ফিলিস্তিন সংকট মুসলিম বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সংকট। ইসরাইলী সৈন্য কর্তৃক সেখানে প্রতিনিয়ত মুসলমানদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। মুসলমানদেরকে তাদের স্বীয় জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে জোরপূবর্ক ইহুদীরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই সংকটের সুত্রপাত। এ সংকট শুধু ফিলিস্তিনীদের জন্য নয়, বরং সারা মুসলিম উম্মাহকে দাবিয়ে রাখার একটা দীর্ঘ পরিকল্পণার অংশ। পত্র-পত্রিকাসহ অন্যান্য মিডিয়া মারফত আমরা সমকালীন ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে কমবেশী অবগত আছি। এই দীর্ঘ সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূলসূত্র। এহেন ভবিতব্য ঘটনাবলী সংক্রান্ত আমাদের সম্যক ধারণা থাকা একান্ত প্রয়োজন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এখানে সে ধারণা দেয়া হবে ইনশাল্লাহ।
ধর্মীয়, ঐতিহাসিকও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রথমত, অত্র এলাকা বা তার আশেপাশেই শুরু হয় মেসোপোটেমিয়ান সভ্যতা যা বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা। এর অনেক পরে শুরু হয় প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতা। দ্বিতীয়ত, মানব সভ্যতার জন্মভূমি হওয়ায় আল্লাহপাক সেখানে দুই তৃতীয়াশং নবী রসূল প্রেরণ করেন। মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ.)কেও ফিলিস্তিন এলাকায় দাওয়াতি কাজের জন্য পাঠানো হয়। তৃতীয়ত, সেখানে রয়েছে হযরত সুলাইমান (আঃ) কর্তৃক নির্মিত মসজিদুল আকসা যা মুসলমানদের প্রথম কেবলা ছিলো। চতুর্থত, ভৌগলিক এবং কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এ এলাকাকে বলা হয় মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ড (ঐবধৎঃ ড়ভ গঁংষরস খধহফ), কারণ এটা আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের মুসলিম দেশসমূহের মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করেছে।
ইহুদী সম্প্রদায়: কিছু প্রাথমিক ধারণা
ইহুদী সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে পরিচত। তাদের এক নাম ‘বানি ইসরাইল’। হযরত ইয়াকুব (আ.) এর একটা খেতাব ছিলো ‘ইসরাইল’ (আল্লাহর বান্দা); আর এ জন্যই তার বংশধরকে ‘বানি ইসরাইল’ বা ইসরাইলের বংশধর বলা হয়। বর্তমানে তথকাথিত ইসরাইল রাষ্ট্র এ খেতাব থেকেই এসেছে। ইংজেরীতে তাদেরকে ঔঊড এবং তাদের ধর্মকে বলা হয় ঔটউঅওঝগ যা এসেছে ইয়াকুব (আ.) এর এক পুত্রের নাম থেকে অথবা ‘?জুডিস’ নামক এক স্থানের নাম থেকে। পবিত্র কোরআনে তাদেরকে ‘আহলিল কিতাব’, ‘বানি ইসরাইল’, এবং ‘ইহুদী’ এ তিন নামেই সন্বোধন করা হয়েছে। বর্তমানে আরো একটি খেতাবে তাদেরকে আমরা চিনে থাকি, খেতাবটা হলো জায়োনিষ্ট (Zoinist), যা এসেছে তড়রহ নামক জেরুসালেমে অবস্থিত এক পাহাড়ের নাম থেকে।
১৮৮০ সালে Nathan Birnbaum নামে এক অষ্টেলীয়ান ইহুদী তাদের তথকথিত পবিত্র ভুমিতে ফিরে যাওয়োর জন্য একটি আন্দোলনের প্রস্তাব করেন এবং সেই আন্দোলনের নাম হিসেবে এ নামটি ব্যবহার করেন। ১৮৮৭ সালে Theodore Herzl নামক এক হাংগেরিয়ান ইহুদী Der Judenstaat (The State of the Jews) নামক একটি বই লেখেন এবংInternational Zoinst Organization নামে একটি পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের রুপরেখা দাঁড় করান। তিনিই এই আন্দোলনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ইসরাইলী রাষ্ট্র এবং তাদের উপনিবেশ ঐ আন্দোলনেরই ফলশ্রুতি।
ইহুদীরা নিজেদেরকে খোদার ‘পছন্দের একমাত্র বান্দা’ (Chosen people of God) মনে করে এবং এ কারণেই কেউ ধর্মান্তরিত হয়ে ইহুদী হতে চাইলেও ইহুদীরা তাকে গ্রহণ করেনা। আল্লাহপাক বানি ইসরাইলকে এক সময় বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা তা ধরে রাখতে পারেনি। কারণ পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের অধিকাংশ ইতিহাসই পাপাচার, হত্যা, লুণ্ঠন, ব্যভিচার, হঠকারিতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, মিথ্যাচার, শিরক প্রভৃতিতে পরিপূর্ণ। এসবের ফলে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা থেকে স্খলিত হয়ে আল্লাহ কর্তৃক অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তাদের কীর্তিকলাপ এবং অভিশপ্ত হওয়ার কারণে তারা রাষ্ট্রহারা হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। যুগে যুগে তারা চরম শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছে। ফেরাউন, রোমান, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক তারা গণহারে হত্যার শিকার হয়। মনে করা হয়, আল্লাহর অভিশাপের ফলশ্রুতি হিসাবে তারা কখনোই স্থায়ী কোন নিরাপদ বাসস্থানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তাদের নিজেদের কিতাব (তাওরাতে) বর্ণিত তাদের জঘন্য পাপাচারের কয়েকটা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলে বিষটি স্পষ্ট হবে।
১. হযরত সুলাইমানের (আ.) এর পর ইসরাইল সাম্রাজ্য দুইভাগে বিভক্ত হয়। জেরুসালেমের ইহুদীয়া রাষ্ট্র এবং সামারিয়ার ইসরাইল রাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে লড়াই হয়। হানানী নবী ইহুদী রাষ্ট্রের শাসক আশা’কে সতর্ক করলে নবীকে কারারুদ্ধ করা হয়।
২. বা’ল দেবতার পূজার জন্য ইহুদীদের তিরস্কার করলে ইসরাইলী রাজা ?আখিতাব স্বীয় স্ত্রীর প্ররোচণায় ইলিয়াস নবীকে হত্যার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। নবী তখন সিনাই উপদ্বীপের পর্বতাঞ্চলে আশ্রয় নেন। তিনি বদদোয়া করেন, “হে আল্লাহ! বানি ইসরাইল তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করেছে; তোমার নবীকে হত্যা করেছে তালোয়ারের সাহায্যে এবং একমাত্র আমিই জীবিত আছি। তারা আমার প্রাণ নাশের চেষ্টা করছে” (১ রাজাবলী, ১৭ অধ্যায়, ১-১০ শ্লোক)।
৩. সত্য ভাষণের অপরাধে মিকাইয়া নামে অপর এক নবীকে কারারুদ্ধ করে তারা। (১ রাজাবলী, ২২ অধ্যায়, ২৬-২৭ শ্লোক)।
৪. ইহুদী রাষ্ট্রে যখন প্রকাশ্যে মূর্তিপূজা ও ব্যভিচার চলতে থাকে এবং হযরত যাকারিয়া (আঃ) যখন এ ব্যাপারে সোচ্চার হন, তখন ইহুদি রাজা ?ইউআস এর নির্দেশে তাকে মূল হাইকেলে সুলাইমানীতে মাকদীস ও জবেহ ক্ষেত্রের মাঝখানে প্রস্তারাঘাতে নিহত করা হয়।
৫. দাওয়াতের কারণে ইয়ারমিয়াহ নবীকে মারধর ও কারাবুদ্ধ করা হয়। এরপর ক্ষুধা ও পিপাসায় শুকিয়ে মেরেফেলার জন্য রশি দিয়ে বেধে কর্দমাক্ত কুয়ার মধ্য ঝুলিয়ে রাখা হয় (যিরমীয়, ১৫ অধ্যায়)।
৬. ব্যভিচারের সমালোচনা করলে মামুস নবীকে দেশ থেকে বহিস্কারের কড়া নির্দেশ দেয়া হয় (মামুস ৭, ১০-১৩ শ্লোক)।৭. ইহুদী শাসক হিরোডিয়াসের দরবারে ব্যভিচার ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচান করলে হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) কে প্রথমত, কারারুদ্ধ করা হয়। পরে বাদশাহ নিজের প্রেমিকার নির্দেশে তাকে শিরচ্ছেদ করে। এরপর নবীর মস্তক থালায় করে বাদশাহ তার প্রেমিকাকে উপহার দেয় (মার্ক, ৬ অধ্যায়, ১১-১৯ শ্লোক)।
৮. সত্যের দাওয়াতের জন্য হযরত ঈসা (আ.)কে কারারুদ্ধ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তৈরী করা হয়। রোমান শাসক পিতালিস ইহুদীদের বললো, ?”আজ ঈদের দিন, তোমাদের স্বার্থে ঈসা অথবা বারাব্বাকে মুক্তি দিতে চাই। কাকে দিব?” ইহুদীরা বললো, “বারাব্বাকে মুক্তি দিন আর ঈসাকে ফাসি দিন।” (মথি ২৭, ২০-২৬ শ্লোক)। হযরত ঈসা (আ.) ইহুদীদের জন্য বদ দোয়া করেন-
অয,Ah, sinful nation, A people loaded down with wickedness [with sin, with injustice, with wrongdoing], Offspring of evildoers, Sons who behave corruptly! They have abandoned (rejected) the LORD, They have despised the Holy One of Israel [provoking Him to anger], They have turned away from Him.
৯. ইহুদীদের পরিণতি সম্পর্কে খোদার ভবিষ্যদ্বাণী: Just as it pleased the LORD to make you prosper and multiply, so also it will please Him to annihilate you and destroy you. And you will be uprooted from the land you are entering to possess. Then the LORD will scatter you among all the nations, from one end of the earth to the other, and there you will worship other gods, gods of wood and stone… Among those nations you will find no repose, not even a resting place for the sole of your foot. There the LORD will give you a trembling heart, failing eyes, and a despairing soul.„ (Deuteronomy 28:63-65).
জায়োনিস্ট আন্দোলন:
ইহুদীরা তাদের কিছু ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দাবীর প্রেক্ষিতে ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে জায়োনিষ্ট আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটিয়েছে। তাদের ধর্মীয় দাবী হলো তাওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী ইব্রাহীমকে বলা হয় ফিলিস্তিন যেতে। তিনি ফিলিস্তিনে পৌঁছার পর খোদা তাকে বলেন, “ইব্রাহীম দাঁড়াও, তোমার ভুখন্ড হলো নীল ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝখানে”। তাওরাতের এ বর্ণনা অনুসারে ইহুদীরা মনে করে ফিলিস্তিন ভুখন্ড হল খোদার পক্ষ থেকে তাদেরকে দান করা ভুখন্ড (চৎড়সরংবফ ষধহফ)। কিন্তু তাদের এ ধর্মীয় দাবীর ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন আছে তা হলো-
১. তাওরাত বর্তমানে অবিকৃত অবস্থায় নেই, কাজেই তাওরাতে যেসব কথা বলা আছে সেগুলোর সবগুলোই যে সত্যিকারে খোদার বাণী তার কোন স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ নেই। তাওরাতে বর্ণীত ইহুদীদের ধর্মীয় দাবী বিশ্বাস করাও মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
২. ধরে নেয়া হল, হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে আল্লাহপাক এ বিশাল ভূখন্ড দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেটা ইহুদীদের ভাগেই পড়বে। ইব্রাহীম (আ.) এর দুই সন্তান ছিলো, ইসহাক এবং ইসমাইল। ইহুদীরা এসেছে হযরত ইসহাকের পুত্র ইয়াকুব (আ.) বংশ থেকে। ইসহাক ও ইসমাইল উভয়ের ভাগ সেখানে থাকার কথা।
৩. আসল ব্যাপার হলো এ ভূখন্ডকে কোন গোত্রের জন্য ওয়াদা করা হয়নি বরং সূরা আল বাকারা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটা সত্যিকার বিশ্বাসী বা ইমানদারদের জন্য আল্লাহপাক ওয়াদা করেছেন। কাজেই সত্যিকার ইমানের দাবী নিয়ে ইহুদীরা কখনোই এ ভূখন্ড পাওয়ার যোগ্য নয়। তাছাড়া এ ওয়াদা ছিল শুধু একটা বিশেষ সময়ের জন্য।
৪. দুনিয়ার ইতিহাস হলো ইমান আর কুফরের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এ দ্বান্দ্বিক ইতিহাসে আল্লাহপাকের তাওহীদের বার্তাবাহক হলেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। কাজেই আল্লাহর ওয়াদা অনুসারে শেষ নবীর অনুসারী মুসলমানেরাই উক্ত ভূখন্ডের আসল দাবীদার।
৫. কোন বিশেষ গোত্রের (ইব্রাহীমের পুত্র) জন্য এটা ওয়াদা করা হয়েছে, এটা ধরলেও বতর্মান ইহুদীরা যে সত্যিকারে ইব্রাহীম বা ইয়াকুবের পুত্র তারও প্রমাণের কোন উপায় নেই। কারণ ইব্রাহীম (আ.) দুনিয়াতে এসেছিলেন ৬০০০ বছর পূর্বে। তাছাড়া ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে ইসরাইলে বর্তমানে যেসব ইহহুদীরা বসবাস করছে, তাদের অধিকাংশই কাম্পিয়ান এবং কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী ককেশাস এলাকা থেকে এসেছে। তাদের ৯০ ভাগ নবম ও দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খেলাফত এবং খ্রীষ্টানদের দ্বিমুখী চাপের মধ্যে মাঝামাঝি ধর্ম হিসাবে ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করে। খুবই অল্প সংখ্যক ইহুদীই ফিলিস্তিনের আদিবাসী। প্রায় ১৮০০ বছর ধরে ফিলিস্তিন এলাকা ইহুদী শূন্য ছিলো। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় ৭০০০ লোক রাশিয়া থেকে আসে যাদের মধ্যে ৩০ ভাগ ছিলো অইহুদী। তারা চাকুরীর সন্ধানে এসে ইহুদী পরিচয় দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
ধর্মীয় দাবীর পাশাপাশি ইহুদীদের এতিহাসিক দাবী হলোঃ প্রায় চারশ বছর ধরে তারা এ এলাকা শাসন করেছে, কাজেই এটা তাদেরই ভূখন্ড। খৃষ্টপূর্ব ১০০৪ থেকে ৯৬৩ পর্যন্ত এ এলাকা শাসন করেন হযরত দাউদ (আ.)। এরপর দাউদ (আ.) এর পুত্র সোলাইমান (আ.) শাসন করেন খৃষ্টপূর্ব ৯২৬ পর্যন্ত। হযরত সুলাইমান (আ.) এর মৃত্যুর পরই ইহুদী রাষ্ট্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সব মিলে প্রায় ৪০০ বছরের শাসন ছিলো ইহুদীদের। কিন্তু তাদের এ দাবী মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য কয়েকটি কারণে-
১. দাউদ এবং সোলাইমান (আ.) আল্লাহর নবী ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও ছিলেন আল্লাহর নবী এবং রাসুল। কাজেই মুহাম্মদ (সা.)-ই হলেন এর সত্যিকার উত্তরাধিকারী।
২. ইহুদীরা ইতিহাসের কোন এক সময়ে ৪০০ বছর এ এলাকা শাসন করেছে বলেই এটা তাদের এলাকা যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে এই সাথে এটাও মেনে নেয়া দরকার যে মুসলমানরা ১৩৫০ বছর ধরে ফিলিস্তিন শাসন করেছে, কাজেই এটা মুসলমানদের ভূখন্ড। মুসলমানেরা ইহুদীদের তিনগুনেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিন শাসন করেছে।
৩. ইহুদীরা যে ফিলিস্তিনের আদিবাসী তারও কোন প্রমাণ নেই। এ এলাকায় প্রায় ১১,০০০ বছর পূর্বে সভ্যতা শুরু হয়। দুনিয়ার প্রথম শহর হল ফিলিস্তিনের জেরিকো (খৃষ্টপূর্ব ৮০০০)। খৃষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ২,৫০০ এর মাঝে আরব থেকে বনুকেনান (কেনান গোত্র) ফিলিস্তিনে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে; আর এটা ঘটেছিলো বনি ইসরাইলীদের আসার ১,৫০০ বছর পূর্বে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন ফিলিস্তিনে এসেছিলেন, তার আগেই ফিলিস্তিনে জনবসতি ছিলো এবং বনুকেনান ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্য কোথাও যায় নাই। ইসলামের আগমণের পর বনুকেনান (ফিলিস্তিনের আদিবাসী) অন্যান্য গোত্রের সাথে মিশে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। বতর্মানে ফিলিস্তিনের মুসলমানেরা তাদেরই বংশধর। কাজেই আদিবাসী হিসাবেও ফিলিস্তিন এলাকা মুসলমানদেরই প্রাপ্য।
এখন প্রশ্ন হলো ইহুদীদের ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক দাবী ভূয়া হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ কেন ইহুদীদের পক্ষ নিলো? এর পিছনে অনেক কারণ রয়েছে-
১. ইউরোপে মাটির্ন লুথার এবং জন ক্যালভিন কতৃর্ক প্রণীত ও প্রচারিত প্রটেস্টট্যান্ট আন্দোলন এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ আন্দোলন ইহুদী, খ্রীষ্টান সবাইকে তাদের আসল কিতাব (তাওরাত, ইনজিল) সরাসরি অধ্যয়নের অনুপ্রেরণা যোগায়। তাওরাতে উল্লিখিত ইহুদীদের ধমীর্য় দাবীর বিষয়টি সম্পর্কে ইহুদী খ্রীষ্টান সবাই এ সময় অবগত হয়। অবগতির ক্ষেত্র পার হয়ে পরবতীর্তে এটা একটা সংস্কৃতির রূপ পরিগ্রহ করে। জেরুসালেমে ফিরে যাওয়ার বিষয় নিয়ে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও বই পুস্তক, উপন্যাস, ফিল্ম, প্রভৃতি রচিত হতে থাকে। অতীত নিয়ে স্মৃতিকাতর (হড়ংঃধষমরপ) ইহুদীরা নিজেদের এবং পাশ্চাত্য মননে তৈরি করে এক শক্তিশালী ফরধংঢ়ড়ৎধ, নিজেদের অতীত ভূমিতে ফিরে আসার অভিপ্রায়ে।
২. নেপোলিয়ানের সময়ে এ সাংস্কৃতিক রূপ পরিবর্ধিত হয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। নেপোলিয়ান ১৭৯৮ সালে মিশরের ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদীদের পুনবার্সনের ঘোষণা দেন।
চলবে…..