বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খর¯্রােতা তিস্তা নদী নাব্যতা সংকটের কারণে এখন মরুময় বালুচর। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চল ও তার আশপাশের মানুষজন তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম সংকটে দিনাতিপাত করছেন। নদীর দু’কুল মরুময় বালুচরে পরিণত হওয়ায় প্রায় শতাধিক রুটে নৌ-চলাচল বন্ধ। নৌকায় পারাপার এবং মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবারের লোকজন বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত। তাদের সামনে না আছে বিকল্প জীবিকার পথ, না আছে এলাকায় দিনমজুরির কাজকর্ম। ফলে ওইসব পরিবারের লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। এসব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের দূর-দূরান্তের স্কুল-কলেজে শিক্ষার্জনের যে প্রচেষ্টা তাও এখন ফিকে হয়ে গেছে। পরিবারে চরম অভাব-অনটন প্রভাব ফেলেছে তাদের ওপর। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী-কচুয়া-ইউনিয়নের বাগডহরার চর, চর ইচলি, মহিপুর, মিলন বাজার এলাকা, গজঘন্টা, রাজবল্লভ ও মর্ণেয়া ইউনিয়ন; কাউনিয়া উপজেলার চর গোকুন্ডার পূর্ব-দক্ষিনাংশে তিস্তার চরের কর্মহীন মানুষ অভাবের তাড়নায় চোখে অন্ধকার দেখছে। চরে বালুমহালের বাইরে যাদের জমি আছে, তারা কোনোরকমে কিছু রবিসশ্য ঘরে তুলতে পারলেও জীবিকার চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আবার অধিকাংশ চরবাসী এমনও ঘটনার শিকার হয়েছেন, ফি বছর বন্যায় বাড়িঘর-বসতভিটা হারানোর পর চর জাগলেও চরের বালু জমিও নিজের দাবি করতে পারেন না অনেকেই। চরে আধিপত্য বিস্তারকারী একশ্রেনির ভূস্বামী প্রভাবশালী এবং মধ্যস্বত্বভোগি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিমিশেই নিজের দখলে নেন অন্যের জমি। ফলে চরাঞ্চলের এক সময়ের মাঝারী ও ক্ষুদ্র গৃহস্থ সহায়-সম্বলহীন নিঃস্ব বনে গেছেন। চরের অগনিত মানুষজন যুগ যুগ ধরে এ ধরনের হিং¯্রতার শিকার হয়ে আসছেন। যেখানে আইন-শৃঙ্খলা, বিচার, প্রশাসন সবকিছুই চলে চরের আধিপত্য বিস্তারকারীদের ইশারায়। একই অবস্থা পুরো তিস্তা নদীর। গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর নাব্যতা সংকট জেলার এই দুই উপজেলার বিশাল অংশজুড়ে মরুময় বালুচরে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছরেও কোনো কার্যকর খনন বা ড্রেজিং না করায় উজান থেকে আসা পলি ও বালু জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে। হরিপুর-কামারজানিসহ ৩৫টি রুটে নৌ-চলাচল স¤পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। একসময়ের খরস্রোতা তিস্তা এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। চরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের বাদামের চরের ব্যবসায়ী আনছার আলী বলেন, আগে যেখানে বড় বড় নৌকা চলত, সেখানে এখন ধু-ধু বালুচর। শহর থেকে মালপত্র আনা এখন অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। চরের ভেতরে ঘোড়ার গাড়ি বা হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নৌ-শ্রমিক ও জেলেরা। হরিপুর চরের নৌ-শ্রমিক তামিম মিয়া বলেন, ১০ বছর আগেও তাঁর পাঁচটি নৌকা ছিল, এখন মাত্র একটি। নদী ভরাট হওয়ায় মাঝিরা বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। জেলে মন্টু মিয়া বলেন, নদীতে পানি না থাকায় মাছ ধরা প্রায় বন্ধ। জীবন বাঁচাতে জেলেদের কেউ রিকশা-ভ্যান চালাচ্ছে। অনেকেই ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছে। খনন না করায় তিস্তা তার মূল গতিপথ হারিয়ে অসংখ্য শাখা নদীতে বিভক্ত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি বলেন, নদী ভরাট হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে পানি উপচে পড়ে নদীভাঙন তীব্র হয়। এতে প্রতিবছর শত শত ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন ও ড্রেজিং এখন সময়ের দাবি। এটি না করলে চরবাসীকে সারাবছরই কষ্ট করতে হবে। একই অবস্থা হয়েছে ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে। শীতের শুরু থেকে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে শত শত বালুচর জেগে ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে বেশকিছু নৌরুট। এর মধ্যে রুত্বপূর্ণ ফুলছড়ি উপজেলার অভ্যন্তরীণ নৌরুট ফুলছড়ি-বালাসী, তিস্তামুখঘাট-বাহাদুরাবাদ ঘাট, গজারিয়া-গলনা, হাজিরহাট, সিংড়িয়া-ঝানঝাইর, গুনভরি-কালাসোনা, গজারিয়া-ফুলছড়িতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চল ও তার আশেপাশে মানুষ নদীর নব্যতা সংকটের কারণে মরুময় বালু চরে পরিণত হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে। রংপুর ও গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীদ্বয়ের সাথে কথা হলে তারা একইভাবে প্রায় সংক্ষিপ্ত বাক্যে জানালেন, ‘নদী খনন বা স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।’ তবে গাইবান্ধা বাপাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানালেন- ‘নদী খনন, রক্ষা এই দিকগুলো তারা দেখলেও চাইলেই চরের মানুষের জীবন-জীবিকা, আর্থিক দুরাবস্থার উন্নয়নে সহায়তাপাশে থাকার সুযোগ নেই।