লঘুচাপের প্রভাবে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত আড়াই ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে মোংলার নি¤œা লসহ পুরো সুন্দরবন এলাকা। অস্বাভাবিক জোয়ারে তলিয়ে গেছে পশুর নদীর পাড়ের বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি। মোংলা বন্দর ও সুন্দরবনের পশুর নদীর পাড়ের এলাকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আশপাশের অন্যের বাড়িঘর ও রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার চিলা, চাঁদপাই ও বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নের পশুর নদীর পাড়ের বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছেন। চারদিক পানিতে প্লাবিত হওয়ায় অনেকেই তাদের গবাদিপশু নিয়ে এক ঘরেই বসবাস করছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানকার বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কানাইনগরের বাসিন্দা নার্গিস বেগম বলেন, ‘আমরা পশুর নদীর পাড়ে বসবাস করি। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় নদীর পানি বেড়ে চারপাশ তলিয়ে গেছে। তাই গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি নিয়ে এক ঘরেই থাকছি।’ একই এলাকার মনোনিত্য আদিত্য বলেন, ‘জলোচ্ছ্বাসে আমার থাকার ঘরটি তলিয়ে গেছে। দুদিন ধরে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাস্তা ও অন্যের ঘরের বারান্দায় থাকছি। এছাড়া যাওয়া ও থাকার তো কোনো জায়গা নেই।’
এদিকে আড়াই ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে পুরো সুন্দরবন এলাকা। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির বলেন, চলমান বৈরী আবহাওয়ায় প্রচুর পরিমাণ পানি বাড়ছে। আড়াই ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের সব জায়গা তলিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবন প্লাবিত হলেও এখন পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবারও মোংলাসহ সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। মোংলা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ অমরেশ চন্দ্র ঢালী বলেন, লঘুচাপটি দুর্বল হয়ে ভারতের মধ্যপ্রদেশে অবস্থান করছে। এর প্রভাব ও বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া পূর্ণিমার গোনের (সময়) কারণে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে অতিরিক্ত ২-৪ ফুট উচ্চতা কিংবা তার চেয়ে বেশি জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হবে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মোংলায় ১৬ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শুক্রবার (১২ আগস্ট) বিকেল ৩-৬টার পর থেকে এ বৈরী আবহাওয়া কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার (১৩ আগস্ট) থেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলেও জানান আবহাওয়া অফিসের এ কর্মকর্তা।
বিপৎসীমার ওপরে বরগুনার নদীর পানি: বরগুনার নদীগুলোতে জোয়ারের পানির চাপ আরও বেড়েছে। বর্তমানে পায়রা বিষখালী ও খাকদোন নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির চাপে নদীপাড়ের নিচু এলাকার ৮ থেকে ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক মাহতাব হোসেন জানান, বরগুনার নদীগুলোতে পানির পরিমাণ আরও বেড়েছে। নদীর পানি নিচু এলাকাগুলোতে ঢুকতে থাকায় সদর উপজেলার ধুপুতি, কুমড়াখালী, বড়ইতলাসহ ৮-১০ গ্রামের ঘরবাড়ি তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ এলাকার রাস্তাঘাট এখন পানির নিচে। রান্নাঘরের চুলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার সংকটে কয়েক হাজার মানুষ। ধুপুতি এলাকার শামসুননাহার জানান, গতরাতে রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। সকালে উঠে তাই পরিবারের জন্য রান্না করতে পারেননি। বর্তমানে ঘরে বসে আছেন তারা। তিনি বলেন, ‘ঘরে যে শুকনা খাবার আছে তা দিয়েই হয়তো আজ চলে যাবে সবার। তবে পানি না কমলে ভোগান্তি আরও বাড়বে।’ একই এলাকার জয়নাল জানান, দুদিন ধরে নদীতে পানির চাপ বেড়েছে। তাদের ঘরবাড়ি প্লাবিত। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের কোনো খোঁজ নেননি। এমনক স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও কাছে পাননি তারা। এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম বলেন, পানিতে প্লাবিত মানুষদের সহায়তা করা হবে। স্থানীয় চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।