মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার যাদুয়ারচর এলাকার মো. জসিম মাদবর। পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক। উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষক পরিবারের সন্তান জসিম মাদবরের কৃষির প্রতি রয়েছে প্রচ- দুর্বলতা! চাকরির পাশাপাশি কৃষি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলে তার। ১৬০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন জাতের কুল (বড়ই) বাগান ।করোনাকালীন ঘরবন্দি সময়কে কাজে লাগান তিনি। ইউটিউবে বড়ই চাষ দেখতে থাকেন। পরে চুয়াডাঙ্গা গিয়ে প্রশিক্ষণও নেন বড়ই চাষের ওপর। প্রথমে কয়েকজন সহকর্মীদের সঙ্গে শুরু করেন বড়ই চাষ। এরপর জমি কিনে নিজেই বড়ই চাষে নামেন তিনি। দুই বছরের মধ্যেই তার বড়ই ক্ষেতে অভাবনীয় সাফল্য আসে। প্রচুর ফলন হয়। স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় বাজারে চাহিদাও বেশি তার বড়ইয়ের। প্রবল আগ্রহ আর পরিশ্রম করার মানসিকতাই তাকে চাষাবাদে ভালো ফল এনে দিয়েছে বলে তিনি জানান। সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকজনকে নিয়ে বাজারে বিক্রি উপযোগী বড়ই সংগ্রহ করছেন ঘুরে ঘুরে। প্রায় প্রতিদিনই বিক্রি উপযোগী বড়ই সংগ্রহ করা হয় বাগান থেকে। তিনি জানান, বাজারে থাকা অন্যান্য বড়ইয়ের তুলনায় তার বাগানের বড়ইয়ের স্বাদ ভালো, তাই চাহিদা বেশি। দোকানিরা অগ্রীম টাকা দিয়ে বড়ই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া খুচরা ক্রেতারাও তার কাছ থেকে বড়ই কিনে নেন। অনেকেই সরাসরি এসে বাগান থেকে বড়ই কিনে নিয়ে যান। ভালো ফলন এবং বাজারে চাহিদা থাকায় খুশি শখের এ কৃষক। চাষাবাদ নিয়ে আরও বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। রয়েছে ভবিষ্যত পরিকল্পনাও। গাছ থেকে বড়ই সংগ্রহ করতে করতে মনির হোসেন বলেন, এটা আমার চাচার বাগান, আমি মাঝে মাঝে এই বাগানে আসি, চাচাকে সহযোগিতা করি এবং কাজ শিখছি। ভবিষ্যতে আমারও একটা বড়ই বাগান করার ইচ্ছে আছে। আরেক শ্রমিক ইসমাইল হোসেন বলেন, আমি প্রতিদিন এই বাগানে বড়ই তুলে দেই, এখানে কাজ করে আমার সংসার চলে। আলাপচারিতায় জসিম মাদবর জানান, বাড়ির কাছেই ৭১ শতাংশ কৃষি জমি কিনেছেন বড়ই চাষের জন্য। দুই বছর আগে প্রথম এককভাবে চাষাবাদ শুরু করেন। বাগানে চার শতাধিক বরই গাছ লাগান। বল সুন্দরী, ভারত সুন্দরী এবং আগাম টক নামের তিন জাতের বড়ই গাছ রয়েছে তার বাগানে। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে আমার বাগানে প্রথম ভারত সুন্দরী গাছে ফলন আসে। বাজারে প্রথম দিকে আমি প্রতি কেজি ১০০ টাকা করে বিক্রি শুরু করি। এরপর ৮০ টাকা করে বিক্রি করছি। এখন ‘বল সুন্দরী’ বিক্রির উপযোগী হয়েছে। বাজারে ‘বল সুন্দরী’ বড়ইয়ের দাম ৮০ টাকা কেজি। আমার চার শতাধিক গাছ থেকে প্রতিদিনই বড়ই বিক্রি করেছি। তিনি আরও বলেন, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে গাছে ফলন আসা পর্যন্ত আমার যে টাকা খরচ হয়েছে; ফলন ভালো হওয়ায় বড়ই বিক্রি করে খরচ ওঠার পরও লাভবান হওয়ার আশা করছি। বড়ই মিষ্টি হওয়ার কারণ নিয়ে তিনি বলেন, যারা পেশাদার চাষি, তারা হরমোন বা নানা ধরনের ক্যামিক্যাল ব্যবহার করেন, যাতে দ্রুত ফলন আসে। ফলন আসার পর জমিতে সেচ ব্যবস্থা রাখেন। এতে বড়ই বড় এবং রসালো হয় তবে মিষ্টভাব কম থাকে। এক্ষেত্রে আমার বড়ই সম্পূর্ণ আলাদা। সঠিক সময়ে ফলন আসা, কোনো রকম ক্যামিক্যাল ব্যবহার না করা এবং ফলন আসার পর আমি সেচ বন্ধ রাখি। এতে স্বাভাবিক নিয়মেই বড়ই বড় হতে থাকে। এ কারণেই বড়ই মিষ্টি হয়েছে। আমার বাগানের বড়ই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে বড় হয়।বেকার যুবকদের বড়ই চাষসহ যে কোনো চাষাবাদে আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে জসিম মাদবর বলেন, কৃষিতে শ্রম দিলে কৃষি মানুষকে ঠকায় না। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি আমাদের চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠতে হবে। আমি এ বছর বড়ইয়ের চারাও দিয়েছি। শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো: আলিমুজ্জামান খান বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আপেল কুল, কাশ্মিরী কুলসহ নানা জাতের কুল বড়ই চাষ হচ্ছে। এখানে বেশ ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আমরা চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই বড়ই চাষে ঝুঁকছেন। তরুন উদ্যোক্তা যারাই কোন বাগান করতে চায়, আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকি।