুসুল্লির উপস্থিতিতে জানাজা নামাজ শেষে মাদরাসার উত্তর পাশে সামাজিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়। আমি এমনি এক হতভাগা সন্তান যে তাঁর বাবার জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। কবরস্থানে গিয়ে তিন মুঠো মাটি দিতে পারেনি। এ কথা যখন মনে হয়, তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারিনা। কষ্টে বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। পৃথিবীর বুকে এমন ছেলের বেঁচে থাকা আর না থাকার মাঝে কোন তফাৎ নেই। এমন পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেনো আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউন দান করেন।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com