বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম ::
উন্নয়ন ও সঠিক পরিকল্পনা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ঐতিহ্য হারাচ্ছে পাইকগাছার চাঁদখালী হাট সুটিয়াকাঠীর প্রধান শিক্ষক মোঃ জাহিদকে নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ির অভিযোগ মৌলভীবাজারে সাংবাদিকদের সম্মানে জেলা জামায়াতের ইফতার মাহফিল উলিপুরে সাংবাদিকদের সম্মানে নব-নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যের ইফতার মাহফিল সিংড়ায় হাঁসের ডিমের দামে ধস, দিশেহারা খামারিরা লামা পৌর বিএনপির উদ্যোগে ইফতার মাহফিল নীতিমালা সংশোধনের দাবিতে শেরপুরে খুচরা সার বিক্রেতাদের মানববন্ধন জামালপুরে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গঠনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বিষয়ক সচেতনতামূলক সভা কমলগঞ্জে ফাগুয়া উৎসবে মাতোয়ারা চা শ্রমিকরা কালিয়ায় ইয়াবাসহ এক ব্যক্তি আটক

‘ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ একটি আশা, আছে উদ্বেগও

আইটি ডেস্ক:
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
অনেকে বলছেন এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিছু বাস্তব উদ্বেগও। ছবি: এআই

বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের পরিচয় যাচাই সহজ করা, ব্যাংকিং ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতকে আরও গতিশীল করতে সরকারি উদ্যোগে চালু হলো ফ্রিল্যান্সার আইডি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার। এখন থেকে প্রকৃত ফ্রিল্যান্সাররা অনলাইনে আবেদন করে পাবেন ডিজিটাল আইডি কার্ড। ফ্রিল্যান্সাররা একে একটি আশা হিসেবেই দেখছেন। তবে অনেকে বলছেন এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিছু বাস্তব উদ্বেগও।
আইসিটি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইডি কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সাররা ব্যাংকিং সেবা, ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড সুবিধা, সরকারি আর্থিক প্রণোদনা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহজে প্রবেশাধিকার পাবেন। পাশাপাশি এটি একটি জাতীয় ফ্রিল্যান্সার ডেটাবেজ হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
গত ১৩ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এই সফটওয়্যার উদ্বোধনকালে জানান, অতীতের হয়রানি ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রাখা হয়েছে। আবেদন ফি, নবায়ন ফি ও প্রসেসিং ফিসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন বাতিল করা হয়েছে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আরও বলেন, ভবিষ্যতে ম্যানুয়াল আইডির পরিবর্তে এই ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সার আইডি গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে, যাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একে স্বীকৃতি দেয়।
ফ্রিল্যান্সারদের প্রতিক্রিয়া: স্বীকৃতিতে স্বস্তি
সরকারের এই উদ্যোগকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন ফ্রিল্যান্সাররা? ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা সালাউদ্দিন ইশাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই আইডি কার্ডকে আমি প্রাথমিকভাবে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। বাংলাদেশে লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করলেও, এতদিন তাদের কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। সেই জায়গা থেকে এটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।’
আরেক ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেক সময় মানুষ ফ্রিল্যান্সিংকে সিরিয়াস প্রফেশন হিসেবে নিতে চান না। সরকারি আইডি কার্ড থাকলে অন্তত প্রমাণ থাকবে যে, আমি অফিসিয়ালি একজন ফ্রিল্যান্সার। এটা শুধু ফেসবুক পেজ না, এটা সরকার-স্বীকৃত একটি পেশা।’
তবে সফটওয়্যার ডিজাইনার মো. জোবায়ের আলম বললেন কিছুটা ভিন্ন কথা। তার মতে, আইডি কার্ড চালুর আগে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যে মৌলিক সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো ঠিক করা না হলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে উল্টো ভোগান্তির কারণও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আবেগ নয়, নীতিগত ও বাস্তব দিক বিবেচনা করে আলোচনা করা জরুরি।’
কী প্রত্যাশা, কী উদ্বেগ
ফ্রিল্যান্সাররা এই কার্ডের মাধ্যমে কি সহজে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো পাবেন? ক্রেডিট কার্ড বা বিজনেস সাপোর্টে আলাদা প্রায়োরিটি পাবেন? ফ্রিল্যান্সারদের প্রত্যাশা সরকারি ট্রেনিং ইনসেনটিভ বা ট্যাক্স পলিসিতে এর সবকিছু নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসবে। অর্থাৎ, আইডি কার্ড শুধু পরিচয় নয়, বরং সুবিধার প্রবেশদ্বার হবে।
এসব প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন ইশাদ বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সাররা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, অথচ ব্যাংকে গেলে তারা এই পেশাটা কী, তা বুঝতেই চান না। সমাজে এখনও এই পেশাকে সিরিয়াসলি দেখা হয় না। এক্ষেত্রে এই স্বীকৃতিটা খুব কাজে দেবে। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সুবিধাগুলো এমন হতে হবে যে, ব্যাংকিং প্রসেস সহজ হবে, আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট বা কোম্পানির কাছে আমাদের পরিচয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। ভবিষ্যতে সরকারি বা করপোরেট প্রজেক্টে অংশগ্রহণের সুযোগ, ট্রেনিং, ফান্ডিং বা ইনসেন্টিভে অগ্রাধিকার পাওয়া যাবে।’
সালাউদ্দিন ইশাদ আরও বলেন, আইডি কার্ড আসলে কোনা সুবিধা না, সুবিধা হবে যদি এর সঙ্গে পলিসিগুলোও যুক্ত থাকে। পলিসিগুলো যদি আরও ফ্রিল্যান্সারবান্ধব হয়, তাহলে হয়তো সেগুলো আরো সুযোগ-সুবিধা তৈরি করবে।
কিছু উদ্বেগের কথাও জানান এই ফ্রিল্যান্সার। তিনি বলেন, ‘এর ডাটা কোথায় থাকবে, কে কে এই ডাটার অ্যাক্সেস পাবে, ভবিষ্যতে এটি কর বা অন্য চাপ তৈরির জন্য ব্যবহার হবে কি না – এগুলো নিয়ে সন্দেহ আছে। এগুলোর জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা, ডাটা প্রাইভেসি আইন, স্পষ্ট কমিউনিকেশন দরকার। এই প্লাটফর্মে যদি ফ্রিল্যান্সারদের আস্থা তৈরি না হয়, তাহলে এটি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হবে বলে মনে হয় না।’
এই কার্ডের ঝুঁকি প্রসঙ্গে মো. জোবায়ের আলম বলেন, ‘অনেক ঝুঁকির একটি হলো ফ্রিল্যান্সিংয়ের স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতে পারে। এই খাতের শক্তি হলো কম নিয়মে দ্রুত কাজ করার সুযোগ। ভবিষ্যতে যদি আইডি কার্ডকে লাইসেন্স, বার্ষিক নবায়ন, অপ্রয়োজনীয় শর্ত বা অনুমতি – এসবের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে তা কর্মসংস্থানের এই বড় সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
একটি বাস্তব সমস্যা তুলে ধরে জোবায়ের বলেন, ‘বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণে পেওনিয়ার ব্যবহার করেন। এই মাধ্যমে দেশে আসে মিলিয়ন ডলার। অথচ আমরা যখন ব্যাংকে যাই, অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘পেওনিয়ার আমাদের রেমিটেন্স লিস্টে নাই। এটা শুধু দুঃখজনক নয়, এটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও। যে চ্যানেল দিয়ে নিয়মিত বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে, সেটাকে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে সেই রেমিটেন্স প্রবাহকেই অস্বীকার করা।’
পেওনিয়ার নিয়েও আক্ষেপ করেন এই পেশাজীবী। তিনি বলেন, ‘পেওনিয়ার, বলা যায়, একচেটিয়া অবস্থানে চলে গেছে। বিকল্প কম, প্রতিযোগিতা কম, তাই তাদের কাছ থেকে ন্যায্য এক্সচেঞ্জ রেট পাওয়া যায় না। বরং আমরা সবচেয়ে কম রেটে ডলার ভাঙাতে বাধ্য হচ্ছি। এমন পরিস্থিতিতে সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এই পুরো ব্যবস্থায় একধরনের সরকারি-বেসরকারি ফাঁদ তৈরি হয়েছে, যেখানে আমরা ডলার আনি, কিন্তু ন্যায্য মূল্য পাই না।’
ফ্রিল্যান্সাররা মনে করেন, তারা এখন আর অদৃশ্য পেশাজীবী নন, তারা দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের জন্য পরিচয়পত্রের উদ্যোগ একটি শক্তিশালী সূচনা হলেও বিষয়টির সফলতা নির্ভর করবে এর সঙ্গে যুক্ত বাস্তব নীতি ও সুবিধার ওপর। এখন দেখার বিষয়, এই আইডি কার্ড বাস্তবে কতটা কাজে লাগে। জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু কার্ড দিলেই হবে না। ব্যাংক লোন, ভিসা সাপোর্ট, ইনস্যুরেন্স ও ট্রেনিং যুক্ত হলেই এই আইডি সত্যিকার অর্থে গেম চেঞ্জার হবে।
কী মনে করছেন অংশীজনেরা
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহিম বলেন, ‘এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন ফ্রিল্যান্সাররা বৈদেশিক আয় করলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে ছিলেন না। সরকারি আইডি কার্ডের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং খাত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় এসেছে। অনেক দেশে ফ্রিল্যান্সিং এখনও প্ল্যাটফর্মনির্ভর হলেও বাংলাদেশ সরকারের নতুন এ উদ্যোগের কারণে এটি আন্তর্জাতিকভাবেও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করবে।
তিনি বলেন, অনেক দেশে ফ্রিল্যান্সিং এখনো মূলত বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা বেসরকারি উদ্যোগনির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের এই উদ্যোগ সরকার-স্বীকৃত, কেন্দ্রীয় এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক, যা একে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর করে তুলবে। এই আইডি কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং এটি ব্যাংকিং, নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক ও আর্থিক সুবিধার সঙ্গে সংযুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেমের অংশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা একটি শক্তিশালী ও স্বীকৃত পরিচয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবে। বলা যায়, এই মডেলটি অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, কোনো নতুন উদ্যোগের শুরুতেই সব সেবা সম্পূর্ণ ও পরিপক্বভাবে পাওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান অসংগতি সংশোধন করে এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা ও মূল্য ক্রমেই বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শেষকথা
এই পেশার সঙ্গে জড়িতরা মনে করেন, যথাযথ স্বীকৃতির জন্য ন্যূনতম ইনকামের মানদন্ড আরো বাস্তবভিত্তিক করা দরকার। শুধু ৫০ ডলার দেখালেই ফ্রিল্যান্সার হয়ে যাবে, এটি বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া দক্ষতা ও কাজের ধরণে ধারাবাহিকতাও বিবেচনায় আনা উচিত, যাতে প্রক্রিয়াটিকে আরও নির্ভরযোগ্য মনে হয়।
সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তারা মনে করেন, কিছু বাস্তব ইন্সেন্টিভ যেমন, সুদমুক্ত লেনদেন, স্বল্পমেয়াদি আলাউনস, ভবিষ্যতের জন্য পেনশন বা সেভিং স্কিল, ফ্রিল্যান্সার ও জব হোল্ডারদের জন্য আলাদা বিভাগ করা, যারা নিয়মিত রেমিটেন্স আনছেন তাদের জন্য আলাদা নীতিমালা থাকা উচিত।
হতাশাও কাজ করে ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে। তারা মনে করেন, দেশে রেমিটেন্স আনেন, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ভূমিকা রাখেন, বিনিময়ে প্রণোদনা তো দূরের কথা, পান না কিছুই। তাই নীতিমালা একতরফাভাবে না করে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষদের এতে যুক্ত করা উচিত। অন্যদিকে নিজেদের কোথায় আরো উন্নতি করার সুযোগ আছে, তা নিয়ে ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটির নিয়মিত আলোচনা এবং বৈঠক করা উচিত।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com