দেশে উৎপাদিত প্রায় চার লাখ টন লবণ অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উৎপাদন খরচ তুলতে না পারা এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় যখন কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণচাষিরা লোকসানে পড়েছেন, ঠিক তখনই অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে লবণচাষিদের মধ্যে। চাষিদের আশঙ্কা, আমদানি করা লবণ বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় লবণের দাম আরও কমে যাবে। ফলে উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না অনেক চাষি। এতে আগামী মৌসুমে লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন তারা। কক্সবাজারের মাতামুহুরী এলাকার পশ্চিম বড়ভেওলার চাষি হারুনুর রশিদ গত মৌসুমে প্রায় ৬০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেন। তিনি চকরিয়া উপজেলার পুর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তার দাবি, লবণ উৎপাদনে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৪০ লাখ টাকা। এতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। হারুনুর রশিদ বলেন, প্রতি ৮০ কেজির বস্তা লবণ ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।
এর সঙ্গে প্রতি বস্তায় প্রায় ১৫০ টাকা পরিবহন খরচ হয়েছে। লবণ চাষে এর আগে কখনো এত বড় লোকসান হয়নি বলেও জানান তিনি। একই এলাকার রামপুরের চাষি নজরুল ইসলামের প্রায় ৫০ টন লবণ এখনো অবিক্রীত পড়ে আছে। খুটাকালী ইউনিয়নের বহলতলী মৌজার চাষি মিজানুর রহমান চৌধুরীর জমিতেও গত তিন মৌসুমের প্রায় ৫০ টন লবণ পড়ে রয়েছে। তিনি প্রায় ১০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেছেন। মাতামুহুরি উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের চাষি নুরুন নবী প্রায় ৩০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদনে নিজস্ব পুঁজির পাশাপাশি ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু লোকসানের কারণে এখনো ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। তার দাবি, লবণ উৎপাদনে প্রায় ৮০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন তিনি। উৎপাদন কমলেও অবিক্রীত বিপুল লবণ বিসিক কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে কক্সবাজারের ৯টি উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ ৭৫ হাজার টন। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৩৫ হাজার টন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হয়েছে প্রায় সাত লাখ টন। উৎপাদন কম হলেও মাঠ ও বিভিন্ন স্থানে প্রায় চার লাখ টন লবণ অবিক্রীত রয়েছে। ফলে নতুন মৌসুম শুরুর আগে পুরোনো লবণ বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চাষিরা। বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আমদানির তদবিরের পর বিসিক চলতি বছরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লবণ আমদানির সুপারিশ করে। এরপর গত বুধবার ব্যবসায়ীদের দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমোদনের আওতায় ২৪৪টি লবণ মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট এক লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনকারী সাত প্রতিষ্ঠানকে দুই হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমদানির অনুমতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে চাষিরা কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী (প্রকাশ খোকন মিয়া) বলেন, মাঠের প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনা না করে লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে লবণচাষি ও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আগামী ডিসেম্বর থেকে অনেক চাষিই লবণ উৎপাদনে নামবেন না বলে আশঙ্কা রয়েছে। মাতামুহুরীর চাষি শোয়াইবুল ইসলাম সবুজ ও রামপুরের নজরুল ইসলাম বলেন, গত জুনে মাতামুহুরী উপজেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাদের প্রশ্ন, চাষিরা যখন নিজেদের উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে পারছেন না, তখন লবণ ঘাটতির আশঙ্কায় আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো কেন? মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান জামিল ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, গত বছর অনেক চাষি উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এরপরও পৈতৃক পেশা ধরে রাখতে আগামী মৌসুমে লবণ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
কিন্তু আমদানির খবরে চাষিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক ইদ্রিস মিয়া আমদানির অনুমতির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মাঠে প্রায় চার লাখ টন লবণ অবিক্রীত রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে গত মৌসুমে চাষিদের নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। ফলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। লবণচাষিদের দাবি, আমদানির আগে দেশের প্রকৃত মজুত, স্থানীয় উৎপাদন, বাজারদর ও উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাদের মতে, অবিক্রীত দেশীয় লবণ বাজারজাত ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করে আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে অনেক চাষিই লবণ চাষে আগ্রহ হারাবেন।
সংবাদ শিরোনাম
উপকূলের মাঠে লবণ স্কুপ করে হাসছেন চাষিরা অবিক্রীত চার লাখ টন দেশীয় লবণ আমদানির অনুমতিতে কক্সবাজার-চট্টগ্রামের চাষিদের উদ্বেগ
-
অলি উল্লাহ রনি (স্টাফ রিপোর্টার) কক্সবাজার - আপডেট সময় ০৮:০৩:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 18
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























