আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায় ২১ শে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে এদেশের দামাল তরুণ ছাত্র জনতা। শহীদ হয়েছেন রফিক, আবদুস সালাম, বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর,আবদুল আউয়াল, অলিউল্লাহ। তাঁদের রক্তে লেখা সেই একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৯৯ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এরমাধ্যমে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অর্জনের পিছনে আছে এক সুদীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার সর্ব প্রথম দাবি ওঠেছিল ব্রিটিশ ভারতে ১৯১১ সালে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রংপুরে অনুষ্ঠিত এক ‘প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলন’- এ টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ভারতের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জাতীয় পর্যায়ে বাংলাকে স্বীকৃতি দানের আহ্বান জানান। ইতিহাস পর্যালোচনা করে বলা যায়, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা এই দিন থেকেই। এই আন্দোলন পরিণতি পায় ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির মধ্যদিয়ে। অবশ্য এর আগে ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে অন্যতম জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অবশ্য আন্দোলনের পর্ব বাদ দিলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাব সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তা রীতিমত চমকে দেয়ার মতো। ১৭৭৮ সালে একজন ইংরেজ প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর লেখা বইয়ের ভূমিকায়। যতদূর জানা যায়, প্রাচীন মুসলিম শাসন আমলর বাদ দিলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার করার এটিই প্রথম লিখিত প্রস্তাব। আলোচনার সুবিধার্থে বাংলা আন্দোলেনের ইতিহাসকে আমরা কয়েকটি পর্বে ভাগ করতে পারি: ১, সূচনা পর্ব ২. তমদ্দুন মজলিশ পর্ব ৩.গণআন্দোলন পর্ব: ৪. স্বীকৃতি পর্র্ব।
সূচনা পর্ব : কোন কোন গবেষক ১৭৭৮ সালে ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ও লেখক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড এৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব নবহমধষ ষধহমঁধমব নামে একটি ব্যাকরণ রচনা করার সময়কালকেই প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা ভাষার চর্চা শুরু বলে দাবি করেন। কিন্তু প্রখ্যাত গবেষক সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুদল মনসুর আহমদ তা মানতে নারাজ। তাঁর দাবি,‘বাংলা ভাষার ¯্রষ্টা এবং বাংলা সাহিত্যের পিতা বাংলার নবাব-বাদশাহরাই। সে হিসেবে বাংলা বাংগালী মুসলমানদের নিজস্ব ভাষা।’( সূত্র: বাংলাদেশের কালচার, আবুল মনসুর আহমদ,আহমদ পাবলিশিং হাউস,৬ষ্ঠ মুদ্রণ ২০০৮, আগস্ট, পৃষ্ঠা-১২৮)। তিনি অবশ্য এ কথা অস্বীকার করেননি যে সময়ের বির্বতনে ইংরজেদের দুই শত বছরের শাসনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের সুবিধার কথা চিন্তা করে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডকে এৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব নবহমধষ ষধহমঁধমব লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাংলা ভাষা সহজে রপ্ত করার কৌশল শিখা এবং বাংগালীদেরকে ইংরেজি ভাষা শিখানোর প্রয়াসে। তিনি তাঁর লেখা উল্লেখিত বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের ভূমিকায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি মনে করেছিলেন এতে কোম্পানির কাজ সহজ হবে। তারা খুব সহজে এ দেশের মানুষের কাছছাকাছি পৌছতে পারবে। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে এটাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম লিখিত প্রস্তাব।
ইংরেজ শাসন আমলে বাংলা ভূখ- ও ভাষা নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে, আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। যেমন: বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গরদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ইত্যাদি। উভয় দিকে থেকে এসব আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করা হলেও আসলে এই চেতনার মূলে এই অঞ্চলের মুসলমানদের মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসাকে উপেক্ষা করা হবে বড় ভুল। ১৯১১ সালে রংপুরে অনুষ্ঠিত এক ‘প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলন’ সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ভারতের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জাতীয় পর্যায়ে বাংলাকে স্বীকৃতি দানের আহ্বান জানান। ১৯১৮ সালে শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ভারতের সাধারণ ভাষা কি হবে এ বিষয়ে আলোচনা হলে রবীন্দ্রনাথ হিন্দির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর এ মতের বিরোধিতা করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভারতের সাধারণ ভাষা হিসেবে বাংলাভাষার দাবি পেশ করেছিলেন। ঐ বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক পত্রে মহাত্মা গান্ধীকে লিখেছিলেন, ঞযব ড়হষু ঢ়ড়ংংরনষব হধঃরড়হধষ ষধহমঁধমব ভড়ৎ রহঃবৎপড়ঁৎংব রহ ঐরহফর রহ ওহফরধ. (সূত্র : প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী, কলকাতা, ১৯৬৮, পৃ. ৭৮)। এদিকে কিছু মুসলমান নেতা ভারতের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার জন্য সরকারকে নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে ১৯২১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা ছিল মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ববঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নতুন গতি সৃষ্টি হয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একটি বাঙালি মধ্যবিত্ত শে্িরণ গড়ে ওঠে। যে শ্রেণিটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী পুনরায় ব্রিটিশ সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেন যে, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যা-ই হোক না কেন, বাংলার রাষ্ট্রভাষা বাংলা করতে হবে।
এক পর্যায় রাষ্ট্রভাষার দাবি বুদ্ধিজীবী মহল হতে পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক মহলসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন অর্থাৎ ১৯৩৬-৩৭ সালে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে একদিকে জাতীয় কংগ্রেস হিন্দির পক্ষে প্রচারণা চালায়; অপরদিকে এর পাল্টা মুসলিম লীগের একটি অংশ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রচারণায় নামে। ঠিক সেই সময় রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে দৈনিক আজাদের সম্পাদক ও মুসলিম লীগ নেতা মওলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) ১৯৩৭ সালের ২৩ এপ্রিল উক্ত পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই বিস্তৃত ভূখ-ে (বাংলা ভাষী অঞ্চল) প্রায় ৭ কোটি ৩০ লক্ষ লোক বাঙলা ভাষায় কথা বলে। হিন্দি ভাষীর সংখ্যা এর চেয়ে বেশি নয়। তাহা ছাড়া আসামী, উড়িয়া ও মৈথিলি বাঙলারই শাখা বলিলে অত্যুক্তি হয় না। পূর্ববঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গে ও বাঙলার বিভিন্ন জেলায় উচ্চারণের কিছু প্রভেদ আছে বটে, কিন্তু লেখ্য বাঙলার রূপ সর্বত্র একই। সাহিত্যের দিক দিয়া বাঙলা ভারতের সমস্ত প্রাদেশিক সাহিত্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাঙলা ভাষায় বিবিধ ভাব প্রকাশোপযোগী শব্দের সংখ্যাও বেশি। অতএব বাঙলা সব দিক দিয়াই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হইবার দাবি করিতে পারে। রাষ্ট্রভাষার আসনের উপর বাঙলা ভাষার দাবি সম্বন্ধে আর একটি কথাও বিশেষভাবে জোর দিয়া বলা যাইতে পারে। রাষ্ট্রভাষার নির্বাচন লইয়া হিন্দি-উর্দুর সমর্থকদের মধ্যে আজ যে তুমুল সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়া গিয়াছে, তাহার ফলে হয়ত উর্দু ও হিন্দির মধ্যে কোনটারই রাষ্ট্রভাষার আসন অধিকার করা সম্ভবপর হইবে না। কিন্তু বাঙলাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা হইলে এই সাম্প্রদায়িক সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা বহু পরিমাণ কমিয়া যাইতে পারে।’
এরপর পর্যায়ক্রমে ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের একটি সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাকে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়; ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক কাউন্সিলে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম বাংলাকে পূর্ববাংলার রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। ‘৪৭ সালের ২৭ জুন আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা ভাষাই হইবে ইহা বলাই বাহুল্য’। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ ‘৪৭ সালের ২৯ জুলাই হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা এবং উর্দুকে ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করলে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো ও যৌক্তিক প্রতিবাদ করেন, যা মাওলানা আকরম খাঁ ‘দৈনিক আজাদে’র মাধ্যমে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শিরোনামে প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হলে এটা রাজনৈতিক পরাধিনতারই নামান্তর হবে। … আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এটা কেবল বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতির বিরোধীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি বিগর্হিতও বটে’। পরেরদিন দৈনিক আজাদে আবারো ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সাংবাদিক মাহবুব জামাল জেহাদী লিখিত উক্ত নিবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো মত প্রকাশ করা হয়। এমতাবস্থায় ভারতবর্ষ ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন মুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টে ভারত এবং ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান।
তমদ্দুন মজলিশ পর্ব : বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রামের সাথে উজ্জ্বলভাবে জড়িয়ে আছে তমদ্দুন মজলিশের নাম। বাংলাপিডিয়ায় এই সংগঠনটির পরিচয় তুলে ধরে তাদের আন্দোলন সংগ্রাম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,‘তমদ্দুন মজলিশ ইসলামী আদর্শাশ্রয়ী একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। দেশে ইসলামী আদর্শ ও ভাবধারা সমুন্নত করার প্রত্যয় নিয়ে ভারত বিভাগের অব্যবহিত পরেই ঢাকায় গড়ে উঠে এই সংগঠনটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর নামকরণ হয় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ। তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠায় অধ্যাপক আবুল কাশেমের অগ্রণী সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক এ.এস.এম নূরুল হক ভূঁইয়া, শাহেদ আলী, আবদুল গফুর, বদরুদ্দীন উমর, হাসান ইকবাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় সিনিয়র ছাত্র। প্রফেসর আবুল কাশেম ছিলেন পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯৪৯ সালে মজলিশের সভাপতি নির্বাচিত হন।
নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ইসলামী চেতনার উন্মেষ ঘটানো এবং ইসলামী ভাবধারা ও সংস্কৃতির প্রসারই ছিল এই সাংস্কৃতিক ফোরামের মূল লক্ষ্য। এই ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা লক্ষ্যনীয়ভাবেই প্রভাবিত হয়েছিলেন বিশ শতকের চল্লিশের দশকের ক্যালকাটা রেনেসাঁ সোসাইটির মতাদর্শে। সম্ভবত তারা বিভাগপূর্ব বেঙ্গল মুসলিম লীগের বামপন্থী দর্শন বিশেষত আবুল হাশেমের বামপন্থী দর্শনে প্রভাবিত হন। তাদের মধ্যে ইসলামী বিপ্লব বা ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবং আরও কতক ব্যাপারে তাদের প্রত্যয় ও অবস্থান ছিল গণমুখী। তমদ্দুন মজলিশের গঠনতন্ত্রে বিধৃত এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপ: ১. কুসংস্কার, গতানুগতিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দূর করে ‘সুস্থ ও সুন্দর’ তমদ্দুন গড়ে তোলা; ২. যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত সর্বাঙ্গ সুন্দর ধর্মভিত্তিক সাম্যবাদের দিকে মানবসমাজকে এগিয়ে নেওয়া; ৩. মানবীয় মূল্যবোধ ভিত্তিক সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা; ৪. নিখুঁত চরিত্র গঠন করে গণজীবনের উন্নয়নে সহায়তা করা। প্রতিষ্ঠার পর এর প্রথম পর্বে তমদ্দুন মজলিশের ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। মজলিশের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় সারা বছর আলোচনা সভা, সেমিনার, বিতর্ক, নাট্যাভিনয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। এর নিয়মিত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তক-পুস্তিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ। তমদ্দুন মজলিশের বাংলা মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর (২৮ কার্তিক ১৩৫৫)। শুরুতে সৈনিক পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি ছিলেন শাহেদ আলী এবং পরে সভাপতি হন আবদুল গফুর। ঢাকার আজিমপুর রোডের ১৯ নং বাড়ি থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি চালু ছিল। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তমদ্দুন মজলিশ সমগ্র পূর্ব বাংলায় এর কর্মপরিধি বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়। জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে এবং কোথাও কোথাও থানা পর্যায়ে সংগঠনের শাখা স্থাপিত হয়। প্রথমদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ক্যাম্পাসের নিকটস্থ রশিদ বিল্ডিং -এ তমদ্দুন মজলিশের কেন্দ্রীয় দফতর স্থাপিত ছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে তমদ্দুন মজলিশের ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে বস্তুত তমদ্দুন মজলিশই প্রথম প্রতিবাদ উত্থাপন করে এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ ভাষা আন্দোলনের সূচনায় পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তমদ্দুন মজলিশ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে অধ্যাপক আবুল কাশেম সম্পাদিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এ ঐতিহাসিক পুস্তিকায় সন্নিবেশিত নিবন্ধগুলোতে এদের লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক আবুল কাশেম বাংলাকে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম, অফিস ও আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও তুলে ধরেন। এই মূল পুস্তিকার মুখবন্ধে, পুস্তিকার সম্পাদক আবুল কাশেম কর্তৃক প্রণীত একটি সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনাও ছিল বাংলা ভাষার অনুকূলে। বাংলাকে স্বীকৃতি দানের দাবির এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবনার সারসংক্ষেপ ছিল নিম্নরূপঃ ১. বাংলা ভাষাই হবে (ক) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন (খ) পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা এবং (গ) পূর্ব পাকিস্তানের অফিসের ভাষা; ২. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দাপ্তরিক ভাষা হবে দুটি- বাংলা ও উর্দু; ৩. (ক) বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা একশ’ জনই এ ভাষা শিক্ষা করবেন। (খ) পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা। যারা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকরি ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত হবেন শুধু তারাই এ ভাষা শিক্ষা করবেন। এই ভাষা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫ হতে ১০ জন শিক্ষা করলেও চলবে। মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণিতে এই ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেয়া হবে। (গ) ইংরেজি হবে পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। পাকিস্তানের কর্মচারী হিসেবে যারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকরি করবেন বা যারা উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষায় নিয়োজিত হবেন তারাই শুধু ইংরেজি শিক্ষা করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানে হাজার, করা একজনের চেয়ে কখনও বেশি হবে না। ঠিক এই নীতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে (স্থানীয় ভাষার দাবি না উঠলে) উর্দু প্রথম ভাষা, বাংলা দ্বিতীয় ভাষা আর ইংরেজি তৃতীয় ভাষার স্থান অধিকার করবে। ৪. শাসন কাজ ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধার জন্য আপাতত কয়েক বছরের জন্য ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসন কাজ চলবে। ইতিমধ্যে প্রয়োজনানুযায়ী বাংলা ভাষায় সংস্কার করতে হবে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাভাষা বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান কর্তৃক বাংলাভাষা ও বাংলালিপি সম্পর্কে দায়িত্বজ্ঞানহীন অশালীন উক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে তমদ্দুন মজলিশের নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ পরিষদের আহবায়ক নির্বাচিত হন মজলিশ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএসএম নূরুল হক ভূইয়া এবং কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন তমদ্দুন মজলিশের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাশেম। ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে আবুল কাশেম ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমনি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির সপক্ষে যুবসমাজ এবং বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্রদের সমর্থন লাভে তাঁর সাফল্য ছিল অভাবনীয়। এভাবেই প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে রূপলাভ করে একটি সাংগঠনিক কাঠামো, আর এরই মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকের মাসগুলোতে সংগঠিত হয় ভাষা আন্দোলন। করাচিতে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল এডুকেশন কনফারেন্সে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে প্রথম প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে তমদ্দুন মজলিশ কর্মী এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের যৌথসভায় মজলিশ কর্মী শামসুল আলমকে আহবায়ক করে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ’ নামে একটি নতুন কমিটি গঠিত হয়।
বাংলা ভাষার আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিশের অবস্থান ছিল পূর্ববাংলায় জনসাধারণের আকাঙ্খারই প্রতিফলন। তমদ্দুন মজলিশ ব্যাপক সাড়া পেয়েছে দেশের ইসলাম ভাবাপন্ন বিশিষ্ট মহল থেকে, বিশেষত ছাত্র ও শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীদের কাছ থেকে। তদুপরি ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিশের পথিকৃতের ভূমিকা এ সংগঠনের জন্য এনে দিয়েছে উদার ও মুক্তবুদ্ধির বিশিষ্ট জনগোষ্ঠীর মৌন সমর্থন, যদিও তারা ঐ আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে তমদ্দুন মজলিশ গড়ে উঠেছিল। এখানেই তমদ্দুন মজলিশের বিরাট সাফল্য যে, এই সংগঠন অত্যন্ত সফলভাবে দীর্ঘ পাঁচ বছর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সামাজিক প্রত্যয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে এর সাথে সম্পৃক্ত করে ভাষা আন্দোলনকে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেছে। ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনই তমদ্দুন মজলিশের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতা কর্মীরা সরকারের চরম নিগ্রহের শিকার হন। তাদের গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ করা হয়। পুলিশ হামলা চালিয়ে মজলিশের কেন্দ্রীয় দফতর এবং সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার অফিস তছনছ করে। সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুব গ্রেফতার হন। মজলিশের প্রথম কাতারের নেতা দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, প্রফেসর আবুল কাশেম, আবদুল গফুর প্রমুখ নিরাপত্তার জন্য মফঃস্বল এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নেন।
গণআন্দোলন পর্ব: বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণআন্দোলন শুরু হয়। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় একটি চূড়ান্ত দাবিনামা প্রস্তুত করা হয়। এতে বলা হয়: পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ও সরকারি কার্যাদি পরিচালনার মাধ্যম হবে বাংলা আর কেন্দ্রীয় সরকার পর্যায়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি বাংলা ও উর্দু। এই দাবিকে সামনে রেখে সর্বপ্রথম আন্দোলন সংগঠিত করে তমদ্দুন মজলিস। এর নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। ক্রমান্বয়ে অনেক সংগঠন এই আন্দোলনে যোগ দেয় এবং একসময় তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভার আয়োজন করে। সভার পরও মিছিল-প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। এ মাসেরই শেষদিকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া। পরের বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদ সদস্যদের উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এ প্রস্তাবে সংশোধনী এনে বাংলাকেও পরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই পূর্ব পাকিস্তানের, যাদের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন বিরোধিতা করলে এ দাবি বাতিল হয়ে যায়। এ খবর ঢাকায় পৌঁছলে ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরা বিক্ষুব্ধ হন। আজাদ-এর মতো পত্রিকাও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আনা প্রস্তাবে যারা বিরোধিতা করেছিল তাদের সমালোচনা করে। পরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন পরিচালনার জন্য একটি নতুন রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন শামসুল আলম।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি স্মরণীয় দিন। গণপরিষদের ভাষা-তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকেটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাখার প্রতিবাদস্বরূপ ওইদিন ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটিদের দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা। ধর্মঘটের পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই শ্লোগানসহ মিছিল করার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, অলি আহাদ, আবদুল ওয়াহেদ প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। আব্দুল মতিন, আবদুল মালেক উকিল প্রমুখ ছাত্রনেতাও উক্ত মিছিলে অংশ নেন; বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট সভা হয়। একজন পুলিশের নিকট থেকে রাইফেল ছিনিয়ে চেষ্টা করলে পুলিশের আঘাতে মোহাম্মদ তোয়াহা মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১২-১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়। আন্দোলনের মুখে সরকারের মনোভাব কিছুটা নমনীয় হয়। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তবে চুক্তিতে তিনি অনেকগুলি শর্তের সঙ্গে একমত হলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাঁকে কোনো কিছুই মানানো যায়নি।
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি ঢাকার দুটি সভায় বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গাতেই তিনি বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এ সময় সারা পূর্ব পাকিস্তানেই ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। জিন্নাহর বক্তব্য তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়; এর আহবায়ক ছিলেন আবদুল মতিন।
১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। এ সময় জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খান উভয়েই পরলোকগত। লিয়াকত আলী খানের জায়গায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দীন। রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুসলিম লীগের প্রতি আস্থা হারাতে থাকে। ১৯৪৯ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। পূর্ব পাকিস্তানে বঞ্চনা ও শোষণের অনুভূতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং এখানকার জনগণ ক্রমেই এই মতে বিশ্বাসী হতে শুরু করে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জায়গায় তাদের ওপরে আরোপিত হয়েছে নতুন ধরনের আরেক উপনিবেশবাদ। এ প্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, প্রদেশের সরকারি কাজকর্মে কোন ভাষা ব্যবহূত হবে তা প্রদেশের জনগণই ঠিক করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের এক সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়, যার আহবায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। এ সময় সরকার আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব পেশ করে। এর বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ( একুশে ফেব্রুয়ারি) সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কর্মসূচির আয়োজন চলার সময় সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আবুল হাশিমের (১৯০৫-৭৪) সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে কিনা এ প্রশ্নে সভায় দ্বিমত দেখা দেয় তবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সঙ্কল্পে অটুট থাকে। পরদিন সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাংশে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। সভা শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকসহ উপাচার্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন। তবে ছাত্র নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে আবদুল মতিন এবং গাজীউল হক নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়। ছাত্ররা পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাঁদের উপর লাঠিচার্জ করে, ছাত্রীরাও এ আক্রমন থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্রছাত্রীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জববার, আবুল বরকত (রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ শ্রেণীর ছাত্র) নিহত হয়। বহু আহতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে সেক্রেটারিয়েটের পিয়ন আবদুস সালাম মারা যায়। অহিউল্লাহ্ নামে আট/নয় বছরের এক কিশোরও সেদিন নিহত হয়। এ সময় গণপরিষদের অধিবেশন বসার প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশের গুলি চালানোর খবর পেয়ে গণপরিষদ সদস্য মওলানা তর্কবাগীশ এবং বিরোধী দলের সদস্যসহ আরও কয়েকজন সভাকক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন বাংলা ভাষার দাবির বিরোধিতা অব্যাহত রেখে বক্তব্য দেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছিল গণবিক্ষোভ ও পুলিশি নির্যাতনের দিন। জনতা নিহতদের গায়েবানা জানাজার নামায পড়ে ও শোকমিছিল বের করে। মিছিলের উপর পুলিশ ও মিলিটারি পুনরায় লাঠি, গুলি ও বেয়োনেট চালায়। এতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন শহীদ হন এবং অনেকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফরমুলার উদ্ভাবক অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলা আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি ৯৪৭-৪৮ ও ৪৮-৪৯ সালে পরপর দু’বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর জিএস (জেনারেল সেক্রেটারি) এর দায়িত্ব পালন করেছন।
তিনি প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে শরীক হয়েছিলেন। অধ্যাপক গোলাম আযম ডাকসুর জিএস হিসেবে ছাত্রদের সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ধর্মঘট পিকেটিংয়ের সময় তিনিসহ ১০-১২ ছাত্র গ্রেফতার হয়েছিলেন। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক গোলাম আযম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- “১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তাকে ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সংবলিত একটি ঐতিহাসিক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এ স্মারকলিপি প্রণয়নের দায়িত্ব ছিল তৎকালীন ছাত্রনেতা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি (পরবর্তীতে বিচারপতি) আব্দুর রহমান চৌধুরীর ওপর। স্মারকলিপিটি ডাকসুর কাউকে দিয়ে পেশ করার ব্যাপারে চারটি হলের ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ ঐকমত্যে পৌঁছেন। ডাকসুর ভিপি ছিলেন অরবিন্দু বোস। তিনি যেহেতু হিন্দু তাই তাকে দিয়ে পাঠ করালে সরকার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে চিত্রিত করতে পারে। এই দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হয় ডাকসুর জিএস অর্থাৎ আমার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথাটি ছিল শেষের দিকে। এর আগে প্রাদেশিকতায় আমরা বিশ্বাস করি না এমনভাবে আঞ্চলিকতার নিন্দার কথা বলা ছিল এ প্যারাটি পড়ার সময় ছাত্রছাত্রীরা তুমুল করতালি দেয়। করতালি শেষে আমার কানে এলো লিয়াকত আলীর স্ত্রী রানা লিয়াকত তার স্বামীকে বলছেন, ‘ল্যাঙ্গুয়েজকে বারে মে সাফ বাতা দেনা।” তার কথা শোনার পর আমি লেট মি রিপিট দিস বলে আবার ভাষার দাবি সংবলিত প্যারাটি পড়লাম। আবার মুহুর্মুহু করতালি শুরু হলো। আমি এবার করতালির জন্য একটু বেশি সময় দিলাম। আমি লিয়াকত আলী খান এবং রানা লিয়াকত আলী খানের খুব কাছে বসেছিলাম। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে নেননি তিনি। আমি মনে মনে স্থির করলাম বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে কোন মন্তব্য তিনি তার বক্তব্যে করলে আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করে স্লোগান দেব। কিন্তু তিনি খুব ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে উপস্থিতির মনোভাব উপলব্ধি করে বিষয়টি চেপে গেলেন। তার মনে ক্ষোভ থাকলেও এমনটি তার স্ত্রী অনুরোধ করার পরও ভাষার প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেন না। শুধু বক্তব্যেও একপর্যায়ে ক্ষোভের সাথে বলেন, ইফ ইট ইজ নট প্রোভিনসিয়ালিজম, দেন হোয়াট ইজ প্রোভেনসিয়ালিজম? তার এ কথাগুলো শুনে আমরা মনে করেছিলাম তিনি হয়তো ভাষার ব্যাপারে আরও কিছু বলবেন। কিন্তু না তিনি এ প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেন। আমার আর স্লোগান দেয়া হলো না।” ১৯৫২ সালে পল্টন ময়দানের এক জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সাথে করা সাত দফা চুক্তির তোয়াক্কা না করে ঘোষণা করলেন বাংলা নয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তিনি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কায়েদে আযমের বক্তব্যেরও পুনরাবৃত্তি করার পরই শুরু হয় প্রতিবাদ বিক্ষোভ। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি”। ( দৈনিক সংগ্রাম, মঙ্গলবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)
স্বীকৃতি পর্ব: গণপরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিল পাস করে। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন অব্যাহত ছিল। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনুমোদনের মাধ্যমে এই আন্দোলন তার লক্ষ্য অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে বিষয়টি নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়। এরপর ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সদস্য ফরিদপুরের আদেলউদ্দিন আহমদের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রত্যক ভাষাই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টি এক নিয়ামত। তিনি আমাদের দিয়েছেন বাংলা ভাষা। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষায় আমরা আমাদের মনে ভাব প্রকাশ করি। বৈচিত্রময় এই মহাবিশ্ব জগতের সাথে পরিচয়, নানান ভাষা,বর্ণ,ধর্ম ও জাতি-গোষ্ঠির মানুষের সাথে পরিচয়ের মাধ্যম এই মাতৃভাষা। এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিরহস্যের জটিল এক অনুসঙ্গ ভাষা। তিনি পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন,‘ করুনাময় আল্লাহ। শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন,সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাকে শিখিয়েছেন বর্ণনা (ভাষা)। (সূর: আর রহমান-১-৪ আয়াত)। পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘আকাশমালা ও জমিনের সৃষ্টি, তোমাদের পারস্পরিক ভাষা ও বর্ণবৈচিত্র্য তার নিদর্শন; অবশ্যই জ্ঞানবান মানুষের জন্য এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা রূম : ২২)। এই যে বহু ভাষা-ভাষির মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। তারা নানান ভাষায় কথা বলে, কিন্তু মাতৃভাষা কেউ নিজ ইচ্ছায় গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহতায়ালা যাকে যে ভাষার মায়ের কোলে পাঠিয়েছেন সেই ভাষার মাধ্যমেই তাকে এই পৃথিবীকে চিনতে হয়। সৃষ্টি রহস্যের গভীরে প্রবেশ করার জন্য আরবি,ফারসি কিংবা ইংরেজিসহ যত ভাষাই যে শিখবে তার ভিত্তি হবে মাতৃভাষা। আল্লাহর এই নিদর্শন ও নিয়ামতকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই আমাদেরকে অবশ্যই মাতৃভাষার বিশুদ্ধ চর্চা করতে হবে। এই মর্যাদা মর্যাদা রক্ষার মাধ্যমে আল্লাহর এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে। লেখক: কথাসাহিত্যিক, সিনিয়র সাংবাদিক। ই-মেইল: harunibnshahadat@gmail.com
তথ্য সূত্র:১ কোরানসূত্র-মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (সাবেক বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান) ,২.বাংলাদেশের কালচার- আবুল মনসুর আহমদ ২.বাংলাপিডিয়া,২ ইনকিলাব,ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, দৈনিক সংগ্রাম ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৩. সাপ্তাহিক সোনার বাংলা