মহানবী সা:-কে ভালোবাসার সাথে ঈমানের সম্পর্ক। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হবে না। যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার জীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সব মানুষের চেয়ে প্রিয় না হবো।’ (বুখারি- ১৫) অপর হাদিসে রয়েছে- রাসূল সা: বলেছেন, ‘ওই আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না; যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক প্রিয় হবো।’ (বুখারি-১৪) সাহাবায়ে কিরাম প্রিয় নবী সা:-কে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। প্রত্যেক মুমিনও নবী সা:কে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবেসে ঈমানের দাবি পূর্ণ করে।
সাহাবায়ে কিরাম প্রত্যেকেই প্রিয় নবীকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। বিশেষ করে হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা: তিনি মহানবী সা:-কে খুবই ভালোবাসতেন। হিজরতের সময় তিনি মহানবী সা:-এর সাথী হন। তারা যখন গারে সাওরের কাছে যান হজরত আবু বকর রা: রাসূলুল্লাহ সা:-কে প্রথমে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। কারণ, তা অপরিচ্ছন্ন, সাপ-বিচ্ছু থাকার সম্ভাবনা ছিল। তাই নিজে প্রথমে প্রবেশ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। এরপর অবস্থান করার উপযোগী হলে রাসূলুল্লাহ সা:-কে গুহায় প্রবেশ করতে বলেন। হজরত আবু বকর রা: গুহার ভেতরের গর্তগুলো কাপড় দিয়ে বন্ধ করে দেন। দু’টি গর্ত বন্ধ করার কাপড় না থাকায় পা দিয়ে বন্ধ করেন। রাসূলুল্লাহ সা: গুহায় প্রবেশ করে হজরত আবু বকর রা:-এর উরুতে মাথা মোবারক রেখে নিদ্রা যান। এরপর একটি সাপ হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা:-এর পায়ে ছোবল দিলে তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সা:-এর দেহ মোবারকে পড়লে তিনি সজাগ হন এবং তাকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করেন। হজরত আবু বকর সাপের ছোবলের কথা বলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সা: ক্ষতস্থানে মুখের লালা লাগিয়ে দেন। তারপর ব্যথা দূর হয়ে যায়। (বুখারি, মিশকাত-৬০৩৪)
হজরত ওমর ফারুক রা: খলিফা থাকাকালে এক যুদ্ধের গণিমতের মাল বণ্টন করার সময় হজরত উসামা রা:-কে দিয়েছেন তিন হাজার ৫০০ দিনার আর হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা:-কে দিয়েছেন তিন হাজার দিনার। তখন পুত্র আবদুল্লাহ পিতাকে বলেন, উসামাকে কেন আমার চেয়ে বেশি দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! যুদ্ধে তো আমিই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। হজরত উমর রা: বলেন, উসামাকে এ জন্য বেশি দিয়েছি যে, তার পিতা জায়েদ তোমার পিতার চেয়ে রাসূল সা:-এর কাছে বেশি প্রিয় ছিল। আর উসামা রাসূল সা:-এর কাছে তোমার চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল। রাসূল সা:-এর প্রিয়কে আমার প্রিয়-এর ওপর প্রাধান্য দিয়েছি। (তিরমিজি, মিশকাত-৬১৭৩)
হজরত খাদিজা রা: মহানবী সা:-এর প্রথম স্ত্রী। তিনি মহানবী সা:-কে এতই ভালোবাসতেন যে, তার সততা, বিশ্বস্ততা, সত্যনিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ইত্যাদিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি ছিলেন একজন বড় ব্যবসায়ী। প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন তিনি। রাসূল সা:-এর নির্দেশে দ্বীনের জন্য অকাতরে সম্পদ দান করে দেন। হেরা গুহায় ওহি নাজিল হওয়ার পর মহানবী সা: ভীত হয়ে বলেন, আমি নিজের জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছি। হজরত খাদিজা রাসূল সা:-কে অভয় দিয়ে বলেন, আল্লাহ তায়ালা কখনো আপনাকে অপমান করবেন না, আপনি আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করেন, বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন, মেহমানদারি করেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এরপর তিনি তাঁকে ওরাকা বিন নাওফেলের কাছে নিয়ে যান। (সহিহ বুখারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২-৩)
উম্মে হাবিবা রা: মক্কার নেতা আবু সুফিয়ানের কন্যা। হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করে নতুন চুক্তি করার বাসনা নিয়ে পিতা আবু সুফিয়ান রাসূল সা:-এর কাছে মদিনায় আসেন। কিন্তু রাসূল সা: তার সাথে দেখা করেননি। চলে যাওয়ার প্রাক্কালে স্বীয় কন্যার সাথে দেখা করতে যান। কন্যা পিতার যথোপযুক্ত মেহমানদারি করেন। কিন্তু যখন আবু সুফিয়ান রাসূল সা:-এর শয্যায় বসতে যান, তখন উম্মে হাবিবা রা: তা উল্টিয়ে দেন। আবু সুফিয়ান এতে রুষ্ট হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করেন। কন্যা বলেন, তা নবী সা:-এর বিছানা, আপনি মুশরিক। মুশরিকরা নাপাক। তা শ্রবণ করে আবু সুফিয়ান বলেন, আমার সঙ্গ ত্যাগ করার পর তুমি অনেক খারাপ হয়ে গেছ।
মহানবী বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে সাহাবিদের মতামত চান। হজরত আবু বকর রা:, হজরত ওমর রা: প্রমুখ চমৎকার মতামত দেন। এ পর্যায়ে হজরত মিকদাদ ইবন আমর রা: দাঁড়িয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে যে পথ দেখিয়েছেন, তার উপর আপনি অবিচল থাকুন। আমরা আপনার সাথে থাকব। আল্লাহর শপথ! ইসরাইলরা মুসা আ:-কে যে কথা বলেছিল আমরা আপনাকে সে কথা বলব না। বনি ইসরাইল বলেছিল- হে মুসা! তারা যতদিন সেখানে থাকবে, ততদিন আমরা সেখানে প্রবেশই করব না। সুতরাং তুমি ও তোমার রব যাও এবং যুদ্ধ করো, আমরা এখানে বসে থাকব। (সূরা মায়েদা-২৪) রাসূলুল্লাহ সা: মিকদাদ রা:-এর কথা শুনে তার প্রশংসা করেন এবং তার জন্য দোয়া করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম)
ইমাম বুখারি হজরত কায়স ইবনে আবু হাজেম থেকে বর্ণনা করেন- আমি লক্ষ করলাম- তালহার হাত উহুদ যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, যে হাত দিয়ে তিনি মহানবী সা:-কে রক্ষা করে ছিলেন। (সহিহ বুখারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৫২৭, ৫৮১)
হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে কুরাইশরা ওরওয়াকে হুদায়বিয়ায় প্রেরণ করে। সে মহানবী সা:-এর সাথে সাহাবিদের আচার-ব্যবহার প্রসঙ্গে তাদেরকে গিয়ে বলে, হে কাওম! আমি কায়সার কিসরা ও নাজ্জাসির মতো সম্রাটদের কাছে গেছি। আল্লাহর শপথ, আমি কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীদের কাছ থেকে এত মর্যাদা লাভ করতে দেখিনি, যতটা সম্মান ও মর্যাদা লাভ করতে মুহাম্মদ সা:-কে দেখেছি। তিনি থুথু ফেললে তা হাতে নিয়ে দেহে-মুখে মাখে। তিনি কোনো আদেশ করলে তা পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার অজুর উচ্ছিষ্ট পানি গ্রহণে হুড়োহুড়ি লেগে যায়, তিনি কথা বলতে শুরু করলে সঙ্গীরা কণ্ঠস্বর নিচু করে ফেলে। শ্রদ্ধার আতিশয্যে তারা তাঁর প্রতি পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় না। (আর রাহিকুল মাখতুম)
লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামিয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী