ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটির পর ২৫৯ যাত্রীর ভোগান্তি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের একটি অংশ কেন বিমানবন্দরের বাইরে হোটেলে থাকতে পারেননি, তা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দাবি, বিদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের হোটেলে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ইতালির অভিবাসন-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে বিমানবন্দরের বাইরে যেতে না পারায় তাঁদের লাউঞ্জে রাখা হয় এবং সেখানে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি তাঁরা। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল আরও তীব্র।
ঘটনাটি কেবল একটি ফ্লাইটের কারিগরি ত্রুটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আন্তর্জাতিক ট্রানজিটে আটকে পড়া যাত্রী ব্যবস্থাপনা, পাসপোর্টভিত্তিক সুবিধার পার্থক্য এবং সংকটকালীন পরিস্থিতিতে একটি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।খবমধষ
কী ঘটেছিল রোমে?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৬ ফ্লাইটটি টরন্টো থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। উড়োজাহাজটিতে মোট ২৫৯ জন যাত্রী ছিলেন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে কানাডার টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর উড়োজাহাজটি প্রায় আট ঘণ্টা আকাশে অবস্থান করে।
এরপর কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে এটি জরুরি অবতরণের জন্য ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে অবতরণ করে। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে উড়োজাহাজটি সেখানে অবতরণ করে।
এরপর শুরু হয় যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা।
প্রথমে তাঁদের দীর্ঘ সময় উড়োজাহাজের ভেতরেই অবস্থান করতে হয়। যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট ঘণ্টা অনেকে বিমানের ভেতরেই ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের বিমান থেকে নামিয়ে বিমানবন্দরের একটি লাউঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সেখানেই নতুন করে সংকট তৈরি হয়।
হোটেলে গেলেন কেউ, লাউঞ্জে রইলেন অনেকে
যাত্রীদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এখানেই। তাঁদের দাবি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী যাত্রীদের হোটেলে রাখা হলেও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
ফলে প্রায় ১৭০ জন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীকে ফিউমিচিনো বিমানবন্দরের প্রিমা ভিস্তা লাউঞ্জে অবস্থান করতে হয়। কেউ চেয়ারে, কেউ আবার মেঝেতে বসে বা শুয়ে রাত কাটান। যাত্রীদের পাঠানো ভিডিও ও বক্তব্যে দেখা যায়, দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেকেই চরম ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. আবু সাঈদও ওই যাত্রীদের একজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ যাত্রী ছিলেন। দীর্ঘ সময় বিমানের ভেতরে অবস্থানের কারণে অনেকে অসুস্থ বোধ করেন। পরবর্তীতে লাউঞ্জে নেওয়ার পরও তাঁদের সেখানেই রাত কাটাতে হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ার কারণেই কি তাঁদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. রোকন উর রহমানও লাউঞ্জে অবস্থানকারী যাত্রীদের একজন।
তিনি জানান, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রবীণ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।
খাবার নিয়েও যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নাশতা দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তা সরবরাহ করা হয়নি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য তা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
বিমান কী বলছে?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বিমানের জনসংযোগ কর্মকর্তা বোসরা ইসলাম জানান, বিদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের হোটেলে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বিমানবন্দর থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি না থাকায় তাঁদের লাউঞ্জে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যাত্রীদের থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিমান নিয়মিতভাবে খোঁজখবর রাখছে। অর্থাৎ, বিমানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশি যাত্রীদের লাউঞ্জে রাখার সিদ্ধান্ত কেবল সংস্থার নয়; এর সঙ্গে ইতালির অভিবাসন-সংক্রান্ত বিধিনিষেধও জড়িত। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়।
বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়া যদি আইনি কারণে সম্ভব না-ও হয়, তাহলে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম, খাবার, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল।
শুধু কারিগরি ত্রুটি নয়, ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে
উড়োজাহাজে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। যাত্রী নিরাপত্তার স্বার্থে এমন পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড রাখা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তবে সংকটের সময় যাত্রী ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে, সেটিও বিমান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোমের ঘটনায় দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে।
একদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ত্রুটি মেরামতের জন্য ঢাকা থেকে প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে।
অন্যদিকে, যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার সময় তাঁদের পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ঢাকা থেকে যাচ্ছে প্রকৌশলী ও যন্ত্রাংশ
বিমান জানিয়েছে, উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটি সমাধানে দুই সদস্যের প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়েছে।
এ জন্য বিজি-৩০৫ ফ্লাইটটি শনিবার রাত ১টা ৫৩ মিনিটে ঢাকা থেকে রোমের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। স্থানীয় সময় রোববার সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে ফ্লাইটটির রোমে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
কারিগরি ত্রুটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বিজি-৩০৬ ফ্লাইটটি রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করতে পারবে বলে জানিয়েছে বিমান।
একই উড়োজাহাজ ব্যবহৃত হওয়ায় বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের যাত্রাও বিলম্বিত হয়েছে।
কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে যাত্রীদের?
বিমান জানিয়েছে, ত্রুটি সমাধান শেষে উড়োজাহাজটি রোমের স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে পরদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কারিগরি ত্রুটি মেরামতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় সবসময় নিশ্চিত করা যায় না। নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত উড়োজাহাজটি যাত্রী নিয়ে উড্ডয়ন করবে না।
অর্থাৎ, যাত্রীদের ভোগান্তির সমাপ্তি পুরোপুরি নির্ভর করছে মেরামত ও নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয় তার ওপর।
যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেল
রোমের এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল ফ্লাইটটি কখন ঢাকায় ফিরবে তা নয়। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক রুটে কোনো উড়োজাহাজ হঠাৎ গ্রাউন্ডেড হলে বিদেশি ও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কোনো সুস্পষ্ট জরুরি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা রয়েছে কি না। আর যদি স্থানীয় অভিবাসন বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশি যাত্রীদের হোটেলে নেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তাঁদের জন্য বিকল্প মানবিক ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর ও মানসম্মত।
যাত্রীদের অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ হোটেলে রাত কাটিয়েছেন, আবার কেউ বিমানবন্দরের লাউঞ্জে চেয়ারে বা মেঝেতে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পার্থক্যের কারণ কেবল পাসপোর্টভিত্তিক নীতিমালা, নাকি এর পেছনে আরও কোনো প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কারণ একজন যাত্রী যখন একটি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার টিকিট কিনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রা করেন, তখন তাঁর প্রত্যাশা শুধু নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; বরং সংকটকালেও ন্যূনতম মানবিক সেবা পাওয়া। রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে আটকে পড়া ২৫৯ যাত্রীর ঘটনা তাই এখন কেবল একটি ফ্লাইট বিলম্বের ঘটনা নয়। এটি বড় প্রশ্ন তুলেছে—সংকটকালীন যাত্রী ব্যবস্থাপনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কতটা প্রস্তুত।
সংবাদ শিরোনাম
রোমের বিমানবন্দরে ২৫৯ যাত্রী, ভোগান্তির রাত
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ১০:২৫:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
- 71
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























