জেলার গোমতী নদীর অববাহিকায় বেলে দোআঁশ মাটির উর্বরতা, অনুকূল পরিবেশ আর কৃষকের নিরলস পরিশ্রমÑএই তিনের সমন্বয়ে কুমিল্লায় গড়ে উঠেছে সবজির চারা উৎপাদনের সমৃদ্ধ এক জনপদ।
চার দশকেরও বেশি সময় আগে যে পেশার সূচনা হয়েছিল সীমিত পরিসরে, আজ সময়ের ব্যবধানে তা এখন পরিণত হয়েছে কোটি টাকার বাণিজ্যে।
শীতকালীন সবজি চাষের মৌসুম সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে চারা উৎপাদন ও বিক্রির ব্যস্ততা। বিশেষ করে বুড়িচং উপজেলার সমেশপুর গ্রামে মাঠজুড়ে সবুজ চারার সমারোহ। এখানকার উৎপাদিত চারা সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
তবে কৃষি উদ্যোগের সামনে এখন বড় বাধা জলাবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার খাল খনন করা গেলে উৎপাদন ও বাণিজ্য আরও বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় চাষিরা।
কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের সাহেববাজার থেকে কয়েক মিনিটের পথ পেরোলেই সমেশপুর গ্রাম। দূর থেকে তাকালে চোখে পড়ে মাঠের পর মাঠ সবুজের বিস্তার। কাছে গেলে দেখা যায়, জমিতে তৈরি করা সারি সারি বেডে যতœআত্তিতে বেড়ে উঠছে নানা জাতের সবজির চারা। কোথাও ফুলকপি, বাঁধাকপি, কোথাও টমেটো, আবার কোথাও বেগুন আর মরিচের চারা। পাশাপাশি রয়েছে শিম, লাউ, কুমড়া ও ব্রকলিসহ অন্তত ২৩ ধরনের সবজির চারা। প্রতিটি বেড যেন কৃষকের পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা আর নতুন মৌসুমের প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সমেশপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে সকাল হওয়ার আগেই কৃষকদের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ বীজতলায় পানি দিচ্ছেন, আবার কেউ পরিচর্যা করছেন সদ্য গজিয়ে ওঠা চারার। বিক্রির উপযোগী চারা তুলে যতœ করে আঁটি বাঁধছেন শ্রমিকরা।
অন্যদিকে পাইকাররা জমিতে দাঁড়িয়েই চারার সংখ্যা গুণে কিনে নিচ্ছেন। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, শ্রমিকদের ব্যস্ততা আর চারার বেডজুড়ে সবুজের বিস্তারÑসব মিলিয়ে শীতকালীন সবজি উৎপাদনের আগাম প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো সমেশপুর গ্রাম।
এখানে চারা উৎপাদন কেবল একটি কৃষিকাজ নয়; এটি বহু পরিবারের জীবিকা, স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং দেশের সবজি উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
মৌসুম শুরু হলে সমেশপুরে বাড়ে পাইকারসহ স্থানীয়দের আনাগোনা। স্থানীয় চাষিদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসেন সবজি উৎপাদনকারী কৃষকরা। জমিতে চাষের উপযোগী চারা সংগ্রহ করে তারা নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে যান। ফলে সমেশপুরের কৃষকের মাঠে তৈরি হওয়া চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবজিখেতেও পৌঁছে যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে ৫শ’র বেশি কৃষক সবজির চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এই কর্মকা-ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে কৃষক, শ্রমিক, বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী, পাইকার এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে গড়ে উঠেছে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের একটি বিস্তৃত পরিসর।
সমেশপুর এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলেও জেলার আরও কয়েকটি এলাকায় চারা উৎপাদনের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে বুড়িচং উপজেলার ডাকলাপাড়া, কালাকচুয়া, কাবিলা ও নিমসার এলাকায়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। এ ছাড়া চান্দিনা, দেবিদ্বার, বরুড়া ও চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় চারা উৎপাদন ও বিক্রির কার্যক্রম রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এসব চারার বাজারমূল্য প্রতি মৌসুমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা।
উৎপাদিত চারার গুণগত মানের কারণে কুমিল্লার এ জনপদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। টমেটো, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ ও কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজির চারা এখান থেকে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বীজতলার পরিচর্যা এবং চারা উৎপাদনের কৌশল এই বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল এলাকার কৃষক মোস্তফা মিয়া নিয়মিত সমেশপুর থেকে চারা সংগ্রহ করেন। তিনি বাসস’কে বলেন, ভালো জাতের সবজির চারা পেতে তিনি প্রতিবছরই এখানে আসেন। এবারও শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি হিসেবে চারা কিনতে এসেছেন। তার প্রত্যাশা, আগের বছরগুলোর মতো এবারও মানসম্মত চারা নিয়ে জমিতে চাষ শুরু করতে পারবেন। তার মতো অনেক কৃষকের কাছে সমেশপুর এখন নির্ভরযোগ্য চারা সংগ্রহের জায়গা।
সমেশপুরের চারা ব্যবসার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। স্থানীয় সাথী-বিথী নার্সারির মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাসস’কে জানান, তাদের পরিবারের সঙ্গে এই ব্যবসার চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, তার বাবা ইউসুফ আলী ব্রিটিশ আমলের পর থেকেই গ্রামটিতে চারা উৎপাদন শুরু করেন। পরে অন্যদের এই কাজে উৎসাহিত করেন। ধীরে ধীরে আরও অনেকে চারা উৎপাদনে যুক্ত হন। একসময় যে উদ্যোগ ছিল সীমিত কয়েকজনের মধ্যে, তা এখন পুরো এলাকার পরিচিত পেশায় পরিণত হয়েছে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি ৪১ বছর ধরে এ পেশায় আছি। সমেশপুরের ভালো চারার ঐতিহ্য কয়েক যুগের। গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের সব জায়গায় আমাদের চারা বিক্রি হয়। এই এলাকা থেকেই বছরে সাত কোটি টাকার মতো চারা বিক্রি হয়।
চারা উৎপাদনকারী সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে চারা তৈরি করি। বীজ, সার, শ্রমিক ও জমি প্রস্তুত করতে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু বৃষ্টি হলে জমিতে পানি জমে হাজার হাজার চারা নষ্ট হয়ে যায়। তখন আমাদের লোকসান গুনতে হয়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে এই ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্থানীয় উৎপাদনকারীদের দাবি, সমেশপুর এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার খাল খনন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, খালটি খনন করা গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারবে। এতে জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার আশঙ্কা কমবে এবং চারা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বাসসকে বলেন, সমেশপুরে প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে। চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ানো এবং চারার গুণগত মান বজায় রাখার লক্ষ্যে উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলছে।
তিনি বলেন, আমদানিনির্ভর বীজের কারণে চারা উৎপাদনকারীরা তুলনামূলকভাবে কম লাভ করছেন। দেশে মানসম্মত বীজ উৎপাদন বাড়ানো গেলে তাদের উৎপাদন ব্যয় ও লাভের ব্যবধানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এতে চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বাসসকে বলেন, চারা উৎপাদনে কুমিল্লা দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানকার কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত সবজির চারা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে সরবরাহ করছেন। চারা উৎপাদনের এই সাফল্য ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় চারা উৎপাদনকারীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, বৃষ্টির সময় জমিতে পানি জমে হাজার হাজার চারা নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, এ সমস্যা সমাধানে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি খাল খননের বিষয়ে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কৃষিমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। তারা এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে খাল খননের কাজ শুরু হবে।
সংবাদ শিরোনাম
সমেশপুরের চারা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৮:০১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- 5
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























