শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫১ অপরাহ্ন
শিরোনাম ::
খুলনাঞ্চলে নদী খননে বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত, শতাধিক যাত্রী আহত আত্রাই এলাকার উন্নয়নে আমার চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না-এমপি রেজু শেখ রাজশাহীতে সমাহিত করা হবে অভিনেতা শামস সুমন ধামইরহাটে দল ও জনগণের সমর্থন পেলে পৌরবাসীর সেবা করতে চান আনোয়ারুল ইসলাম কয়রায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ করলেন এমপি আবুল কালাম আজাদ তারাকান্দায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেক অসহায় ও দুঃস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ এনাম ডেন্টাল অ্যান্ড আই কেয়ারের উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পৌঁছাল নিহত বিএনপি নেতা অলিউল্লাহ মোল্যার বাড়িতে নড়াইলের লোহাগড়ায় জিয়া পরিষদের আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল

মোবাইল ও শিশু বিকাশ

অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬

একজন চিকিৎসক হওয়ায় আমার কাছে মা-বাবারা প্রায়ই তিন বছর বয়স থেকে শুরু করে বিশ্বদ্যালয় পড়–য়া সন্তানদের নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য, পরামর্শের জন্য। মা-বাবার অভিযোগ শিশুরা ঠিক মতো খায় না। তিন বছরের শিশুকে খাওয়ানোর জন্য এক মা চৎকার (!) একটি কৌশল বের করেছেন। বাচ্চার হাতে মোবাইল ফোন বা ট্যাব ধরিয়ে দিয়ে তাতে কার্টুন বা খেলা যেটা শিশু পছন্দ করে চালিয়ে দিয়ে শিশুকে খাওয়াতে থাকেন। শিশুর চোখ থাকে মোবাইল বা ট্যাবের দিকে। তার এই মোবাইল নিবিষ্টতার সুযোগে মা শিশুকে খাইয়ে দেন। আরেক সাধারণ অভিযোগ শিশু ঘন ঘন চোখের পলক ফেলে বা অতিরিক্ত চোখ কচলায়। অন্য এক ধরনের অভিযোগ শুনতে হয়, শিশুর চোখ প্রায়ই লালচে থাকে। অনেকে আলো পছন্দ করে না বা সহ্য করতে পারে না। একটু উঁচু ক্লাসের শিশুদের অভিভাবকদের অভিযোগ, তাদের শিশুরা স্কুলে বোর্ডের লেখা ঠিকভাবে বুঝতে পারে না- ভুল লিখে নিয়ে আসে। এসব ক্ষেত্রে একটা সাধারণ মিল দেখা যায়। তা হচ্ছে, এ সব শিশুর হাতে রয়েছে মোবাইল সেট। এরা মোবাইলে ব্যস্ত থাকে ঘুম না আসা পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, স্কুলে যাওয়ার পথে গাড়িতে উঠেই শিশুরা সবার আগে মোবাইল বা ট্যাব হাতে নিয়ে খেলতে শুরু করে। আবার বাড়ি ফিরেই মোবাইল বা ট্যাব নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকে। বাড়িতে কে এলো, কে গেলো খবর নেই। এটা মোবাইল আসক্তি; যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায়। তাদের চিন্তাশক্তি, স্মরণশক্তির বিকাশের পথে বড় বাধা। একদিকে মোবাইল আসক্তি- অন্যদিকে ফাস্ট ফুড, এ দু’য়ের চক্রে আমাদের শিশুরা বন্দী হয়ে পড়েছে। তাদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ, সামাজিকতা, সবই এই চক্রে হারিয়ে গেছে। ক্ষুধামন্দা, মেজাজের ভারসাম্যহীনতা, ঘুমের স্বল্পতা, খেলাধুলায় অনীহা, টেলিভিশনের খবর বা খবরের কাগজ পড়ার অনিচ্ছা সব কিছুই মোবাইল আসক্তির কারণে। এর চিকিৎসা মাদকাশক্তি চিকিৎসার চেয়েও কঠিন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই অবস্থা দেখে মোবাইল ফোনের জনক দুঃখ ভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, সেল ফোনের এই সর্বনাশা ক্ষমতা বুঝতে পারলে তিনি কোনো দিনই এটা তৈরি করতেন না। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিলিয়নিয়ার বিল গেটস তার সন্তানদের ১৫ বছর বয়সের আগে সেলফোন ব্যবহার করতে দেননি এ কারণেই। সেলফোন নির্ভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আরো বেশি ক্ষতিসাধন করছে কিশোর-কিশোরীদের। এসব মাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন অ্যাপস-এর কল্যাণে কিশোর-কিশোরীরা পথভ্রষ্ট হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে অনৈতিক অশালীন ও অসামাজিক জীবনাচারে। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের সমাজকর্মীদের তেমন কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা দেখা যায় না। চোখে পড়ে না কোনো শিশু-কিশোর সংগঠন বা টঘঊঝঈঙ এর কোনো কার্যকর ভূমিকা। ইদানীং যোগ হওয়া অনলাইন পাঠদান শিশুদের মোবাইল সম্পৃক্ততা আরো বাড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অত্যন্ত জরুরি। শিশুর মেধা বিকাশের অন্যতম অন্তরায় মোবাইল আসক্তি।
মোবাইল আসক্তি প্রতিরোধে পরিবারকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুর সাথে পরিবারের সদস্যদের প্রচুর সময় দিতে হবে। তাদেরকে ব্যস্ত রাখতে হবে অন্যভাবে। বাইরে নিয়ে যাওয়া, গল্প বলা, বিভিন্ন খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া যেতে পারে। বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। এতে তারা বই নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। শিশু যতক্ষণ জেগে থাকবে, বাবা মাকে তার সঙ্গ দেয়া দরকার। বাড়িতে দাদা-দাদী থাকলে তাদের সাথে শিশুর সম্পৃক্ততা বাড়ানো মোবাইল আসক্তি ঠেকানোর আরেকটি উপায়। অবসর সময়ে কুরআন শিক্ষার বা ছবি আঁকার ব্যবস্থা করে দিলে শিশুরা ব্যস্ত থাকবে। আজকাল শিশু-কিশোরদের হাতে দেখা যায় আইফোন জাতীয় দামি ফোনও। এ ধরনের ফোন ব্যবহারে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, জীবনের শুরুতেই তার মনে সামাজিক বৈষম্যের বীজ রোপিত হয়। মোবাইল আসক্তি ঠেকানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দায় আছে। রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দেয়া যায়। কিশোরদের সুরক্ষায় অস্ট্রেলিয়ায় ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৬ বছর বয়সের শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আইন বাস্তবায়নের আগেই মেটা মালিকানাধীন কিশোরদের জন্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এ ব্যাপারে কাজ করা শুরু করেছে। এ পদক্ষেপ কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, সাথে সাথে অভিভাবকদের ওপর চাপ কমাবে।
স্কুল শেষে শিশুরা পরিবারের সাথে সময় কাটানোর ও বিশ্রামের সুযোগ পাবে। একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে ফ্রান্স, ইতালি, নরওয়ে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০টি রাজ্য এ ব্যাপারে ইতিবাচক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। এ ধরনের আইন সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাও ক্ষতিকর মানসিক প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করবে।
এশিয়ায় ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এ ধরনের আইন বিধিবদ্ধ করেছে। চীন, উত্তর কোরিয়া এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিবেশী ভারতে রয়েছে কঠোর সেন্সরশিপ। মালয়েশিয়ায় এ ধরনের আইন কার্যকর আছে এক বছর ধরে। সিঙ্গাপুর স্কুলে সেলফোন নিষিদ্ধ করেছে। জাপান এ ব্যাপারে ভূমিকা নেয়ার কথা ভাবছে। বিশ্বে ৭১ শতাংশ মানুষ শিশুর হাতে মোবাইল ফোন দেয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ ধরনের আইন বা বিধিনিষেধ শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা দেবে। সাথে সাথে তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ত্বরান্বিত করবে। বাংলাদেশ ভ্রমণ
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
shah.b.islam@gmail.com




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com