শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম ::
খুলনাঞ্চলে নদী খননে বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত, শতাধিক যাত্রী আহত আত্রাই এলাকার উন্নয়নে আমার চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না-এমপি রেজু শেখ রাজশাহীতে সমাহিত করা হবে অভিনেতা শামস সুমন ধামইরহাটে দল ও জনগণের সমর্থন পেলে পৌরবাসীর সেবা করতে চান আনোয়ারুল ইসলাম কয়রায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ করলেন এমপি আবুল কালাম আজাদ তারাকান্দায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেক অসহায় ও দুঃস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ এনাম ডেন্টাল অ্যান্ড আই কেয়ারের উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পৌঁছাল নিহত বিএনপি নেতা অলিউল্লাহ মোল্যার বাড়িতে নড়াইলের লোহাগড়ায় জিয়া পরিষদের আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল

মিল্লাতে ইবরাহিম : বুদ্ধি, ফিতরাত ও তাওহিদের পথ

ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬

আমাদের যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝতে হবে, তা হলো আমাদের ইতিহাসে নবী ইবরাহিম (আ.) কেন এত গভীর তাৎপর্যের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ইবরাহিম (আ.) ছিলেন একজন নেতা ও পথপ্রদর্শক; তাঁর বংশধারা থেকেই বহু নবীর আগমন ঘটেছে। ইবরাহিম (আ.) প্রথম নবী নন, আদম (আ.) নবী ছিলেন, নুহ (আ.) নবী ছিলেন, এবং তাঁদের পরও অসংখ্য নবী (আ.) এসেছেন।
সময়ের প্রবাহে মানুষ আল্লাহর দ্বিনের মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু তার মর্ম ও আত্মাকে ভুল বুঝেছে।
ঈমান অর্থ আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। দ্বিনের দুটি দিক রয়েছে, একটি ঈমান, অন্যটি ইসলাম। ঈমান বুদ্ধিবৃত্তিক; এতে বোঝাপড়া জড়িত। তুমি উপলব্ধি করো।
এরপর আসে ইসলাম, যা সেই উপলব্ধির বাস্তব রূপায়ণ। নবুয়তের বার্তাকে সংরক্ষণের জন্য এই দুই দিকই বিদ্যমান ছিল, যার পরিণতি ঘটে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতে।
ওহি, অনুধাবন ও নবায়ন
আল্লাহ যখন কোনো মর্যাদা বা দায়িত্ব নির্ধারণ করেন, তখন কেউ তা কামনা করে আর কেউ তা অর্জন করে। কোরআনের মাধ্যমে আল্লাহ এক নতুন পদ্ধতি, নতুন গতি ও নতুন উদ্যোগের সূচনা করেছেন।
প্রতিটি আন্দোলনেরই তাৎপর্য থাকে, তবে তার জন্য প্রয়োজন চিন্তা, পরিশুদ্ধি, নবায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন। আল্লাহ তাআলা অনুধাবন দান করেন।
সত্যিকারের অনুধাবন মিথ্যাকে ধারণ করতে পারে না। কখনো মানুষ জ্ঞানের অভাবে ভোগে, তবু চিন্তা করে। চিন্তা ভাবনাকে সতেজ করে, উপলব্ধিকে গভীর করে।
তুমি জানো কী সঠিক, কিন্তু অনুধাবন সেই সঠিকটিকে পূর্ণতা দিয়ে ধরতে চায়। জ্ঞান যখন অন্তরে প্রোথিত হয়, তখন তা শক্তিতে রূপ নেয়। আল্লাহ এটাই চান।
‘মিল্লাত’ শব্দটি জীবিত অভিজ্ঞতা, সচেতনতা ও উপলব্ধির নাম। দ্বিন আল্লাহর পক্ষ থেকে; কিন্তু ইবরাহিম (আ.) এর মিল্লাত মানে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত সচেতনতা। এই দিক থেকেই ইবরাহিম (আ.) হয়ে ওঠেন আদর্শ ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
‘হানিফ’ পথ ও সমালোচনামূলক চিন্তা
দ্বিন আল্লাহরই, তবু আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-এর মিল্লাত প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইবরাহিম (আ.)-এর সম্প্রদায় ছিল হানিফ পথে, সরল ও অবিচল পথে অগ্রসর। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, কেন এই পথই সত্য, তবে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। যেমন—নিউটনের মতো চিন্তাবিদরা বাস্তবতাকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তেমনি ইবরাহিম (আ.)-কে বুঝতেও গভীর চিন্তার প্রয়োজন।
সামুদ ও আরবের জনগণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—দেখো, ভাবো, বোঝো। যখন সামুদরা পথনির্দেশ উপেক্ষা করল, ধ্বংস নেমে এলো। নবীরা তাঁদের বার্তা বারবার পৌঁছে দিয়েছেন। প্রশ্ন যদি সঠিকভাবে উত্থাপিত হয়, তবে পর্যবেক্ষক সঠিক কর্মে বাধ্য হয়।
রূপ ও সার : খাদ্য, সংস্কৃতি ও ধর্ম
খাদ্যের কথা ধরো, খাওয়া মানে শুধু বিরিয়ানি, সমুচা কিংবা কাবাব নয়; খাওয়া মানে পুষ্টি ও শক্তি অর্জন। সংস্কৃতি প্রায়ই এই বাস্তবতাকে বিকৃত করে, সারবস্তুর বদলে বাহ্যিক ভোগে মনোযোগ দেয়। ঠিক তেমনি ধর্মেও মানুষ অনেক সময় সার না বুঝেই আচার পালন করে।

ইবরাহিম (আ.) মানুষকে তাদের ফিতরাত, স্বভাবজাত প্রকৃতি জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন এবং প্রশ্ন তুলতে বলেছিলেন—কেন তোমরা উপাসনা করছ? সত্যিকারের ইবাদত আসে অনুধাবন থেকে, অন্ধ অনুকরণ থেকে নয়। বোঝাপড়াহীন অভ্যাসগত ইবাদত বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মুখাপেক্ষী, যাতে সচেতনতা পুনর্জীবিত হয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস ও নৈতিক স্বাধীনতা
ইবরাহিম (আ.) সত্যের সন্ধানে নিজ সম্প্রদায় ত্যাগ করেছিলেন, প্রয়োজনে একাকী দাঁড়ানোর মূল্য দিয়েও। কোরআন আমাদের জানায়, কিভাবে তিনি প্রজ্ঞা ও প্রখর যুক্তির সঙ্গে তাঁর জাতির সঙ্গে সংলাপ করেছেন এবং মূর্তিপূজার অসারতা উন্মোচন করেছেন। হেদায়েতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সূক্ষ্ম, অবিচল ও নীতিনিষ্ঠ।
প্রতিটি ধর্মই স্বীকার করে, মানবজীবনের সুখ দুই
প্রকার : বুদ্ধিবৃত্তিক সুখ ও আত্মিক সুখ। বুদ্ধিবৃত্তিক সুখ আসে যখন মানুষ বুঝতে পারে কেন ঘটনাগুলো ঘটে। আর আত্মিক সুখ জন্ম নেয় তখন, যখন নৈতিক চেতনা আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়। কিন্তু সংস্কৃতি অনেক সময় ধর্মকে ফাঁপা আচারেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে। ইবরাহিম (আ.) এমন ধর্ম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক দৃঢ়তা নেই।
আমি অস্তগামীকে ভালোবাসি না—মৌলিক ঘোষণা
ইবরাহিম (আ.) যখন নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তখন তিনি শুধু দৃশ্যমান রূপ দেখছিলেন না; তিনি স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ করছিলেন। নক্ষত্রটি যখন অদৃশ্য হয়ে গেল, তিনি ঘোষণা করলেন ‘আমি অস্তগামীকে ভালোবাসি না।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৭৬)
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র পর মানব ইতিহাসে সম্ভবত এর চেয়ে শক্তিশালী বাক্য খুব কমই আছে। এই ঘোষণা সব প্রতিমা ভেঙে দেয়, পদমর্যাদা, সম্পদ, ক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান, যা কিছুই ক্ষণস্থায়ী। অস্থায়ীর প্রতি ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত যন্ত্রণাই বয়ে আনে। সব প্রেমিকের ইতিহাস আসলে বিচ্ছেদের ইতিহাস। ইবরাহিম (আ.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ক্ষণভঙ্গুরের সঙ্গে যুক্ত ভালোবাসা অভিশাপ।
তিনি বলেননি, ‘আমি নক্ষত্র অপছন্দ করি।’ তিনি নীতিটিকে সর্বজনীন করেছেন, যা বিলীন হয়ে যায়, তা চূড়ান্ত ভালোবাসার যোগ্য নয়।
তাওহিদ ও সালাতের কোরআনিক বিন্যাস
এই ঘোষণাই সুরা আন-আনআমের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যেখানে তাওহিদ সর্বোচ্চ স্পষ্টতা ও দৃঢ়তায় উপস্থাপিত। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ইবরাহিম (আ.)। আল্লাহ চান এই সত্য প্রতিটি হৃদয়ে ও প্রতিটি বুদ্ধিতে প্রোথিত হোক।
এ কারণেই আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের গতিবিধির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন, যাতে প্রতিদিন মুমিনদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঘোষণার কথা।
হানিফিয়্যাতের অর্থ
হানিফ শব্দের দুটি অর্থ আছে—এক. সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। দুই. সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
অনেক মানুষ আল্লাহর দিকে মুখ ফেরায়, কিন্তু অন্য সব আসক্তি ছাড়তে রাজি হয় না। এটি ইবাদত নয়।
বিষয়টি বোঝাতে তাসবিহে ফাতিমা (রা.)-এর কথা ভাবুন। এটি শুধু ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ পড়া নয়। এর অর্থ প্রথমে কিছু ত্যাগ করা, তারপর স্মরণে প্রবেশ করা। ইবাদত সব সময়ই অর্জনের আগে ত্যাগের দাবি করে।
দুনিয়া হলো উপকরণ, ভালোবাসার বস্তু নয়
তাহলে কি দুনিয়াকে পুরোপুরি বর্জন করতে হবে? না। ইবরাহিম (আ.) তাঁর সময়ের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন; তাঁর ছিল বিপুল পশুধন। সমস্যা দুনিয়া ব্যবহার করা নয়, সমস্যা হলো আল্লাহর ওপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অতিথিদের জন্য প্রশ্ন না করেই বাছুর জবাই করা, ইবরাহিম (আ.) এই উদারতা প্রাচুর্যের সঙ্গে নিরাসক্তির দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাঁর হৃদয়ের এই মুক্ততাকেই ভালোবেসেছেন।
অবিরাম অনুসন্ধান, কখনো থেমে না যাওয়া
ইবরাহিম (আ.) কোনো আত্মিক স্তরেই থেমে যাননি। নিশ্চিত বিশ্বাসের পরও তিনি প্রার্থনা করেছেন—
‘হে আমার রব, আপনি কিভাবে মৃতকে জীবিত করেন, আমাকে দেখান।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২৬০)
এটি সংশয় ছিল না; ছিল আরো গভীর জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহ তাঁদেরই ভালোবাসেন, যারা তাঁকে খোঁজায় কখনো ক্লান্ত হয় না।
শিক্ষা, ভাষা ও কোরআন অনুধাবন
ধর্মকে থাকতে হবে বুদ্ধিতে, পোশাকে বা বংশানুক্রমে নয়। শিশুদের যদি শেখানো না হয় কেন ইসলাম সত্য, তবে তারা সব বিশ্বাসকে শুধু সংস্কৃতিগত বিকল্প হিসেবেই দেখবে।
কোরআন বুঝতে হলে তার ভাষা বুঝতে হবে। অর্থ হলো আত্মা, শব্দ হলো পোশাক। অর্থহীন তিলাওয়াত প্রভাব কমিয়ে দেয়। প্রতিটি সুরা বিদ্যমান, কারণ বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই অর্থ উন্মোচিত হয়, একঘেয়ে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে নয়।
উপসংহার : চিরজীবন্ত আদর্শ ইবরাহিম (আ.) কোনো গোত্রের নন, তিনি শুধু আল্লাহর। কোরআন বারবার তাঁকে বংশ ও জাতীয়তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করেছে। এমনকি কাবা সম্পর্কেও ঘোষণা করা হয়েছে : ‘সমগ্র মানবজাতির জন্য’। ইবরাহিম (আ.) বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস, নৈতিক স্বচ্ছতা ও সত্যের অবিরাম অনুসন্ধানের প্রতীক। এটাই ইবরাহিমি ঈমান, যুক্তিতে দৃঢ়, বিশ্বাসে অবিচল এবং পূর্ণ আনুগত্যে নিবেদিত এক বিশ্বাস।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com