ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ৬৪ জেলায় সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রমের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের Logo অন্যায় করে কেউ পার পাবে না; ডা. শফিকুর রহমান Logo বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও সহিংসতা হ্রাস পেয়েছে Logo শান্তি-সম্প্রীতির বন্ধনে শান্তিপূর্ণ,সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার : প্রধানমন্ত্রী Logo নাটোরে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত ১৪ Logo মেয়েদের আইপিএলের নিলামে নেই বাংলাদেশের কেউ Logo এআইকে দেওয়া তথ্য ডার্ক ওয়েবে আছে কি না জানুন Logo কখন গোসল করা ভালো সকালে নাকি রাতে? Logo ৭ সেকেন্ডে ৫ রাউন্ড গুলি, বাড়লো সালমান খানের নিরাপত্তা Logo অজ্ঞতাবশত বিতর্ক মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
উত্তপ্ত মণিপুুর ও ভারতের রাজনীতি

উত্তপ্ত মণিপুুর ও ভারতের রাজনীতি

মণিপুর রাজ্য শান্ত হচ্ছেই না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একটি মণিপুর। অন্যান্য রাজ্যগুলো হলো : সিকিম, আসাম, অরুণাচল, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা। সিকিম ছাড়া অন্য সাতটি রাজ্য ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা ‘সাত বোন’ নামে পরিচিত। এ সাতটিতেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা আছে। তবে সম্প্রতি প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে মণিপুর। কিন্তু কেন? এই কেন-এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক অনেক কথাই বলছেন। তবে ইদানিং সবচেয়ে বেশি বলা হচ্ছে, গত ২০২৩ সালের মার্চ মাসে মণিপুর হাইকোর্ট এক নির্দেশে রাজ্য সরকারকে বলেছিলেন, মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় উপজাতিভুক্ত কি না। মেইতেই সম্প্রদায় তফসিলি আদিবাসী হিসেবে সংরক্ষণ পেতে পারে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে। নির্দেশটি হাইকোর্টের ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল প্রকাশ করার পরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে উপজাতি সম্প্রদায়। বিক্ষোভ কিছুদিনের মধ্যেই সহিংস আন্দোলনে রূপ নেয়। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের পাশের জেলা চূড়াচাঁদপুরে ২০২৩ সালের ৩ মে উপজাতি ছাত্রদের একটি মিছিল বের হয়। সেই বিক্ষোভ দমন করতে শক্তি প্রয়োগ করেছিল সরকার। এতে এতদিনে সরকারি হিসেবে ২০ জন নিহত হয়। সেই থেকে শুরু, এখনো চলছে। সেই দাবি স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত রূপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হলেও ভারত সরকার তা স্বীকার করছে না, তারা এটিকে গুজব বলছে। আসলেই কী গুজব? এ বিশ্লেষক মনে করেন, গুজব নয়; সত্য। সেই সত্যের শিকড় অনেক গভীরে।
মণিপুর সঙ্কটের ঐতিহাসিক কারণ
মণিপুর সঙ্কটের শিকড় সন্ধান করতে ইতিহাসের পাতায় নজর দিতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতে ‘প্রিন্সলি স্টেট’ হিসেবে যে রাজ্যগুলোর মর্যাদা ছিল, তার একটি মণিপুর। কাশ্মিরের মতো মণিপুরও ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই ভারতে যুক্ত হয়নি। বরং ১৯৪৯ সালে তারা ভারতের যুক্তরাজ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। মণিপুরের শাসক মহারাজা বুদ্ধচরণ জনমত উপেক্ষা করে তৎকালীন ভারত সরকারের সাথে চুক্তি সই করে রাজ্যটি ভারতের কাছে তুল দেন। আর তা থেকেই ওই রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা স্বাধীনতা আন্দোলনেরও সূত্রপাত।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে একটি প্রিন্সলি স্টেট কি? প্রিন্সলি স্টেট যাকে নেটিভ স্টেট বা ইন্ডিয়ান স্টেটও বলা হতো। ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের যে রাজ্যগুলো সরাসরি ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত ছিল না, বরং পরোক্ষ শাসনের একটি ফর্মের অধীনে একজন ভারতীয় শাসক দ্বারা পরিচালিত হতো। ঐসব রাজ্যের রাজা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার শর্তে নামমাত্র স্বাধীনতা পেতেন এবং নিজেদের সার্বভৌম বলে দাবি করতেন। মোট ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য বা ‘প্রিন্সলি স্টেট’ ছিল ব্রিটিশ ভারতে। এর একটি ছিলো মণিপুর। (ল্যারি কলিন্স, দোমিনিক লাপিয়ের, ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট, ১৯৭৫)
ভারত ব্রিটিশের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভের পর নানান কূটকৌশলে সেই রাজ্যগুলো নিজের করে নিয়েছে, রাজাদের বশ করে, নিজস্ব লোক দিয়ে সরকার গঠনের পর সংসদে আইন পাস করে অথবা যুদ্ধ করে শক্তির জোরে। যেমন : হায়দ্রাবাদ যুদ্ধ করে দখল করেছে, সিকিম নিয়েছে নিজস্ব লোকদের সংসদে পাঠিয়ে আইন পাস করে। যেমন : বাংলাদেশের গত ডামি নির্বাচনে ভারত তার পক্ষের অনেক সদস্য সংসদে পাঠিয়েছিল। এভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে, কোনো বিশ্বাসঘাতক কোনো সংসদ সদস্য বিল উত্থাপন করতেন, তারপর কণ্ঠ ভোটে পাস হলেই এদেশের ভাগ্যে নেমে আসতে পারত সিকিমের পরিণতি। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ৫ আগস্ট বিপ্লব ভারতের সেই দিবাস্বপ্ন শেষ করে দিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার রহমতে।
এখন প্রশ্ন হলো মণিপুুরের জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছে কারা? মণিপুুরের স্বাধীনতাকামীদের ভারত সরকার বিচ্চিন্নতাবাদী বলবে এটাই স্বাভাবিক। তারা এ সংঘাতকে গৃহযুদ্ধ হিসেবেও স্বীকার করবে না। বরং তাদের প্রচারণা জাতিগত সংঘাত, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই বলে কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়? অবশ্যই যায় না। তাই ভারত সরকার বিভিন্ন সময় মণিপুরবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তি প্রয়োগ করে স্তিমিত করে রাখতে পারলেও, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হচ্ছে। মাঝে মাঝেই অশান্ত হচ্ছে মণিপুর ও সেভেন সিস্টার্সের অন্যান্য রাজ্যগুলো।
শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুুরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় এবং সংখ্যালঘু কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া জাতিগত সহিংসতার এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু সেখানে শান্তি তো আসেইনি; বরং উত্তেজনা ও সহিংসতা বেড়ে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। কয়েক মাস শান্ত থাকার পর সবশেষ এ বছরের ১ সেপ্টেম্বর নতুন করে সহিংসতা শুরু হয় মণিপুুরে। ড্রোন ও রকেট হামলায় নিহত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। মণিপুুরের পুলিশ দাবি করেছে, কুকি গোষ্ঠী মেইতি অধ্যুষিত এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুকি সংস্থাগুলো অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এই ড্রোন হামলা চালিয়েছে মেইতি গোষ্ঠী।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি তথ্য অনুসারে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংঘাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২২৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সহিংসতা দমনে দিল্লির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকর্মীরা। অনেকেই উল্লেখ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনও রাজ্যে যাননি বা একটি বিবৃতিও দেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মণিপুরী কর্মী ডয়েচে ভেলেকে জানান, মণিপুরে জনগণের জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং সে কারণেই মণিপুরীদের ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে। বিনালক্ষ্মী নেপ্রাম, একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী, একে মণিপুুরের ইতিহাসে ‘অন্ধকার সময়’ বলে অভিহিত করেছেন। নেপ্রাম আরও বলেন, আমাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন; যারা সংঘাতময় পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য কাজ করতে পারেন। দুঃখজনক বিষয় হলো তারা কিছুই করেননি। গত ৭০ বছর ধরে যারা মণিপুরে শাসন করছেন তাদের ‘রাজনৈতিক পরিপক্কতার’ অভাব ধারাবাহিক সরকারের সমষ্টিগত ব্যর্থতাকে তুলে ধরে।
তবে এ প্রতিবেদক মনে করেন, এ সবই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার প্রয়াসকে উস্কে দেওয়ার নামান্তর মাত্র। মণিপুুরের জনগণের ভাগ্য নির্মাণের অধিকার তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে।
ভারতের ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়া টুডে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর স্বাধীনতাকামীরা লন্ডন থেকে মণিপুরকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর একই ছবিসহ ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টাইমসও এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন করে মণিপুরের মহারাজার পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বিচ্ছিন্নতাবাদী দুই নেতা। মহারাজা সানাজাওয়াবার পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দিয়েছেন রাজ্য পরিষদের মুখ্যমন্ত্রী ইয়ামবেন বীরেন ও রাজ্য পরিষদের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী নারেংবম সামারজিত। পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেতে সেই সময় ব্রিটেনের তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছে আবেদন করেন ওই নেতারা।
কিন্তু তাদের স্বাধীনতার এ দাবি ভারত সরকারের চাপের কারণে তেমন গুরুত্ব পায়নি আন্তর্জাতিকভাবে। ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রভাবের কারণে স্বাধীনতাকামীদের দাবি আন্তর্জাতিকমহল বার বার উপেক্ষা করছে বলে মনে করেন আন্তজার্তিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কিন্তু এরপরও একটি সূত্র দাবি করছে শুধু মণিপুর নয়, সেভেন সিস্টার্সসহ এ অঞ্চলের খ্রিস্টানদের সংগঠিত করার কাজ করছে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের মাস্টার প্ল্যান এশিয়ার এ অঞ্চলে একটি স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাস্টার প্ল্যান সত্যি না গুজব
একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মানুষের সংখ্যা ১০ শতাংশও নয়। এমনকি শ্রীলঙ্কার বাইরে বাকি সাতটি দেশে ৫ শতাংশের নিচে। তারপরও এই অঞ্চলজুড়ে একটা খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের পরিকল্পনার কথা বহুদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু হয়েছে ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ুর থেকে। কেউ কেউ এক্ষেত্রে তক্ষèশীলার কথাও বলে। পুরোনো তক্ষèশীলা এখন পড়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। এর মধ্যে কেরালায় এখন প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা খ্রিষ্টান। তামিলনাড়ুতে সেটা ৬ শতাংশের মতো। পাকিস্তানে ১ শতাংশের কম।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনটা অবশ্য এসব পরিসংখ্যান থেকে তৈরি হয়নি। এ গুঞ্জনের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো। মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চলও তাতে যুক্ত হয়েছে। উত্তর–পূর্ব জনপদগুলোর মধ্যে মেঘালয় (৭১ শতাংশ), মিজোরাম (৮৭ শতাংশ) এবং নাগাল্যান্ডে (৮৮ শতাংশ) খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই তিন জনপদ যে লাগোয়া, তা নয়; তবে কাছাকাছি। মিয়ানমারের চিন এস্টেট এদের কাছের জনপদ। চিন এলাকায় ৯৬ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী।
দক্ষিণ এশিয়ায় চারটি জায়গা হলো খ্রিষ্টান প্রধান। চারটি জায়গাতেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রাজনীতিবিদদের রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তবে জনপদগুলো আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ছোট। এই চারটি এলাকার পাশাপাশি মণিপুর ও অরুণাচলকেও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান জনসংখ্যার (৪১ ও ৩০ শতাংশ) কারণে কাছে টানা হয়, তাহলে বেশ বড় একটা বলয় তৈরি হয়। আয়তনে যা দুই লাখ বর্গকিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়। ভিন্ন ভিন্ন নামে কাছাকাছি থাকা বেশ বড় একটি এলাকার জনবিন্যাসের এ রকম প্রবণতা নিশ্চিতভাবে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিন ধর্ম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ‘মুরব্বিদের’ এটা ভালোভাবে নজরে পড়েছে। মিজোরাম ও চিনসংলগ্ন বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় (রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে বিষয়টা ঢাকায়ও মনোযোগের বিষয় হয়েছে। বান্দরবানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ শতাংশের মতো।’ তিনি আরো উল্লেখ্য করেছেন,‘ মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে একধরনের উসকানি হিসেবে কাজ করছে বলা যায়। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি প্রান্তিক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্বের কারেন, উত্তরের কাচিন এবং পশ্চিমের চিন অঞ্চল। এই তিন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত এবং এই তিন অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মানুষও অনেক। এরকম মনে করা হয় যে, দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গণতন্ত্রপন্থীদের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি বিজয়ী হয় তাহলে প্রান্তিক এলাকা যে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, সেটা অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে। আবার গণতন্ত্রপন্থীদের সংগ্রাম অনিশ্চিতভাবে দীর্ঘায়িত হলেও গেরিলা-দৃঢ়তা এ তিন অঞ্চলকে অনুরূপ চেহারা দিতে পারে। মিয়ানমারের এ রকম সম্ভাবনায় ভারত উদ্বিগ্ন। সে কারণে তারা ওই দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত অনেকটাই বন্ধ করে দিতে চায় বলে খবর বেরিয়েছে। সীমান্ত এলাকার ট্রাইবালরা অবশ্য এর ঘোর বিরোধী। কারণ, এতে তারা জাতিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর এক চুক্তির বলে সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন একধরনের সাধারণ ভ্রমণ পাস নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারে। শুরুতে চুক্তি অনুযায়ী ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল। পরে কমিয়ে ১৬ কিলোমিটার করা হয় সেটা। মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এ সুবিধা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা এ সুবিধা আর রাখতে চায় না। কারণ, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
এখন হলো এ সুবিধা বাতিল করলেই কি সঙ্কট কাটবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, অবশ্যই তা কাটবে না, বরং বাড়বে। ভারতের বর্তমান উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার সারা ভারতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় বার বার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তাদের এ ব্যর্থতার খেসারত মণিপুরসহ বিভিন্ন রাজ্যে স্বাধীনতাকামী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উত্থান। এ সত্য স্বীকার করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ভারত সরকার সামনে চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ( প্রথম প্রকাশ, ১৮ আগস্ট ২০২৪ ) লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ৬৪ জেলায় সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রমের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের

উত্তপ্ত মণিপুুর ও ভারতের রাজনীতি

উত্তপ্ত মণিপুুর ও ভারতের রাজনীতি

আপডেট সময় ০৩:১৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

মণিপুর রাজ্য শান্ত হচ্ছেই না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একটি মণিপুর। অন্যান্য রাজ্যগুলো হলো : সিকিম, আসাম, অরুণাচল, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা। সিকিম ছাড়া অন্য সাতটি রাজ্য ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা ‘সাত বোন’ নামে পরিচিত। এ সাতটিতেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা আছে। তবে সম্প্রতি প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে মণিপুর। কিন্তু কেন? এই কেন-এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক অনেক কথাই বলছেন। তবে ইদানিং সবচেয়ে বেশি বলা হচ্ছে, গত ২০২৩ সালের মার্চ মাসে মণিপুর হাইকোর্ট এক নির্দেশে রাজ্য সরকারকে বলেছিলেন, মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় উপজাতিভুক্ত কি না। মেইতেই সম্প্রদায় তফসিলি আদিবাসী হিসেবে সংরক্ষণ পেতে পারে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে। নির্দেশটি হাইকোর্টের ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল প্রকাশ করার পরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে উপজাতি সম্প্রদায়। বিক্ষোভ কিছুদিনের মধ্যেই সহিংস আন্দোলনে রূপ নেয়। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের পাশের জেলা চূড়াচাঁদপুরে ২০২৩ সালের ৩ মে উপজাতি ছাত্রদের একটি মিছিল বের হয়। সেই বিক্ষোভ দমন করতে শক্তি প্রয়োগ করেছিল সরকার। এতে এতদিনে সরকারি হিসেবে ২০ জন নিহত হয়। সেই থেকে শুরু, এখনো চলছে। সেই দাবি স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত রূপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হলেও ভারত সরকার তা স্বীকার করছে না, তারা এটিকে গুজব বলছে। আসলেই কী গুজব? এ বিশ্লেষক মনে করেন, গুজব নয়; সত্য। সেই সত্যের শিকড় অনেক গভীরে।
মণিপুর সঙ্কটের ঐতিহাসিক কারণ
মণিপুর সঙ্কটের শিকড় সন্ধান করতে ইতিহাসের পাতায় নজর দিতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতে ‘প্রিন্সলি স্টেট’ হিসেবে যে রাজ্যগুলোর মর্যাদা ছিল, তার একটি মণিপুর। কাশ্মিরের মতো মণিপুরও ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই ভারতে যুক্ত হয়নি। বরং ১৯৪৯ সালে তারা ভারতের যুক্তরাজ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। মণিপুরের শাসক মহারাজা বুদ্ধচরণ জনমত উপেক্ষা করে তৎকালীন ভারত সরকারের সাথে চুক্তি সই করে রাজ্যটি ভারতের কাছে তুল দেন। আর তা থেকেই ওই রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা স্বাধীনতা আন্দোলনেরও সূত্রপাত।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে একটি প্রিন্সলি স্টেট কি? প্রিন্সলি স্টেট যাকে নেটিভ স্টেট বা ইন্ডিয়ান স্টেটও বলা হতো। ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের যে রাজ্যগুলো সরাসরি ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত ছিল না, বরং পরোক্ষ শাসনের একটি ফর্মের অধীনে একজন ভারতীয় শাসক দ্বারা পরিচালিত হতো। ঐসব রাজ্যের রাজা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার শর্তে নামমাত্র স্বাধীনতা পেতেন এবং নিজেদের সার্বভৌম বলে দাবি করতেন। মোট ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য বা ‘প্রিন্সলি স্টেট’ ছিল ব্রিটিশ ভারতে। এর একটি ছিলো মণিপুর। (ল্যারি কলিন্স, দোমিনিক লাপিয়ের, ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট, ১৯৭৫)
ভারত ব্রিটিশের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভের পর নানান কূটকৌশলে সেই রাজ্যগুলো নিজের করে নিয়েছে, রাজাদের বশ করে, নিজস্ব লোক দিয়ে সরকার গঠনের পর সংসদে আইন পাস করে অথবা যুদ্ধ করে শক্তির জোরে। যেমন : হায়দ্রাবাদ যুদ্ধ করে দখল করেছে, সিকিম নিয়েছে নিজস্ব লোকদের সংসদে পাঠিয়ে আইন পাস করে। যেমন : বাংলাদেশের গত ডামি নির্বাচনে ভারত তার পক্ষের অনেক সদস্য সংসদে পাঠিয়েছিল। এভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে, কোনো বিশ্বাসঘাতক কোনো সংসদ সদস্য বিল উত্থাপন করতেন, তারপর কণ্ঠ ভোটে পাস হলেই এদেশের ভাগ্যে নেমে আসতে পারত সিকিমের পরিণতি। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ৫ আগস্ট বিপ্লব ভারতের সেই দিবাস্বপ্ন শেষ করে দিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার রহমতে।
এখন প্রশ্ন হলো মণিপুুরের জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছে কারা? মণিপুুরের স্বাধীনতাকামীদের ভারত সরকার বিচ্চিন্নতাবাদী বলবে এটাই স্বাভাবিক। তারা এ সংঘাতকে গৃহযুদ্ধ হিসেবেও স্বীকার করবে না। বরং তাদের প্রচারণা জাতিগত সংঘাত, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই বলে কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়? অবশ্যই যায় না। তাই ভারত সরকার বিভিন্ন সময় মণিপুরবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তি প্রয়োগ করে স্তিমিত করে রাখতে পারলেও, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হচ্ছে। মাঝে মাঝেই অশান্ত হচ্ছে মণিপুর ও সেভেন সিস্টার্সের অন্যান্য রাজ্যগুলো।
শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুুরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় এবং সংখ্যালঘু কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া জাতিগত সহিংসতার এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু সেখানে শান্তি তো আসেইনি; বরং উত্তেজনা ও সহিংসতা বেড়ে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। কয়েক মাস শান্ত থাকার পর সবশেষ এ বছরের ১ সেপ্টেম্বর নতুন করে সহিংসতা শুরু হয় মণিপুুরে। ড্রোন ও রকেট হামলায় নিহত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। মণিপুুরের পুলিশ দাবি করেছে, কুকি গোষ্ঠী মেইতি অধ্যুষিত এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুকি সংস্থাগুলো অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এই ড্রোন হামলা চালিয়েছে মেইতি গোষ্ঠী।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি তথ্য অনুসারে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংঘাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২২৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সহিংসতা দমনে দিল্লির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকর্মীরা। অনেকেই উল্লেখ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনও রাজ্যে যাননি বা একটি বিবৃতিও দেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মণিপুরী কর্মী ডয়েচে ভেলেকে জানান, মণিপুরে জনগণের জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং সে কারণেই মণিপুরীদের ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে। বিনালক্ষ্মী নেপ্রাম, একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী, একে মণিপুুরের ইতিহাসে ‘অন্ধকার সময়’ বলে অভিহিত করেছেন। নেপ্রাম আরও বলেন, আমাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন; যারা সংঘাতময় পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য কাজ করতে পারেন। দুঃখজনক বিষয় হলো তারা কিছুই করেননি। গত ৭০ বছর ধরে যারা মণিপুরে শাসন করছেন তাদের ‘রাজনৈতিক পরিপক্কতার’ অভাব ধারাবাহিক সরকারের সমষ্টিগত ব্যর্থতাকে তুলে ধরে।
তবে এ প্রতিবেদক মনে করেন, এ সবই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার প্রয়াসকে উস্কে দেওয়ার নামান্তর মাত্র। মণিপুুরের জনগণের ভাগ্য নির্মাণের অধিকার তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে।
ভারতের ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়া টুডে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর স্বাধীনতাকামীরা লন্ডন থেকে মণিপুরকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর একই ছবিসহ ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টাইমসও এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন করে মণিপুরের মহারাজার পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বিচ্ছিন্নতাবাদী দুই নেতা। মহারাজা সানাজাওয়াবার পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দিয়েছেন রাজ্য পরিষদের মুখ্যমন্ত্রী ইয়ামবেন বীরেন ও রাজ্য পরিষদের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী নারেংবম সামারজিত। পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেতে সেই সময় ব্রিটেনের তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছে আবেদন করেন ওই নেতারা।
কিন্তু তাদের স্বাধীনতার এ দাবি ভারত সরকারের চাপের কারণে তেমন গুরুত্ব পায়নি আন্তর্জাতিকভাবে। ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রভাবের কারণে স্বাধীনতাকামীদের দাবি আন্তর্জাতিকমহল বার বার উপেক্ষা করছে বলে মনে করেন আন্তজার্তিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কিন্তু এরপরও একটি সূত্র দাবি করছে শুধু মণিপুর নয়, সেভেন সিস্টার্সসহ এ অঞ্চলের খ্রিস্টানদের সংগঠিত করার কাজ করছে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের মাস্টার প্ল্যান এশিয়ার এ অঞ্চলে একটি স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাস্টার প্ল্যান সত্যি না গুজব
একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মানুষের সংখ্যা ১০ শতাংশও নয়। এমনকি শ্রীলঙ্কার বাইরে বাকি সাতটি দেশে ৫ শতাংশের নিচে। তারপরও এই অঞ্চলজুড়ে একটা খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের পরিকল্পনার কথা বহুদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু হয়েছে ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ুর থেকে। কেউ কেউ এক্ষেত্রে তক্ষèশীলার কথাও বলে। পুরোনো তক্ষèশীলা এখন পড়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। এর মধ্যে কেরালায় এখন প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা খ্রিষ্টান। তামিলনাড়ুতে সেটা ৬ শতাংশের মতো। পাকিস্তানে ১ শতাংশের কম।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনটা অবশ্য এসব পরিসংখ্যান থেকে তৈরি হয়নি। এ গুঞ্জনের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো। মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চলও তাতে যুক্ত হয়েছে। উত্তর–পূর্ব জনপদগুলোর মধ্যে মেঘালয় (৭১ শতাংশ), মিজোরাম (৮৭ শতাংশ) এবং নাগাল্যান্ডে (৮৮ শতাংশ) খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই তিন জনপদ যে লাগোয়া, তা নয়; তবে কাছাকাছি। মিয়ানমারের চিন এস্টেট এদের কাছের জনপদ। চিন এলাকায় ৯৬ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী।
দক্ষিণ এশিয়ায় চারটি জায়গা হলো খ্রিষ্টান প্রধান। চারটি জায়গাতেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রাজনীতিবিদদের রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তবে জনপদগুলো আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ছোট। এই চারটি এলাকার পাশাপাশি মণিপুর ও অরুণাচলকেও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান জনসংখ্যার (৪১ ও ৩০ শতাংশ) কারণে কাছে টানা হয়, তাহলে বেশ বড় একটা বলয় তৈরি হয়। আয়তনে যা দুই লাখ বর্গকিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়। ভিন্ন ভিন্ন নামে কাছাকাছি থাকা বেশ বড় একটি এলাকার জনবিন্যাসের এ রকম প্রবণতা নিশ্চিতভাবে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিন ধর্ম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ‘মুরব্বিদের’ এটা ভালোভাবে নজরে পড়েছে। মিজোরাম ও চিনসংলগ্ন বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় (রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে বিষয়টা ঢাকায়ও মনোযোগের বিষয় হয়েছে। বান্দরবানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ শতাংশের মতো।’ তিনি আরো উল্লেখ্য করেছেন,‘ মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে একধরনের উসকানি হিসেবে কাজ করছে বলা যায়। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি প্রান্তিক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্বের কারেন, উত্তরের কাচিন এবং পশ্চিমের চিন অঞ্চল। এই তিন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত এবং এই তিন অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মানুষও অনেক। এরকম মনে করা হয় যে, দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গণতন্ত্রপন্থীদের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি বিজয়ী হয় তাহলে প্রান্তিক এলাকা যে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, সেটা অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে। আবার গণতন্ত্রপন্থীদের সংগ্রাম অনিশ্চিতভাবে দীর্ঘায়িত হলেও গেরিলা-দৃঢ়তা এ তিন অঞ্চলকে অনুরূপ চেহারা দিতে পারে। মিয়ানমারের এ রকম সম্ভাবনায় ভারত উদ্বিগ্ন। সে কারণে তারা ওই দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত অনেকটাই বন্ধ করে দিতে চায় বলে খবর বেরিয়েছে। সীমান্ত এলাকার ট্রাইবালরা অবশ্য এর ঘোর বিরোধী। কারণ, এতে তারা জাতিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর এক চুক্তির বলে সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন একধরনের সাধারণ ভ্রমণ পাস নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারে। শুরুতে চুক্তি অনুযায়ী ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল। পরে কমিয়ে ১৬ কিলোমিটার করা হয় সেটা। মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এ সুবিধা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা এ সুবিধা আর রাখতে চায় না। কারণ, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
এখন হলো এ সুবিধা বাতিল করলেই কি সঙ্কট কাটবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, অবশ্যই তা কাটবে না, বরং বাড়বে। ভারতের বর্তমান উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার সারা ভারতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় বার বার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তাদের এ ব্যর্থতার খেসারত মণিপুরসহ বিভিন্ন রাজ্যে স্বাধীনতাকামী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উত্থান। এ সত্য স্বীকার করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ভারত সরকার সামনে চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ( প্রথম প্রকাশ, ১৮ আগস্ট ২০২৪ ) লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক