মাকতাব, বহুবচন মাকাতিব, অর্থ লেখার স্থান, ইসলামি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম। কোনো কোনো আরব দেশে এটা কুত্তাব নামেও পরিচিত। তুর্কি মেকতেব, বাংলা মক্তব। মিসরে কিববিরাও তাদের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মাকতাব নামে অভিহিত করত। দ্বিতীয় মাহমুদের শাসনামলে ‘মেকতেব-ই তিব্বিয়্যে শাহানে’, ‘মেকতেব-ই মাআরিফ-ই আদলিয়্যা’ ও ‘মেকতেব-ই উলুম-ই হারবিয়্যা’ এই তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ক শাস্ত্রে শিক্ষা প্রদান ও সমীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৮৫৯ সালে বেসামরিক আমলা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘মেকতেব-ই মুলকিয়্যা’ নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি হয়। অনুরূপভাবে ১৮২০-এর দশকে মিসরে ‘আল-মাকতাবুল-আলি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা ছিল মুহাম্মাদ আলির পরিবারসহ আরও কিছু অভিজাত পরিবারের পুরুষদের জন্য একটি সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফরাসিরা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘ঊপড়ষব ফবং চৎরহপবং’ বা শাসকবংশের লোকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে অভিহিত করে। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে কায়রোয় ‘মাকতাবুল মাহিমাত আল হারবিয়্যা’ স্থাপন করা হয় এবং তিন বছর পর বন্ধ হয়ে যায়। সম্ভবত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছিল গোলাবারুদ সম্পর্কিত শিক্ষা প্রদান এবং সামরিক কারখানা হিসেবে ব্যবহারের জন্য।
১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে হিসাবরক্ষকদের প্রশিক্ষণ দানের জন্য ‘মাকতাব রাঈসু মাহাসাবা’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। খেদিভ ইসমাঈলের শাসনামলে মাকতাব বলতে সাধারণ বিদ্যালয়ের ধারণা এতখানি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে ওঠে যে, তা মিসরে ‘মাকাতিব আহলিয়্যা’ বা জাতীয় কিংবা স্থানীয় বিদ্যালয়সমূহের সমার্থক হয়ে ওঠে। আধুনিককালের তুরস্কে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ‘ইল্ক মেকতেব’, পরবর্তী স্তরের বিদ্যালয়কে বা মধ্য-বিদ্যালয়কে ‘আরতা মেকতেব’ বলা হয়। মালয়েশিয়ায় মাকতাব কথাটি সম্প্রতি ‘ওহংঃরঃঁঃব’ এই ইংরেজি শব্দের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে এক্ষেত্রে কুয়ালালামপুরের মাকতাব পারগুরাম ‘ইল্ম খাস’ (বিশেষ শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান)-এর কথা উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশে মক্তব শব্দটি সাধারণত ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বুঝায়।
আল্লাহর রাসুল (সা.) মসজিদের পাশাপাশি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছেন। মক্তবকে হাদিসের ভাষায় ‘কুত্তাব’ বলা হয়েছে, যার শব্দমূল একই। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি নবীজির (সা.) মুখ থেকে সত্তরটি সুরা মুখস্থ করেছি তখন যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) মক্তবের শিশু ছিলেন। -মুসনাদে আহমাদ : ৩৮৪৬
হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তার ঘরে ইসলামের প্রথম উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। সেখানে নামাজের প্রশিক্ষণ হতো, কোরআন মাজিদের তেলাওয়াত হতো। পরে সেটি মসজিদে হজরত আবু বকর (রা.)-এ রূপ নেয়। সহিহ বোখারি শরিফের কিতাবুল কাফালায় বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, মসজিদে আবু বকরে কোনো মুয়াল্লিম বা শিক্ষক ছিল না। হজরত আবু বকর (রা.) নিজেই সেখানে তালিমের কাজ আঞ্জাম দিতেন। এখানে অমুসলিম ছেলে-মেয়েরাও কোরআনের তেলাওয়াত শুনত।
ইবনে হিশাম হজরত ওমর (রা.)-কে উদ্ধৃত করে বলেন, খাত্তাবের কন্যা ও ওমর (রা.)-এর বোন ফাতেমা ও তার স্বামী সাঈদ বিন জায়েদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তার নিজ গৃহে একটি ইসলামি উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ইবনে আবত (রা.) নামের একজন সাহাবি নওমুসলিমদের কোরআন শিক্ষা দিতেন। নবী কারিম (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকালে আনুমানিক পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। এই নওমুসলিমরা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের জন্য ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে জানার ও শেখার ব্যবস্থা করা। সেই লক্ষ্যে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী দলকে নিয়ে ‘দারুল আরকামে’ সর্বপ্রথম ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। এটি ছিল নওমুসলিম আরকাম ইবনে আবুল আরকামের বাড়ি। এ বাড়িতে নবী কারিম (সা.) দাওয়াতের কাজ করতেন। পাশাপাশি সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের মধ্যে কোরআন, নামাজ ও নৈতিকতা শিক্ষা দিতেন। এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র। মক্কাকেন্দ্রিক ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার এই ধারা কালক্রমে মদিনায় স্থানান্তরিত হয়। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের আনাচে-কানাচে।