মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম শুধু কোনো যুগ বা প্রজন্মের স্মৃতিতে নয়, বরং পুরো বিশ্বমানবতার চিরন্তন আলো হয়ে ঝলমল করে। তাঁদের জীবন-প্রদীপ নিভে যায়নি শতাব্দীর পর শতাব্দী পরেও। ইসলামের ইতিহাসের আকাশে প্রথম খলিফা আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লামের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, অটল সত্যনিষ্ঠ নেতাÍআবু বকর সিদ্দিক (রা.) তেমনই এক নক্ষত্র। যিনি ছিলেন সত্যের প্রতীক, বিশ্বাসের অটল দুর্গ, মানবতার মূর্তপ্রতীক এবং নেতৃত্বের অমর উদাহরণ।
শৈশবের নির্মল আলো
আবু বকর (রা.)-এর পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবু কুহাফা ওসমান আত-তামীমী। জন্ম মক্কায়, কুরাইশ বংশে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও সততার প্রতীক। মক্কার কঠিন সমাজব্যবস্থায় যেখানে ব্যবসার মুনাফা, কবিতার গর্ব আর উপজাতীয় প্রতিযোগিতা ছিল মানুষের পরিচয়ের মানদ-, সেখানে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন এক কোমল হৃদয়ের, বিশ্বস্ত ও দয়ালু যুবক।
এ জন্য মক্কার মানুষ তাঁকে ডাকত “আতীক” (عتیق) নামে। যার অর্থ পাপমুক্ত বা নিষ্কলুষ। (ইবনে সা‘দ, তাবাকাত, ৩/১২৯)।
ঈমান গ্রহণে দ্বিধাহীনতা
যখন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ঘোষণা করলেনÍ“বল, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই”, তখন গোটা মক্কা কেঁপে উঠল।
মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়লÍকেউ তাঁকে পাগল বলল, কেউ জাদুকর। কিন্তু আবূ বকর (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ঘোষণা করলেনÍ“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল।”
ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেনÍ“যে সকল মানুষকে রাসূল ﷺ ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আবূ বকর ছাড়া আর কেউ দ্বিধাহীনভাবে সঙ্গে সঙ্গে কবুল করেনি।” (সীরাতুন নববী, ১/২৪৫)। এজন্যই তাঁর উপাধি হয় আস-সিদ্দীকÍঅটল সত্যনিষ্ঠ।
দাওয়াত ও অবদান
আবূ বকর (রা.) শুধু নিজে ঈমান আনেননি; বরং তাঁর আহ্বানে বহু বিশিষ্ট সাহাবি ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উসমান ইবনে আফফান, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ, যুবাইর ইবনে আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ (ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৩০)। এর মাধ্যমে তিনি ইসলামের সুচনালগ্নে এক অনন্য দাওয়াতি ভূমিকা রাখেন।
হিজরতের রাত ও সওর গুহার ঘটনা
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন, তখন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও একমাত্র সঙ্গী ছিলেন আবূ বকর (রা.)। সওর গুহায় শত্রুরা এতটাই নিকটে এসেছিল যে, সামান্য নিচে তাকালেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীকে দেখতে পেত। সে সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম আবূ বকরকে সান্ত¡না দিয়ে বলেছিলেন:
“যখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বললেন, ‘ভয় করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গেই আছেন।’” (সুরা তাওবা, আয়াত : ৪০)।
এখানে কোরআন নিজেই আবুবকর (রা,) কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের “সঙ্গী” বলে উল্লেখ করেছেÍযা তাঁর মর্যাদার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।
যুদ্ধে সাহস ও দানে উদারতা
বদর, উহুদ, হুনায়েনসহ সব যুদ্ধেই আবূ বকর (রা.) ছিলেন অগ্রভাগে। তাবূকের অভিযানে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম মুসলিমদের দান করতে বললেন, তখন আবূ বকর (রা.) নিজের সমস্ত সম্পদ নিয়ে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “পরিবারের জন্য কী রেখেছো?” তিনি উত্তর দিলেন: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখেছি।” (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৭৫)।
এ উত্তরে প্রকাশ পায় তাঁর ঈমানের দৃঢ়তা ও আল্লাহর প্রতি অটল আস্থা কতো উঁচু মানের ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের ইন্তিকাল ও উম্মাহকে জাগিয়ে তোলা
৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইন্তিকাল করলে মুসলিম সমাজে নেমে আসে গভীর শোক ও হতবিহ্বলতা। অনেক সাহাবি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মেনে নিতে পারছিলেন না যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তখন আবূ বকর (রা.) এগিয়ে এসে ঘোষণা দিলেন:
“যে মুহাম্মদকে উপাসনা করত, সে জেনে রাখুক, মুহাম্মদ ইন্তিকাল করেছেন। আর যে আল্লাহকে উপাসনা করে, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না।” (বুখারি, হাদিস ১২৪১)।
এই ভাষণ হতবিহ্বল সাহাবিদের হৃদয়ে দৃঢ়তা ফিরিয়ে আনে এবং উম্মাহ আবার একত্রিত হয়।
খলিফা হিসেবে তাঁর শাসনকাল
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের ইন্তিকালের পর আবূ বকর (রা.)-কে সর্বসম্মতিক্রমে খলিফা নির্বাচিত করা হয়। যদিও তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র আড়াই বছর (১১-১৩ হিজরি), কিন্তু এই স্বল্প সময়ে তিনি ইসলামের ভিত্তি দৃঢ় করেন।
খলীফা হিসেবে আবু বকর (রা.)-এর উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ-
১. মুরতাদদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম: অনেক গোত্র জাকাত অস্বীকার করে বিদ্রোহ করেছিল। আবূ বকর (রা.) দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দিলেনÍ“আল্লাহর শপথ! যদি তারা একটি দড়ির টুকরোও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের সময় দিত আর এখন না দেয়, তবে আমি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব।” (বুখারি, হাদিস : ১৩৯৯)।
২. মিথ্যা নবীদের দমন: মুসায়লামা কায্জাবসহ একাধিক মিথ্যা নবীর উদ্ভব হয়েছিল। আবূ বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালান।
৩. কোরআন সংকলনের সূচনা : ইয়ামামার যুদ্ধে বহু ক্বারী শহীদ হন। তখন উমর (রা.)-এর পরামর্শে তিনি কোরআন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম মহৎ উদ্যোগ।
মৃত্যু ও বিনয়
১৩ হিজরীতে (৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে) ২২শে জমাদিউল আখির, সোমবার আবূ বকর (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ৬৩ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের পাশেই হুজরা মুবারকে দাফন করা হয়। মৃত্যুশয্যায় তিনি বলেছিলেনÍ“আমার কাফন হোক পুরনো কাপড়, নতুন কাপড় জীবিতদের জন্য রেখে দাও।” (ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫/২৪৮; সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৩৮৭)
তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তেও ছিল দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও আখিরাতের প্রতি গভীর মনোযোগ।
আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়Í
ক্স ঈমান মানে দৃঢ় আস্থা : দ্বিধাহীনভাবে সত্য গ্রহণ ও তাতে অটল থাকা।
ক্স নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব : সমাজের কল্যাণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা না করা।
ক্স ত্যাগ ছাড়া সফলতা নেই : সম্পদ ও জীবন আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা।
ক্স বিনয় ও সরলতাই প্রকৃত গৌরব : ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও তিনি দুনিয়ার চাকচিক্যকে অবজ্ঞা করেছেন।
আবু বকর (রা.)-এর জীবন এক মহান আলোকবর্তিকা। তাঁর সত্যনিষ্ঠা, সাহস, দানশীলতা ও আল্লাহভীতি আমাদের শিখায়Íসত্যের প্রতি অবিচল থাকলে, দুনিয়ার অল্প সময়ে থেকেও মানুষ ইতিহাসের পাতায় অমর হতে পারে। তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের জীবনের ছায়াসঙ্গী, উম্মাহর প্রথম নেতা এবং চিরকালের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর মতো সত্যনিষ্ঠ, ত্যাগী ও বিনয়ী হতে তাওফিক দিন। আমীন।