পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করছে সরকার। কর্মসূচির প্রথম ধাপে দেশের বিভিন্ন এলাকার মোট ৩৭ হাজার ৫৬৪টি নারী প্রধান পরিবার এই কার্ড পাবে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।
তিনি জানান, আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবারে নারীকে প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা সহজে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি জানান, প্রতিটি কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য সুবিধা পাবেন। তবে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচের বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
পাইলটিং পর্যায়ে নির্বাচিত উপকারভোগীরা মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ভবিষ্যতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পেলে সেক্ষেত্রে সেই সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাদের প্রাপ্য ভাতা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারবেন।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৪টি পরিবারকে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের ভাতা জি-টু-পি (গভর্নমেন্ট টু পারসন) পদ্ধতিতে সরাসরি উপকারভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এতে কোনো ধরনের বিলম্ব বা মধ্যস্থতা ছাড়াই উপকারভোগীরা ঘরে বসেই সরকারি সহায়তা পাবেন।
সম্ভাব্য সংকট বিবেচনায় রেখে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য সংকট বিবেচনায় রেখে সরকার দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নির্ধারণ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গতকাল সোমবার (৯ মার্চ) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী এ কথা জানান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ ও সরকারি কর্মসূচিগুলোও সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই পরিচালিত হবে।
আমির খসরু জানান, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সরকার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
‘বিশ্বে যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা আমরা বিবেচনায় নিচ্ছি। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সরকারের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় ও কর্মসূচি সমন্বয়
করা হবে। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এজন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
‘জ্বালানি নিরাপত্তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেখানেই সুযোগ আছে, সেখানেই আমরা সহযোগিতা চাইছি, কথা বলছি, কাজ করে যাচ্ছি,’ উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
বেকারদের চাকরি না দিয়ে ভাতা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষকে আরও বেকার বানানো হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে আমির খসরু বলেন, দেশে বেকারত্ব সমস্যা মোকাবিলা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকার এরই মধ্যে বড় পরিসরে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। যেই পরিবারে বেকার আছে, সেই পরিবারের কাছেও টাকা যাচ্ছে। সেই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়লে, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। আর বেকার সমস্যার জন্য তো সরকারের বিশাল কর্মসূচি আছেই।
তিনি জানান, সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু হলে বর্তমানে চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বন্ধ হয়ে যাবে কি না- সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের উত্তরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, যে পরিবারে নারীপ্রধান যদি কোনো ভাতা পেয়ে থাকেন, তবে ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে শুধু সেই নির্দিষ্ট ভাতাটি বন্ধ হবে। তবে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য সহায়তা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা ভাতা বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়। কেউ নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হতে পারেন, আবার কেউ মধ্যবিত্ত থেকে নি¤œবিত্ত হয়ে যেতে পারেন। তাই এই ব্যবস্থাকে নিয়মিত তদারক ও হালনাগাদ করতে হবে।
মন্ত্রী জানান, নি¤œবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সবাই ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। তবে উচ্চবিত্তরা আর্থিক সহায়তা পাবেন না। প্রতি মাসের কত তারিখের মধ্যে আর্থিক সহায়তার অর্থ দেওয়া হবে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজ ১০ মার্চ উদ্বোধনের পরপরই টাকা চলে যাবে। এরপর প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট তারিখে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যুগান্তকারী পদক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের নবঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অপচয় কমিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষ্যে গতকাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপি সরকার আজ পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে দেশের সব পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, সরকার যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরাধিকার পেয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগগুলোকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা যে পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চাপের উত্তরাধিকার পেয়েছি, তা বিবেচনায় নিলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।’
তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে। আগে যেসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, সেগুলোর কিছু এখন অর্জনের পথে রয়েছে। তার মতে, নতুন এই কর্মসূচি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার সরকারি প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করবে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির দিকে সরকার সতর্ক নজর রাখছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বাড়ার যে চিত্র উঠে এসেছে, সরকার সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনের ত্রুটি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা তারা তালিকার বাইরে থেকে যায়, আবার যাদের পাওয়ার কথা নয় তারাও তালিকায় থেকে যায়। কখনো কখনো রাজনৈতিক বিবেচনায়ও এসব তালিকা নির্ধারিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার এমন একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা এসব সমস্যার ঊর্ধ্বে থাকবে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এটি হবে সর্বজনীন কর্মসূচি এবং ধাপে ধাপে দেশের চার কোটি পরিবারের সবাইকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে অপচয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানেই তা দেখা যায়। ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলে এই অপচয় কমবে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভুক্ত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। ধাপে ধাপে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের ভুলত্রুটি ও অপচয় কমাতে সরকার ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলে অপচয় কমবে এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
উপদেষ্টা বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে ত্রুটিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে, সেগুলো দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো- অপচয় কমানো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাওয়া। সরকার সেই পথেই এগোচ্ছে।