কিছু বিদায় থাকে, যা শুধু একজন মানুষের জীবনের সমাপ্তি নয়-তা একটি জাতির আবেগ, স্মৃতি ও সংগ্রামের দীর্ঘ অধ্যায়ের ইতি টানে। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় তেমনই এক বিদায়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে অশ্রুসিক্ত করে নতুন করে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে-ক্ষমতা আসলে কোথায়, রাষ্ট্রের কাঠামোয় নাকি মানুষের হৃদয়ে? ক্ষমতার বাইরে থেকেও যে নেতা জনসমুদ্রের ভালোবাসায় সিক্ত হন, তার জীবন নিছক রাজনৈতিক জীবনী নয়-তা হয়ে ওঠে মহাকাব্য। বেগম খালেদা জিয়ার জানাযায় মানুষের ঢল ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনের ফল; তা ছিল দীর্ঘদিনের না বলা কষ্ট, অব্যক্ত ভালোবাসা আর নিঃশব্দ প্রতিবাদের সম্মিলিত প্রকাশ। প্রতিটি চোখের জল যেন বলছিল-এই বিদায় শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নয়, এই বিদায় আমাদের আপন একজন মানুষের।
তিনি ছিলেন আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক। জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন রাজনৈতিক অবরোধ, নিঃসঙ্গতা, অবমূল্যায়ন এবং কারাবরণের মধ্য দিয়ে। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও যেমন দৃঢ় ছিলেন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও ছিলেন অদম্য। এই দৃঢ়তাই তাকে মানুষের হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। তার জানাযার জনসমুদ্র ইতিহাসের সামনে এক নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে-যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই, প্রশাসনিক প্রভাব নেই, সেখানে এত মানুষের উপস্থিতি কীভাবে সম্ভব? উত্তর একটাই-ভালোবাসা কখনো জোর করে আদায় করা যায় না, তা অর্জন করতে হয় ত্যাগ আর সততার মাধ্যমে।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক, নিপীড়নের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর। অনেক সময় তার কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, তার উপস্থিতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে-যাকে মানুষ গ্রহণ করে নেয়, তাকে মুছে ফেলা যায় না। এই বিদায় আমাদের শেখায়, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী। রাষ্ট্রের পদ চলে যায়, পতাকা নামিয়ে রাখা হয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে গড়া স্মৃতিস্তম্ভ অটুট থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার জানাযার জনসমুদ্র সেই অটুট স্মৃতিস্তম্ভেরই জীবন্ত প্রমাণ। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সংগ্রাম, তার আপোষহীন অবস্থান এবং তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়, মানুষের হৃদয়ে। এই বিদায় কোনো পরাজয় নয়-এ এক বিজয়ী বিদায়। যেখানে ক্ষমতার নয়, মানুষের ভালোবাসার জয় হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ একজন অভিভাবকতুল্য নেত্রীকে হারাল। কিন্তু ইতিহাস পেল এক মহাকাব্যিক অধ্যায়-যেখানে লেখা থাকবে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও কিভাবে মানুষের হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকা যায়। লেখক: গবেষক,কলামিস্ট ও শিক্ষক; চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ (গর্ভনিং বডি) ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য, বিএনপি।