শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্ধশত বছরে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। এই সময়ে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে চীনের আর্থিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। তবে ২০০৮-২০২৪ সালে আ’লীগ সরকারের সময়ে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বাংলাদেশের ওপর। গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জানা যায়, ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। সেদিন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের সময় নিউইয়র্কে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিয়াও কুয়ান-হুয়া যৌথ বিবৃতিতে এই সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে সেনাপ্রধান হিসেবে এবং পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সফর করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফর এবং পরবর্তীকালে উচ্চপর্যায়ের পারস্পরিক সফরগুলো এ সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকার চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে। ২০০৮-২০২৪ সালে আ’লীগ সরকারের সময়ে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল। এরই মাঝে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের মধ্যে ২৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিলো দুই হাজার কোটি ডলারের। অর্থ ছাড় হয়েছে ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে যোগাযোগখাতে উল্লেখযোগ্য, কর্ণফুলী টানেল। মোট ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলে চীনের ঋণ থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে ছয় হাজার ৭০ কোটি টাকা। এই টানেল দিয়ে কক্সবাজারের সাথে এবং মাতারবাড়ি যাওয়ায় সময় কমে আসায় অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ। এছাড়াও পদ্মা রেল সংযোগ চালু হওয়ায় দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত সময় কমেছে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাড়ছে। প্রযুক্তিখাতে ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টার তথ্য-উপাত্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও নিরবচ্ছিন্ন মানসম্মত ই-সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মিত হয়েছে। এ ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের তথ্য দেশেই সংরক্ষিত থাকছে। বছরে এ কোম্পানি থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মুনাফা হবে। জি ক্লাউড স্থাপন সম্পন্ন হলে দেশের ৪৫ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে এবং কোম্পানির আয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার, যেখানে ডাটা ৯৯.৯৫% সুরক্ষিত। এই সেন্টার নির্মাণে অর্থায়ন করেছে চীন। ডেভেলপমেন্ট অব আইসিটি ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ফেজ থ্রি প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। এর আওতায় দুই হাজার ৬০০ ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দেশের ৬০ শতাংশ মানুষকে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে সংযুক্ত করতে কারিগরি জ্ঞানের আদান-প্রদান বাড়ানো ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ১৫৬ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থ পুরোটাই পাওয়া গেছে চীনের দেওয়া ঋণ থেকে। ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল অন্তর্র্বতী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের ইউনান প্রদেশ ও বাংলাদেশস্থ চীন দূতাবাসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘চীন-বাংলাদেশ পিপল-টু-পিপল এক্সচেঞ্জ ইয়ার: ইউনান এডুকেশন অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন’ অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে চীনের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, আহতদের চিকিৎসা দিতে আমাদের যে সীমাবদ্ধতা তা চীনের রাষ্ট্রদূতকে জানালে তিনি খুব দ্রুত এর সমাধান করেন। চীন সরকার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই একটি মেডিকেল টিম গঠন করে এবং সেপ্টেম্বরেই তাদের বাংলাদেশে পাঠায়। এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। এছাড়া ২১ হাজার শয্যার ২০টি অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের আলোচনা চলছে। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও ভাষা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়, ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা শিক্ষার আওতায় আনা হবে। বাংলাদেশে কার্যরত চীনা কোম্পানিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তি গড়তে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২৩ থেকে ২৬ জুন সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের অর্ধশত বছরে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। চীন সবসময় বন্ধু সূলভ আচরণ করেছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে বলে দাবি করেছেন চীন সরকারের প্রতিনিধি ও ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তাঁর ভাষ্য, চীন বাংলাদেশকে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু, প্রতিবেশী ও অংশীদার মনে করে। তিস্তা প্রকল্পে তাদের অবস্থান একেবারে অপরিবর্তিত। বাংলাদেশের অনুরোধেই চীন এই প্রকল্পে কাজ করবে এবং চীন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখবে। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের বাহ্যিক হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ সহায়তা, জিডিআই, মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তা, চীনের ভাষা শিক্ষা এবং গণমাধ্যমের নানা পরিসরে সহায়তা। দেশের রপ্তানির সক্ষমতা বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রপ্তানি করতে পারি, সেটা নিয়ে কথা হয়েছে। আশা করছি, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন দিগন্তে পৌঁছাবে। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে এবং প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা সচেতন মহলের।
মোঃ এমদাদ উল্যাহ 























