চল্লিশ পার হওয়ার পর শরীর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। আগে যা অনায়াসে করা যেত, এখন সেখানে একটু ক্লান্তি আসে। ওজন বাড়ে সহজেই, পেটের দিকে মেদ জমে, সারাদিন বসে থাকার অভ্যাস তৈরি হয়। ঠিক এই সময়েই টাইপ টু ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে জায়গা করে নিতে শুরু করে। এই রোগটা একদিনে হয় না, অনেক বছরের ভুল লাইফস্টাইলের ফল হিসেবেই এটি দেখা দেয়।
টাইপ টু ডায়াবেটিস মূলত তখনই হয়, যখন শরীর ইনসুলিনকে ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে। এর সঙ্গে যদি পেটের ভুঁড়ি, কম নড়াচড়া, অনিয়ন্ত্রিত খাবার এবং মানসিক চাপ যুক্ত হয়, তাহলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে শুরু করে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এই প্রক্রিয়াটি অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই চলতে থাকে। ফলে মানুষ বুঝতেই পারে না যে সে ঝুঁকির মধ্যে আছে।
৪০ বছরের পর ডায়াবেটিস থেকে দূরে থাকতে চাইলে বড় কোনো ত্যাগের দরকার নেই, দরকার কিছু বাস্তবসম্মত পরিবর্তন। খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাত বা কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে আগের তুলনায় কম খেতে হবে। সাদা চালের বদলে ধীরে হজম হয় এমন খাবার বেছে নেওয়া, প্রতিদিন সবজি রাখার চেষ্টা করা এবং মিষ্টি ও ভাজাপোড়া সীমিত করলেই শরীর অনেকটাই সাড়া দেয়। বিশেষ করে রাতে হালকা খাবার খাওয়ার অভ্যাস ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে।
খাবারের পাশাপাশি শরীরকে নিয়মিত নড়াচড়ায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সারাদিন জিমে কাটাতে না পারলেও প্রতিদিন আধাঘণ্টা হাঁটা, অফিস বা বাসায় সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা একটানা বসে না থেকে মাঝে মাঝে উঠেঘুরে নেওয়াই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আসলে শরীর যত সচল থাকবে, ইনসুলিন তত ভালোভাবে কাজ করবে।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে ঘুম এবং মানসিক চাপের সম্পর্কও গভীর। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার প্রভাব পড়ে ব্লাড সুগারের ওপর। একইভাবে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই রাতে অন্তত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমানো, ঘুমানোর আগে মোবাইলের ব্যবহার কমানো এবং নিজের জন্য প্রতিদিন একটু নিরিবিলি সময় বের করা খুবই জরুরি।
চল্লিশের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ভয়ের বিষয় নয়, বরং সচেতন থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। বছরে অন্তত একবার ব্লাড সুগার ও ঐনঅ১প পরীক্ষা করলে শরীরের অবস্থা আগেভাগেই বোঝা যায়। সমস্যা শুরুর আগেই ধরা পড়লে ডায়াবেটিস অনেক বছর দূরে রাখা সম্ভব।
টাইপ টু ডায়াবেটিস কোনো হঠাৎ আসা রোগ নয় এবং এটিকে এড়িয়ে চলাও অসম্ভব কিছু নয়। একটু সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত নড়াচড়া, পরিমিত খাবার ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই ৪০-এর পরও সুস্থ থাকা যায়। নিজের জন্য এই পরিবর্তনগুলো করা মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্থ শরীর উপহার দেওয়া।