শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ১১:২০ পূর্বাহ্ন




মওদুদ আহমদ একজনই

এম আবদুল্লাহ:
  • আপডেট সময় বুধবার, ২৪ মার্চ, ২০২১




তিনি চলে যাচ্ছেন, সপ্তাহখানেক আগেই আঁচ করা গিয়েছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আড্ডা জমেছিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে ঘিরে। মির্জা ফখরুল হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন, মওদুদ ভাইয়ের অবস্থা ভালো না, লাইফ সাপোর্টও নিতে পারছেন না। পরিবেশটা ভারী হয়ে গেল।
সাত-আটজন সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন আড্ডায়। সবাই যে যার মতো করে মওদুদ আহমদ সম্পর্কে নিজেদের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করলেন। একটি বিষয়ে সবাই একমত, তার মৃত্যু দেশের রাজনীতিতে বড় শূন্যতা সৃষ্টি করবে। মির্জা ফখরুল যোগ করলেন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় এই সময়ে মওদুদ আহমদ আনপ্যারালাল। তার লেখা বইগুলো আমাদের অমূল্য সম্পদ এবং সেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে এ তথ্যও উল্লেখ করলেন। ক্লাব থেকে ফিরে সেদিন মওদুদ আহমদের ব্যক্তিগত সহকারী সুজনের কাছ থেকে বিস্তারিত খোঁজ নিই। খবর হতাশাজনক।
ব্যারিস্টার মওদুদের সাথে আমার নিজের সাংবাদিকতা জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। কী ক্ষমতায়, কী বিরোধী দলে, সমানভাবেই তার সান্নিধ্য ও স্নেহ পেয়েছি। মাস তিনেক আগে একবার ফোনে কথা বলেছিলাম। একটি ভার্চুয়াল আলোচনায় আমন্ত্রণ জানাতে। কুশল বিনিময়ের পর বিনয়ের সাথে অপারগতা জানালেন। বললেন, আমি তো ডিজিটাল হতে পারিনি। ভার্চুয়ালে এক্সপার্ট নই। তা ছাড়া শরীরটাও ভালো নয়। কয়েক দিন পর হাসপাতালে ভর্তি হন। দেখতে যেতে চেয়ে জানতে পারলাম, সাক্ষাতের সুযোগ নেই।
অভিভাবকতুল্য এই প্রবীণ রাজনীতিকের সাথে সরাসরি সর্বশেষ দেখা হয়েছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে। ফেনীর সাবেক এমপি মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের স্মৃতিসভায় তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। মঞ্চে বসে অনেক কথা হয়। প্রায় একই সময়ে বিএফইউজে ও ডিইউজের ইফতারে যোগ দিতে প্রেস ক্লাবে এসেছিলেন। সাংবাদিকদের প্রতিটি আয়োজনে তার উদার সহযোগিতা থাকত। সাংবাদিকবান্ধব মওদুদ আহমদ সর্বস্তরের সংবাদকর্মীদের সমানভাবে কদর করতেন। নবিশ রিপোর্টারও তার কাছ থেকে কোনো কমেন্টস বা তথ্য চাইলে হাসিমুখে সাড়া দিতেন। প্রত্যেক দেখা-সাক্ষাতে এমনভাবে খোঁজখবর নিতেন, যেন সমবয়সী বন্ধু।
মওদুদ আহমদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বস্তুত বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ থেকে আরেকটি নক্ষত্র ঝরে পড়ল। জাতীয় রাজনীতিতে যখন সভ্যতা-ভব্যতা, মেধা, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, সৌজন্য ও পরমত সহিষ্ণুতার প্রচ- খরা তখন এসব বিরল গুণের সমন্বয়ে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান, আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং অন্তত ছয় দশকের রাজনীতির উত্থান-পতনের জীবন্ত সাক্ষী। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মওদুদ আহমদ গণতান্ত্রিক সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য সংগ্রাম করেছেন বিরামহীন। তার প্রস্থান বিশেষ কোনো দলের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ও শূন্যতার সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি টানা কয়েক যুগের আলোচিত রাজনীতিক ও সত্যনিষ্ঠ লেখক হিসেবে সুখ্যাত। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবৈতনিক একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিব ও অন্যদের মুক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা, একাত্তরে ইয়াহিয়া খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিতি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের পোস্টমাস্টার জেনারেল মওদুদ আহমদের রয়েছে দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। ‘মওদুদ আহমদ’ নামটি বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস রচনা সম্ভব হবে না।
ব্যারিস্টার মওদুদের সমালোচকরা তার বিরুদ্ধে বড়দাগে যে অভিযোগ করেন তা হলো- ‘তিনি দেশের বড় সব দলই করেছেন, বারবার দলবদল করেছেন। এর সাথে, অনেকে তাকে নীতিহীন রাজনীতিকের তকমা দেন। কিন্তু প্রতিটি দল পরিবর্তন বা সরকারে যোগ দেয়ার পেছনে তার রয়েছে অকাট্য যুক্তি ও ব্যাখ্যা। এ প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করল ১০ অক্টোবর। তিনি শপথ নিলেন মন্ত্রী হিসেবে। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর সম্ভবত ১২ অক্টোবর সচিবালয়ে অফিসে আসেন। আমি তখন ইনকিলাবের সিনিয়র রিপোর্টার। দুপুরের পরে তার সামনে হাজির হলাম। ছোটোখাট একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে নিলাম। যে প্রশ্নটি তাকে সবচেয়ে বিব্রত করার মতো, সেটি করলাম সব শেষে। জানতে চাইলাম- আপনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আর এখন দায়িত্ব নিলেন একটি মন্ত্রণালয়ের। এটা আপনার জন্য কতটা শোভন হলো? প্রমোশন না ডিমোশন? নিশ্চিত ছিলাম, তিনি চটে যাবেন না। কারণ সহনশীল মানসিকতা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রশ্ন শেষ না হতেই তিনি স্বভাবসুলভ হেসে বললেন, ‘দেশের জন্য, এলাকার জনগণের জন্য অনেক কাজ করার সুযোগ হবে। অতীত পজিশনের কথা ভেবে ঘরে বসে থাকলে মানুষের জন্য কাজ করতে পারব?’ আরো অনেক কথা বললেন। সারমর্ম হচ্ছে, মানুষের জন্য, জনগণের জন্য কাজ করতে হলে এতসব ভেবে করা যায় না। যখন যেখানে সুযোগ আসে, তা কাজে লাগাতে হয়। প্রসঙ্গত, শহীদ জিয়াউর রহমানের সরকারে যোগ দেয়া, এরশাদের সঙ্গী হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বললেন, ‘দু’টি ক্ষেত্রেই আমি চেয়েছি সামরিক শাসন থেকে দেশকে গণতন্ত্রে ফেরাতে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখতে।
ছাত্রজীবন থেকেই মওদুদ আহমদ ছিলেন সংগ্রামী। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র। ওই স্কুল থেকে হরতাল, ধর্মঘটসহ কোনো আন্দোলনে অংশ নেয়া ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু মওদুদের সংগ্রামী চরিত্র সেই নিষেধাজ্ঞা মানেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা স্কুলের পাশ দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বেরিয়ে আসো, বেরিয়ে আসো’ বলে স্লোগান দিলে ব্রাদার লিগুরির ক্লাস থেকে জানালা টপকিয়ে মিছিলে অংশ নেন কিশোর মওদুদ। এ কারণে মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বে¡ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে বছর শেষে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল তাকে। এরপর ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়া এবং ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসে কালোপতাকা উত্তোলনের ‘অপরাধে’ প্রথমবারের মতো জেলে যেতে হয়েছিল তাকে।
মওদুদ আহমদ প্রথম যুক্ত হন ‘ছাত্র শক্তি’ সংগঠনে। এ সংগঠনটি ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী তমদ্দুন মজলিসের সহযোগী সংগঠন ছিল। সংগঠনটির জন্মলগ্নে জড়িত ছিলেন ফরমানুল্লাহ খান, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ। অভিভাবকত্বে ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক আবুল কাসেম, অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গফুর, অধ্যক্ষ শাহেদ আলী প্রমুখ। তখন ন্যাপপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন ও আওয়ামী লীগপন্থী ছাত্রলীগ সংগঠিত ছাত্র সংগঠনরূপে থাকলেও ছাত্রশক্তি বৃহত্তম ছাত্র সংগঠনের মর্যাদা পায়।
১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হয়ে ১৯৬০ সালে একই বিষয়ে এমএ সম্পন্ন করেন মওদুদ। তারপর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ১৯৬১ সালে চলে যান বিলেতে। ওই সময়ে মেধাবী ও ভালো ফলাফলকারীরা সিএসপি হওয়ার জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালালেও মওদুদ আহমদকে সেটি টানেনি। মেধার জোরে লন্ডনের লোচিনভার স্কুলে একটি চাকরি জুটে যায়। তাকে চাকরি দেয়ার আগে স্কুলের গার্ডিয়ানদের কাছে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল ‘একজন এশিয়ান কৃষ্ণাঙ্গ ভদ্রলোককে’ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে তাদের কোনো আপত্তি আছে কি না। কারণ লন্ডনে সে সময় পুরো পাবলিক স্কুল সেক্টরে মওদুদই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে চাকরি পান। ওই স্কুলে পাঁচ বছর পড়ানোর পাশাপাশি তিনি ব্যারিস্টারি পাস করেন।
বিলেতের প্রবাস জীবনে তিনি ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ আন্দোলন সংগঠিত করেন। অনেকেই জানেন লন্ডনেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়। তদানীন্তন পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কথা প্রথম বলা হয় লন্ডনের কিংসক্রসে সেন্ট প্যাঙ্কারস হলের প্রথম সভায়। তারপর সেখানে একটি বাড়ি কিনে অফিস চালু করে নাম দেন ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ এবং দু’টি পত্রিকা বের করে ক্রমাগতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিলেত থেকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকায় ছিলেন মওদুদ। ‘এশিয়ান টাইড’ আর ‘পূর্ব বাংলা’ নামে পত্রিকা দু’টি বের করতেন। ইস্ট পাকিস্তান হাউজের সেক্রেটারি এবং পত্রিকা দু’টির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই সময়ে পাকিস্তানের দোর্দ- প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান লন্ডনে বাকিংহাম প্রাসাদের কাছে মারলবারো হাউজে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের নৈশভোজে গেলে ফেরার সময় তার গাড়ি লক্ষ্য করে ডিম ও টমেটো ছুড়ে মেরে আলোচিত হন মওদুদ আহমদরা। পড়াশোনা শেষ করেও মূলত এই দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত দেড় বছর বিলেতে থাকতে হয় তাকে।
১৯৬৭ সালের অক্টোবরে দেশে ফিরে আসেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। শুরু করেন আইনি লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামে সহায়তা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যে চার তরুণ আইনজীবী শেখ মুজিবের পক্ষে লড়াইয়ে নামেন তার অন্যতম মওদুদ আহমদ। তারা কেউই আওয়ামী লীগের সদস্য বা নেতা ছিলেন না। মওদুদসহ চার আইনজীবী বেগম মুজিবের সাথে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে দেখা করেন এবং ইত্তেফাকের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সহায়তায় ওকালতনামায় সই নিয়ে বিলেত থেকে আইনজীবী টমাস উইলিয়ামসকে নিয়ে এসে মামলায় লড়েন। হাইকোর্ট থেকে ঐতিহাসিক রুলের পর গোলটেবিল আলোচনায় যাবেন এ শর্তে শেখ মুজিব ও অন্যান্যের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি মেলে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন সেই বঙ্গবন্ধুই তার স্বাধীনতা পরবর্তী শাসনামলে মওদুদ আহমদকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে দুঃখ করে মওদুদ আহমদ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য বিদেশ থেকে আইনজ্ঞ স্যার টমাস উইলিয়ামসকে আনার ব্যবস্থা আমিই করেছিলাম। শেখ সাহেবের সাথে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। আওয়ামী লীগের সাথেও আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তার ডিফেন্সের ব্যবস্থার সূচনা আমিই করেছিলাম। ১১ মাস তার মামলায় নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে নানা কিছু আয়োজন করেছি। তার অবৈতনিক একান্ত সচিবের কাজ করেছি।
গোলটেবিল বৈঠকে তার সাথে গিয়েছি সাহায্য করার জন্য। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে যোগ দিয়েছি এবং যুদ্ধকালীন সরকারের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি। বাংলাদেশের প্রথম পোস্টমাস্টার জেনারেল হিসেবে কাজ করেছি। বৈদেশিক প্রচারের সব আয়োজন করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার থেকে মুজিবের জয়গান গেয়েছি। …যাই হোক, শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবের নির্দেশেই আমাকে গ্রেফতার হতে হলো। স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসপি জব্বার সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন প্রথমে আমার চেম্বারে। সমস্ত ফাইলপত্র ঘাঁটলেন। যত রাজনৈতিক কর্মীর মামলা করেছি তাদের হদিস নিলেন। লিস্ট তৈরি করলেন। কোনো ব্যারিস্টারের চেম্বারে এভাবে পরীক্ষা করার নজির আমার জানা নেই।’ (মওদুদ আহমদ রচিত ‘চলমান ইতিহাস, জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’, পৃষ্ঠা-১১)
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারে যোগ দিয়ে প্রথমে উপদেষ্টা ও পরে উপপ্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ব্যারিস্টার মওদুদ তার লেখায় বলেন, সামরিক আইন তুলে নিয়ে সরাসরি রাজনীতি শুরু এবং সাংবিধানিক সরকার করার শর্তে তিনি জিয়াউর রহমানের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। বিএনপি গঠন প্রক্রিয়ায় অন্যদের সাথে দিন-রাত কাজ করেছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার গঠনের পর ১৯৭৯ সালের এপ্রিলের দিকে মওদুদ আহমদকে উপপ্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। পার্লামেন্টারি পার্টির উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর ১৪ নভেম্বর গ্রেফতার হন ব্যারিস্টার মওদুদ। গভীর রাতে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে বন্দী রাখার একদিন পর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। ধরে নেয়ার পর গোপন সেলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করা এবং বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা সাক্ষাতের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও জেলে পাঠানোর পর একপর্যায়ে মওদুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করা হয়।
দীর্ঘদিন পর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে একপর্যায়ে ১৯৮৫ সালের ৫ আগস্ট এরশাদের সাথে যোগ দেন। এর যুক্তি হিসেবে মওদুদ আহমদ তার লেখায় জানিয়েছেন, গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়া, সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা, জনগণের অধিকার জনগণকে ফিরিয়ে দিতে নির্বাচন করার জন্য সহযোগিতা করতে এরশাদের পীড়াপীড়িতে তিনি সায় দেন এবং এলাকার জনগণের উন্নয়ন প্রত্যাশা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির কিছু সমস্যা হলেও আমি আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হইনি। মানুষের কল্যাণের জন্যই তো রাজনীতি করা।’ বাংলাদেশে ব্যক্তিখাত ও শিল্পের বিকাশে মওদুদ আহমদের অবদান ব্যাপক। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নে দলমত নির্বিশেষে সব উদ্যোক্তাকে উদারভাবে সহায়তা করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে বহু সফল শিল্প উদ্যোক্তার জন্ম হয়েছে। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com