যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ২০২১ সালের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। যা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে ৭৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, গুম, রাজনৈতিক হয়রানি, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ, মানুষের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অমানবিক আচরণসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমস্যার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ব্যক্তির অপরাধের জেরে পুরো পরিবারকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অনেক সাংবাদিককে অযৌক্তিকভাবে গ্রেপ্তার ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের ওপর গুরুতর বিধিনিষেধ, ইন্টারনেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সংঘ-সমিতির স্বাধীনতার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধিকাংশ ক্ষমতাকে একীভূত করে। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৃতীয়বারের মতো পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকেন। তবে পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এ নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু হয়নি। তাদের ভাষ্য, ব্যালট বাক্স ভর্তি এবং বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয় দেখানোসহ নানা অনিয়মের কারণে এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচিত হয়নি। রোহিঙ্গা বিষয়ে বলা হয়, শরণার্থীদের চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, উদ্বাস্তুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুতর ও অযৌক্তিক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি দুর্নীতি, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার জন্য তদন্তের অভাব এবং জবাবদিহির অভাব ছিল লক্ষণীয়। যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ এবং সামাজিক চাপ অব্যাহত ছিল। সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা আদিবাসীদের লক্ষ্য করে সহিংসতার হুমকি ছিল উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী বেসামরিক র্কর্তৃপক্ষের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ বেআইনি বা নির্বিচারে হত্যা, গুম, সরকারি লোকজনের নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক বন্দি, ব্যক্তির অপরাধের জন্য পরিবারের সদস্যদের শাস্তির মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ দিয়েছে সরকার। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনীর অপব্যবহার এবং দুর্নীতির জন্য ব্যাপক দায়মুক্তির খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্নীতি, অপব্যবহার ও হত্যার মামলা তদন্ত এবং বিচারের জন্য সরকার কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের চেষ্টা করেছে। তবে সরকারের সমালোচনাকারী গণমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে গণমাধ্যমগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়ে। এতে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়মী লীগ ২৮৮টি আসনে জয় পায়। তবে এ নির্বাচনে বিরোধী দল বিএনপি ও তার জোট মাত্র ৭টি আসনে জয় পায়। তবে সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা পায় ক্ষমতাসীন জোটের শরিক জাতীয় পার্টি। প্রচারের সময় হয়রানি, ভয়ভীতি, নির্বিচারে গ্রেপ্তারসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বিরোধী দলগুলোর জন্য এ নির্বাচন কঠিন হয়ে ওঠে।