নিজেকে শুদ্ধ করার মাস পবিত্র মাহে রমজান। যা অর্জনের পূর্বশর্ত হলো, নির্মল ও বিদ্বেষমুক্ত অন্তর। কারণ অন্তরে বিদ্বেষ নিয়ে তাকওয়া অর্জন করা যায় না। আল্লাহর রহমত পাওয়া যায় না।
তাই সাহাবায়ে কেরাম সর্বাবস্থায় বিদ্বেষমুুক্ত থাকার চেষ্টা করতেন, বিশেষ করে রমজান এলে তাঁরা নিজেদের ভাতৃত্বের বন্ধনকে আরো মজবুত করার চেষ্টা করতেন। আবদুর রাযযাক (রহ.) তাঁর ‘মুসান্নাফ এবং ইবনু’ আবদিল বার (রহ.) ‘আত-তামহিদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, ইবনে মাসউদ (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনারা কিভাবে রমজানকে বরণ করতেন?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কেউ তার অন্তরে মুসলিম ভাইয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ রেখে রমজানের চাঁদকে বরণ করার সাহস করত না।’
এ ছিল তাঁদের আত্মশুদ্ধির মানদ-। কারণ বিদ্বেষপূর্ণ হৃদয় নিয়ে ইবাদত করলে তা পূর্ণতা পায় না।
আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সাধারণ ক্ষমা করেন, তখনো বিদ্বেষ পোষণকারীরা সে রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। যেমন—লাইলাতুন নিসফ মিন শাবানের ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, যে সে রাতে মহান আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারীরা ছাড়া। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৯০)
বোঝা গেল, পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা পোষণ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনেও প্রভাব ফেলে।
তাই পবিত্র রমজানে আল্লাহর বিশেষ রহমত পেতে এ ধরনের অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। ভাতৃত্বের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করা উচিত। অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরকে হিংসা করবে না, একে অপরের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে না, সুপ্তদোষ সন্ধান করবে না, গুপ্ত ভুলভ্রান্তি অনুসন্ধান কোরো না এবং পরস্পরকে ধোঁকায় ফেলবে না। আর তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকো।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৩২)
তা ছাড়া পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ মুসলিম সমাজকে দুর্বল করে তোলে।
এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর ঝগড়া কোরো না, তাহলে তোমরা সাহস হারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধরো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’(সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪৬)
এ আয়াত স্পষ্ট করে যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষ উম্মাহর শক্তি ধ্বংস করে দেয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই মুমিনের দায়িত্ব হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা। অপর মুসলিমদের মধ্যে এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেওয়ার চেষ্টা করা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস- মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা পরস্পরকে ঘৃণা কোরো না, পরস্পর হিংসা কোরো না, একে অপরের গোয়েন্দাগিরি কোরো না, বরং আল্লাহর বান্দারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। যেকোনো মুসলিমের জন্য তার কোনো ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক বিচ্ছেদ করা জায়েজ নয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১০)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস প্রমাণ করে যে মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক সংশোধন করা এবং নিজেকে ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে মুক্ত রাখা ঈমানের দাবি। ক্ষেত্রবিশেষে সম্পর্কের সংশোধন ও অন্তরের পরিশুদ্ধতাকে নামাজ-রোজার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের রোজা, নামাজ, সদকার চেয়েও ফজিলতপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বলেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণ আত্মশুদ্ধি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমলের সংশোধনের পাশাপাশি সম্পর্কগুলোর সংশোধন করারও তাওফিক দান করুন। আমিন।