২২ অক্টোবর, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। প্রতিবছরই এই দিনে আমরা কিছু শোক, কিছু দাবি ও কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্মরণ করি সড়ক দুর্ঘটনায় হারানো অসংখ্য প্রাণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ সড়ক গড়ার পথে এগোচ্ছি, নাকি কেবল দুর্ঘটনার পর চোখের জলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে? সড়ক নিরাপত্তা কি কেবল একটি নাগরিক বিষয়, নাকি এটি এক গভীর নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে?
রাস্তা বা সড়ক মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতীক। এটি কেবল যান চলাচলের পথ নয়, বরং সমাজজীবনের এক অনিবার্য সংযোগসেতু।
সড়ক নিরাপত্তা শুধু প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্বও বটে।
ইসলামে প্রাণ রক্ষার মর্যাদা
পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন—
وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
‘যে একজন মানুষের প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৩২)
অর্থাৎ, মানুষের প্রাণ রক্ষা করা ইসলামে এক বিশাল সওয়াবের কাজ। সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম মানা, অস্বাভাবিক অবস্থায় গাড়ি না চালানো, যাত্রী ও পথচারীর প্রতি সতর্ক থাকা—এসবই মানুষের প্রাণ রক্ষার কাজ।
তাই যে চালক দায়িত্বহীনভাবে গাড়ি চালায় এবং অন্যের প্রাণহানি ঘটায়, সে শুধু আইনি অপরাধই করে না, বরং বড় এক শরঈ অপরাধে লিপ্ত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহাও যাবে না” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)
অতএব, নিজের অসতর্কতা বা গাফিলতির কারণে অন্যের ক্ষতি করা সরাসরি নিষিদ্ধ। সড়ক দুর্ঘটনা যদি কারও অবহেলার ফল হয়, তবে তা ইসলামী দৃষ্টিতে গুনাহে কাবিরা—মহাপাপ।
সড়কে শৃঙ্খলা: নবীজির শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে বলেন—
إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوسَ عَلَى الطُّرُقَاتِ فَقَالُوا مَا لَنَا بُدٌّ إِنَّمَا هِيَ مَجَالِسُنَا نَتَحَدَّثُ فِيهَا قَالَ فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلاَّ الْمَجَالِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهَا قَالُوا وَمَا حَقُّ الطَّرِيقِ قَالَ غَضُّ الْبَصَرِ وَكَفُّ الأَذَى وَرَدُّ السَّلاَمِ وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ وَنَهْيٌ عَنْ الْمُنْكَرِ “রাস্তার ওপর বসো না।
” সাহাবিরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের তো রাস্তার ধারে বসে গল্প করা ছাড়া উপায় নেই।” তিনি বললেন, “তাহলে রাস্তার হক দাও।” তাঁরা বললেন, “রাস্তার হক কী?” নবী ﷺ বললেন, “চোখ নিচু রাখা, কষ্ট না দেওয়া, সালাম ফিরিয়ে দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাস্তার শৃঙ্খলা, সৌজন্য ও নিরাপত্তার আদব শেখালেন। আজ যদি চালক, পথচারী, ব্যবসায়ী, এমনকি ট্রাফিক পুলিশ—সবাই রাস্তার “হক” আদায় করে, সড়কে অবৈধ দখল করে সড়দ সংকীর্ণ করার রোধ করে, সড়কের ফুটপাত দখল মুক্ত রাখে, সড়কের যত্রতত্র পারাপার নিয়ন্ত্রণ করে। তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।
সড়ক দুর্ঘটনার নৈতিক কারণ
আজকের দুর্ঘটনার পেছনে শুধু খারাপ রাস্তা নয়, রয়েছে আমাদের নৈতিক অবক্ষয়।
১. অতিরিক্ত গতি ও অহংকার: নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে গিয়ে চালকরা অমানবিকভাবে গতি বাড়ায়। অথচ পবিত্র কোরআন বলে—
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا
“পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা করো না।” (সূরা লুকমান, আয়াত :১৮)
২. অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা: গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিশ্রাম—এসব অমান্য করা এক ধরনের খিয়ানত (বিশ্বাসভঙ্গ)। আল্লাহ বলেন—
إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন, তোমরা আমানত তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দাও।” — (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)
৩. ঘুষ ও অন্যায় লাইসেন্স প্রদান: ইসলাম ঘুষকে হারাম ঘোষণা করেছে-
وَ لَا تَاۡكُلُوۡۤا اَمۡوَالَكُمۡ بَیۡنَكُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَ تُدۡلُوۡا بِهَاۤ اِلَی الۡحُكَّامِ لِتَاۡكُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۸۸﴾
আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না (সূরা বাকারা, আয়াত :১৮৮)। অথচ আমাদের দেশে বহু ড্রাইভার ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স পায়, যা পরে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
সড়ক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। উমর (রা.) বলেছিলেন—
“ফোরাত নদীর তীরে একটি ছাগলও যদি ক্ষুধায় বা অবহেলায় মারা যায়, উমরকে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।” সড়কে প্রতিদিন যে প্রাণহানি ঘটছে, তার দায়ও প্রশাসনের উপর বর্তায়। রাস্তার মান, ট্রাফিক আইনের কঠোরতা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই ইসলামী দৃষ্টিতে আমানতদারিত্ব। ন্যায়বিচারভিত্তিক নীতি না থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না।
সচেতনতা: ঈমানেরই অংশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“সে-ই মুসলিম, যার জিহবা ও হাত হতে সকল মুসলিম নিরাপদ” — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)
যে চালকের কারণে মানুষ নিরাপদ নয়, সে প্রকৃত মুমিনের চেহারা ধারণ করতে পারে না। তাই সড়ক নিরাপত্তা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়—এটি ঈমানেরই প্রকাশ। নিরাপদ ড্রাইভিং মানে মানবতার প্রতি ঈমানি দায়িত্ব পালন।
সড়ক সংস্কৃতি ও সভ্যতার মানদ-
যে জাতির রাস্তায় শৃঙ্খলা নেই, সে জাতি সভ্যতার উচ্চতর আসনে পৌঁছাতে পারে না। মদ্যপ বা অস্বাভাবিক অবস্থায় গাড়ি চালানো আজকের যুগের একটি ভয়াবহ মহামারী। ইসলাম মদ্যপানকে “উম্মুল খাবায়িস”—সমস্ত অকল্যাণের জননী বলেছেন। তাই মদ্যপ চালক কেবল রাষ্ট্রের আইনের নয়, আল্লাহর সামনেও অপরাধী।
সমাধানের ইসলামী পথ
১. নৈতিক শিক্ষা ও তাওহিদী চেতনা জাগানো। মানুষ বুঝুক—প্রত্যেক জীবন আল্লাহর আমানত।
২. ইসলামী ট্রাফিক শিক্ষা। মসজিদ, মাদরাসা, স্কুলে সড়ক-আদব শেখানো।
৩. জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। রাষ্ট্র যদি “খলিফা”র আদর্শে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, দুর্ঘটনা অনেক কমবে।
৪. জনসচেতনতা ও দোয়া। মহানবী (সা.) শিখিয়েছেন,
اللهم إني أعوذ بك من زوال نعمتك ومن تحول عافيتك ومن فجاءة نقمتك ومن جميع سخطك
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই হঠাৎ বিপদ ও তোমার অসন্তোষ থেকে।” — (সহিহ মুসলিম, ২৭৩৯)
নিরাপদ সড়ক মানে শুধু দুর্ঘটনামুক্ত রাস্তা নয়; এটি আল্লাহর বান্দাদের নিরাপত্তা, সমাজের নৈতিক শুদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের আমানতদারিত্বের সম্মিলিত প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
كلكم راعٍ وكلكم مسؤول عن رعيته
‘তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন রক্ষক, এবং প্রত্যেকে নিজের দায়িত্বে জবাবদিহি করবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
আজ যদি চালক, পথচারী, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারক—সবাই নিজেদের “রক্ষক” মনে করে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আমাদের সড়কও হবে শান্তির পথ, নিরাপত্তার সেতু, মানবতার রাস্তা। লেখক: প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
Saifpas352@gmail.com