খিলাফত হচ্ছে ইসলামের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মহানবী সা: কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনার ইসলামী প্রজাতন্ত্র পরিচালনার মাধ্যমে খিলাফত নামক রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হয়। মূলত খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা সরকারের ইসলামিক রূপ যা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক একতার প্রতিনিধিত্ব করে। এ শাসনব্যবস্থার সরকারপ্রধানকে খলিফা বলা হয়। ইসলাম ধর্ম মতে বলা হয় ‘খলিফাতুল রাসূলুল্লাহ’। মহানবী সা:-এর মৃত্যুর পর যে চারজন বিশিষ্ট সাহাবি আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশিত পদ্ধতি অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে গেছেন তারা ‘খোলাফায়ে রাশেদিন’ বা সত্য পথগামী খলিফা নামে পরিচিত।
খলিফা ছিল প্রশাসনিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। শূরা বা উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে তিনি শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের নির্বাচন পদ্ধতি ছিল গণতান্ত্রিক। খলিফারা যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হতেন। এই যুগের নির্বাচন পদ্ধতি দুটো। একটি সরাসরি নির্বাচন যেমন হজরত আবু বকর রা: প্রথম খলিফা হিসেবে জনগণের সরাসরি সমর্থনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় হলো নির্বাচকম-লী কর্তৃক মনোনয়ন দান। উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, শিক্ষিত, ন্যায়বান, আদর্শবান কয়েকজন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে খলিফারা মৃত্যুর আগে একটি নির্বাচকম-লী গঠন করতেন। খলিফার মৃত্যুর পর তারা পরবর্তী যোগ্য লোকদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচন করতেন। এ পদ্ধতিতে হজরত ওমর রা:, উসমান রা: ও আলী রা: খলিফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। আদর্শ বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচকম-লী একজন খোদাভীরু, সৎ, যোগ্য, পদের প্রতি লোভহীন, সাহসী, কর্মঠ, সংযমী, উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণী শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করতেন। সবাই তার হাতে হাত রেখে আনুগত্যের শপথ করতেন। প্রশাসক বা কোনো দায়িত্বশীল পদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে সে আমলে মনোনয়ন দান করা হতো সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে। কারণ জাতীয় স্বার্থকেই তারা বড় করে দেখতেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে খলিফাদের জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ ও অনাড়ম্বর। খলিফারা মসজিদে বসেই রাজকার্য পরিচালনা করতেন। সাধারণ মুসলমানদের মতো সরকারি ভাতা গ্রহণ করে তারা সরকার পরিচালনার কাজ করতেন।
আবু বকর রা: : মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রা:। তার জন্ম ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দ। পিতা আক্কান ও মাতা সালমা। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ সা:-এর একজন প্রধান সাহাবি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণের সম্মান তাকে দেয়া হয়। এ ছাড়া তিনি রাসূল সা:-এর শ্বশুরও ছিলেন। রাসূল মুহাম্মদ সা:-এর ইন্তেকালের পর তিনি খলিফা হন এবং মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন। তিনি ৬৩২-৬৩৪ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তিনি ছিলেন পূতঃপবিত্র চরিত্রের লোক। তিনি ছায়ার মতো আজীবন রাসূলুল্লাহর পাশে ছিলেন। নবুয়তের আগে ও নবুয়ত লাভের পরে নবী মোহাম্মদ সা:-কে সমানভাবে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে তিনি তাঁকে অনুসরণ করেছেন। আবু বকর নবী সা: এর মিরাজের ঘটনা শোনা মাত্র বিশ্বাস করেছিলেন বলে তাকে ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন এবং অধিক দানশীলতার জন্য ‘আতিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। আবু বকর ছিলেন ইসলামের এক জ্বলন্ত নক্ষত্র। আবু বকরের খিলাফত দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার খিলাফতকাল দীর্ঘ না হলেও তিনি একজন সফল শাসক ছিলেন। ৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট আবু বকর মারা যান। আয়েশার ঘরে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রওজার পাশে তাকে দাফন করা হয়।
হজরত ওমর রা: : ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রা: ৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার উপনাম আবু হাফস এবং উপাধি আল-ফারুক। তার পিতা আল খাত্তাব ও মাতা হানতামা। বয়সে তিনি রাসূল সা:-এর চেয়ে ১৩ বছরের ছোট ছিলেন। তিনি নবুয়তের ষষ্ঠ বছরে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের ফলে মক্কায় ইসলাম প্রকাশ্য রূপ পেয়েছিল। তিনি মহানবী সা:-এর সাথে সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হজরত আবু বকর রা:-এর ইন্তেকালের পর ১৩ হিজরি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১০ বছর ছয় মাস খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার খিলাফতকালে অধিকাংশ দেশ মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। তার থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ৫৩৯টি। হজরত মুগিরা ইবনে শুবার খ্রিষ্টান দাস আবু লুলুর ছুরিকাঘাতের ফলে তিনি ২৩ হিজরি শাহাদত বরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৬৩ বছর। মসজিদে নববীর রওজা মোবারকে হজরত আবু বকর রা:-এর পাশে তাকে দাফন করা হয়।
হজরত উসমান রা: : হজরত ওসমান রা: ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। হজরত ওসমান রা: সাহাবিদের মধ্যে ধনী সাহাবি ছিলেন। তিনি প্রথম পর্বের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। হজরত ওসমান রা: ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। হজরত ওসমান রা: মুহাম্মদ সা:-এর চেয়ে ছয় বছরের ছোট ছিলেন। তার উপাধি জুন্নুরাইন ও জুল হিজরাইন। পিতা আফফান ও মাতা আরোয়া বিনতে কুরাইজ। ইসলাম গ্রহণের পর মুাহাম্মদ সা: তার কন্যা রুকাইয়ার সাথে ওসমানের বিয়ে দেন। মুহাম্মদ সা:-এর প্রথম কন্যা রুকাইয়ার ইন্তেকালের পর তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমের সাথে হজরত ওসমান রা:-কে আবার বিয়ে দেন। হজরত ওসমান রা: ৬১১ সালে বাণিজ্য থেকে ফিরে এসে মুহাম্মদ সা: কর্তৃক ইসলাম প্রচারের কথা জানতে পেরে তিনি সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। হজরত ওসমান রা:-কে ৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ শুক্রবার আসরের নামাজের পর ৮২ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন পাঠরত অবস্থায় শহীদ করা হয়। জান্নাতুল বাকিতে তাকে দাফন করা হয়।
হজরত আলী রা: : হজরত আলী রা: ইসলামের চতুর্থ খলিফা। হজরত আলী রা: ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার উপনাম আবুল হাসান। উপাধি আসাদুল্লাহ ও হায়দার। পিতা আবু তালেব ও মাতা ফাতিমা। তিনি ছিলেন রাসূল সা:-এর আপন চাচাতো ভাই ও ছোট জামাতা। তিনি মাত্র ৯-১১ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী বালক। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে শাহাদতবরণ পর্যন্ত তিনি ইসলামের অনেক কল্যাণ সাধন করেন। তাবুকের যুদ্ধ ছাড়া তিনি রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথে সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে চার বছর ৯ মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। ৩৫ হিজরি খলিফা মনোনীত হন। হজরত আলী রা: একই সাথে বড় মাপের মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও বাগ্মী ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সা: থেকে ৫৮৬টি হাদিস বর্ণনা করেন। তার ইসলামের গভীরতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর আর আলি ওই শহরের দরজা।’ ইসলামের মহান সাধক ৪০ হিজরি ৪০ রমজান মাসে ইরাকের কুফা নগরীতে শাহাদাতবরণ করেন। আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম নামক এক আত্মীয়ের তরবারির আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছিল। কুফা জামে মসজিদের আঙ্গিনায় তাকে দাফন করা হয়।
খোলাফায়ে রাশেদিনের এই চারজন খলিফার মতো সৎ, ন্যায়পরায়ণ শাসনকার্য প্রতি যুগে, প্রতি রাষ্ট্রে প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়