রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম ::
খুলনাঞ্চলে নদী খননে বদলে যাবে কৃষি অর্থনীতি সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত, শতাধিক যাত্রী আহত আত্রাই এলাকার উন্নয়নে আমার চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না-এমপি রেজু শেখ রাজশাহীতে সমাহিত করা হবে অভিনেতা শামস সুমন ধামইরহাটে দল ও জনগণের সমর্থন পেলে পৌরবাসীর সেবা করতে চান আনোয়ারুল ইসলাম কয়রায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ করলেন এমপি আবুল কালাম আজাদ তারাকান্দায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেক অসহায় ও দুঃস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ এনাম ডেন্টাল অ্যান্ড আই কেয়ারের উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পৌঁছাল নিহত বিএনপি নেতা অলিউল্লাহ মোল্যার বাড়িতে নড়াইলের লোহাগড়ায় জিয়া পরিষদের আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল

৯২ বছর পর মারা গেলো বাংলাদেশের একমাত্র বিরল উদ্ভিদ আফ্রিকান টিকওক, দেশে এ প্রজাতির কোন বৃক্ষ আর জীবিত নেই

এহসান বিন মুজাহির (শ্রীমঙ্গল) মৌভীবাজার
  • আপডেট সময় বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

বাংলাদেশের একমাত্র বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ আফ্রিকান টিকওক সম্প্রতি মারা গেছে। এ বিরল বৃক্ষটি দেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৯২ বছর ধরে কয়েকশ ফুট উপরে ডালপালা মেলে দাড়িয়ে ছিল কালের সাক্ষী হয়ে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল ফটক থেকে অভ্যন্তরে প্রবেশ পথের দু’পাশে সারি সারি বিশাল আকৃতির নানা প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে বন বিট কার্যালয়ের কাছাকাছি রাস্তার পশ্চিম পাশে মাথা উচু করে এতোদিন দাঁড়িয়ে থাকা সেই ‘অফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটি সম্প্রতি মারা যাওয়ায় এখন দেশে এ প্রজাতির কোন বৃক্ষ আর জীবিত নেই। সর্বশেষ বৃক্ষটি মারা যাবার সাথে-সাথেই দেশ থেকে প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে গেল। জানা যায়, লাউয়াছড়া উদ্যানের ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে ‘আফ্রিকান টিকওক’ প্রজাতির বৃক্ষ হলো একটি। পুরো দেশে লাউয়াছড়া বনের দুটি বৃক্ষই এ প্রজাতিটি টিকিয়ে রেখেছিল। ২০০৬ সালে এর একটি বৃক্ষ ঝড়ে উপড়ে পড়ে যাবার পর টিকে ছিল মাত্র একটি। অতি সম্প্রতি টিকে থাকা ওই একমাত্র ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষের সব পাতা ঝরে পড়ে যায় এবং বৃক্ষটির গুড়ায় পচন ধরে। এতে ধারণা করা হচ্ছে প্রাচীন এ বৃক্ষটি মারা গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন লাউয়াছড়া বন বিট কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বৃষ্টি মৌসুমে আকস্মিক বিরল প্রজাতির ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটির পাতা ঝরে পরে যায় এবং গাছটির গুড়ায় পচন সৃষ্টি হয়। যা দেখে সহজেই ধারণা করা যায় বৃক্ষটি মারা গেছে। সরেজমিনে বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১০০ ফিট উচ্চতা ও ১২ ফিট গোলাকার বিরল প্রজাতির ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটির সম্পূর্ণ পাতা পরে গেছে এবং এটির গুড়িতে পচন দেখা দিয়েছে। মরা বৃক্ষ হিসেবে বিরল প্রজাতির এ বৃক্ষটি বর্তমানে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দাঁড়িয়ে আছে। বন বিভাগের সিলভিকালচার টিচার্স বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বহু চেষ্টা করেও বৃক্ষটি থেকে কোন বংশবিস্তার করা সম্ভব হয়নি। কারন হিসেবে তারা জানান, ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটির কোন বিচি ছিল না। ফুল ধরলেও ঝরে পড়ে যেতো। কয়েক বছর পূর্বে ওই বৃক্ষটি থেকে কাটিং সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে কোন লাভ হয়নি। এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মোট দুটি আফ্রিকান টিকওক বৃক্ষ ছিলো। এর একটি ২০০৬ সালের ৭ জুলাই প্রচন্ড ঝড়ে উপড়ে পড়ে যায়। ‘আফ্রিকার টিকওক’ বৃক্ষটির গুড়ির অংশ এখনও জাতীয় উদ্যানে স্মৃতি হয়ে পড়ে রয়েছে। একমাত্র যে গাছটি উদ্যানে ছিলো সেটিও প্রায় মৃত। বৃক্ষটির পাতা ঝরে পড়া এবং গুড়ায় পচন দেখে তিনি বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনিস্টিউট (বিএফআরআই) কে অবগত করেছেন।’ ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটির বয়স সম্পর্কে কোন তথ্য-উপাত্ত নেই বন বিভাগের কাছে। বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আজ থেকে ৯২ বছর পূর্বে ১৯৩০ সালে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে আসেন। সে সময়ে তাঁর উপস্থিতিতে প্রাকৃতিক এ সংরক্ষিত বনের অধিকাংশ গাছ কেটে কৃত্রিমভাবে চাপালিশ, সেগুন, গর্জন, লোহাকাট, রক্তনসহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের চারা রোপন করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে এসব বৃক্ষের মধ্যে ছিল ওই ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষ দু’টির চারাও। সে হিসেবে বিরল প্রজাতির বৃক্ষটির বয়স ছিল ৯২ বছর। বাংলাদেশের একমাত্র আফ্রিকান টিকওক বৃক্ষটি স্থানীয়দের কাছে ‘অজ্ঞান গাছ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এক সময় লোকমুখে শুনা যেতো এই বৃক্ষের পাশ দিয়ে কোন পথচারি হেঁটে গেলে বা বৃক্ষের নিচে দাঁড়ালে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। যদিও এর কোন সত্যতা কোন সূত্রই নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে এক বৃক্ষ গবেষণায় দেখা গেছে এই বৃক্ষে কার্বলিক অ্যাসিড ও ক্লোরোফর্মের উপস্থিতি রয়েছে। এ কারণে বৃক্ষটির পাশে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে অনেকেরই একটু ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হতে পারে। আবার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নাক ও গলা জ্বলা এবং হাপানির সম্ভাবনাও বিদ্যমান। তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আফ্রিকান টিকওক প্রজাতির ক্লোফোরা এক্সেলসা (সাধারণত আফ্রিকান টাক, মভিলে বা ইরোকো নামে পরিচিত) ক্রান্তীয় আফ্রিকার একটি বৃক্ষ। এটির উচ্চতা হয় ১৬০ ফিট পর্যন্ত। এ জাতীয় বৃক্ষ আফ্রিকা মহাদেশের অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, গিনি, ইথিওপিয়া, গ্যাবন, ঘানা, আইভরি কোস্ট, কেনিয়া, মালাউই, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, রুয়ান্ডাসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে। এর প্রাকৃৃতিক বাসস্থান রেইন ফরেস্ট চিরহরিৎ বনে। বর্তমানে এই প্রজাতিটি আদি জন্মভূমি আফ্রিকাতেই রয়েছে চরম ঝুঁকির মুখে। আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে স্থানীয়ভাবে ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষকে আফ্রিকান ওক, আবেং, আলা, বঙ্গ, বাঙ্গি, বাঙ্গু, ডেইডি, ইরোকো, কাম্বালা, মকুুকো, মুরিতুলুল্ডা, মুউলে, মউউল, নোংন্ড, ওডুম, টুলে, উলোকো, লোকো, এমএসুল, মালালা, অজিজ, রোক, সিঙ্গা নামে ডাকা হয়। আফ্রিকা মহাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটিকে পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। এ বৃক্ষটির নিচে আফ্রিকায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। সেখানে অনেকে এ বৃক্ষের নিচে উপহার সামগ্রী রেখে আসেন। বৃক্ষটির কাঠ অনেক সময় মৃত ব্যক্তির কফিনে এবং বাদ্যযন্ত্র ড্রামস-এ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এ বৃক্ষটির কাঠ দিয়ে ঘরের আসবাবপত্র, ঘরের মেঝে এবং নৌকা তৈরিতেও কাজে লাগানো হয়। অন্যদিকে আফ্রিকায় এ বৃক্ষটির পাতা ও ছাল কাশি, হার্টের সমস্যা এবং দুর্বলতার ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বৃক্ষটির কষ বা লেটেক্স এক ধরণের অ্যান্টি-টিউমার অ্যাজেন্ট হিসেবে কাজ করে।




শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর









© All rights reserved © 2020 khoborpatrabd.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com