লক্ষ্মীপুরে সয়াবিনে স্বপ্ন বুনছেন কৃষক
সয়াল্যান্ড খ্যাত লক্ষ্মীপুরে এবার সয়াবিনের ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। মেঘনার উপকূলে বিশাল চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায়, শুধু সয়াবিন আর সয়াবিন। কৃষকেরা ব্যস্ত খেত পরিচর্যায়। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে চলতি মৌসুমে সয়াবিনের ফলন ভালো হবে বলে আশা কৃষকদের। চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৫ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদ হয়েছে। ৯০ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন প্রায় সয়াবিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য হবে প্রায় ৫শ ৫০ কোটি টাকা প্রায়। বিগত বছরে উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার৬৬০ হেক্টর জমিতে ৮৭হাজার ৩২০ মেট্রিক টন সয়াবিন। যা প্রায় ৫শ ২০ কোটি টাকা বাজার মূল্য হয়। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, দেশে মোট উৎপাদিত সয়াবিনের ৭০ শতাংশই লক্ষ্মীপুর জেলার চার উপজেলায় পাওয়া যায়। আমন মৌসুম শেষে সয়াবিনের আবাদ করা হয়। চলতি মৌসুমের সয়াবিনের ফসল আগামী মে মাসের মাঝামাঝিতে তোলা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, চলতি মৌসুমে ৪৩হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে আরও ১ হাজার ৪০৫ হেক্টর বেশি জমিতে সয়াবিনের আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের সদর, রায়পুর, রামগতি, রামগঞ্জ, কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কাজ করছে কৃষকেরা। বিস্তৃর্ণ মাঠ জুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় ৭ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে ১৫ হাজার মেট্রিক টন, রায়পুর উপজেলা, ৬ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে ১ হাজা৩২০ মেট্রিক টন, রামগঞ্জ উপজেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে ৩০ মেট্রিক টন, রামগতি উপজেলা ১ হাজার ৭শ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৪শ মেট্রিক টন সয়াবিন কমলনগর উপজেলা ১৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে ২৭ হাজার ৯শ মেট্রিক টন সয়াবিন চাষ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের প্রায় ৭০ শতাংশ সয়াবিন লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত হয়। সয়াবিনের কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন দেশের গবেষকরা। এই নতুন জাতের মধ্যে রয়েছে বিইউ-১, বিইউ-২, বারি-৫, বারি-৬, বিনা-৫, বিনা-৬, দেশীয় সোহাগ। নতুন জাতের সয়াবিন সনাতনী জাত থেকে বেশি উৎপাদন হয়। দেশের বাজারে সয়াবিনের চাহিদা ও দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় সয়াবিন চাষে জেলার কৃষকরা বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার রামগতি, কমলনগর, সদর এবং রায়পুর উপজেলার চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সয়াবিন চাষ হয়ে থাকে। তবে দেশে উৎপাদিত সয়াবিন থেকে তেল উৎপাদন করা হয় না। দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের পুরোটাই ব্যবহৃত হয় পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে। দেশে বিকাশমান পোলট্রিশিল্পের পিছনেও বড় অবদান রেখে চলছে লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সয়াবিন। কৃষকেরা জানান, সয়াবিন আবাদে খরচ কম। রোগ ও পোকার আক্রমণও কম হয়। চাষাবাদের পদ্ধতি সহজ। বিক্রি করলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায় ধানের চেয়েও বেশি। যে কারণে সয়াবিন চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কম পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় চরাঞ্চলে সয়াবিনের চাষ দিন দিন বাড়ছে। কৃষকদেরও সয়াবিন চাষের মধ্য দিয়ে ভাগ্য বদল হচ্ছে বাজারের সয়াবিন ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের ৭০ শতাংশের উৎপাদন হয়। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে ক্রেতাদের আগমন বেড়ে যায় বাজারগুলোতে।’ এই সয়াবিন গুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যায়। চররমনী মোহন ইউনিয়নের কৃষক রহিম হোসেন বলেন, ‘অন্য সবজি চাষ করলে যে খরচ হয়।সয়াবিন চাষে তার থেকে কম খরচ হয়। সয়াবিনে সার, কীটনাশক কম লাগে। এ ছাড়া অন্য ফসল চাষ করার জন্য যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয়, সয়াবিন চাষে তার চেয়ে অনেক কম শ্রম দিতে হয়। এতে আমাদের উৎপাদন ব্যয় কম হয়। সে জন্য এখানকার কৃষকরা সয়াবিন চাষে ঝুঁকছেন।’ চররুহিতার কৃষক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সয়াবিন চাষ লাভজনক হওয়ায় এবার গত বছরের থেকে বেশি পরিমাণ জমিতে সয়াবিন আবাদ করেছি। কৃষি বিভাগের লোকজন চাষাবাদের শুরু থেকেই পরামর্শ দিয়েছেন। বৈশাখ মাসের শেষ দিকে চাষ করা সয়াবিনের ফলন উঠতে শুরু করবে। উৎপাদিত সয়াবিন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকেন। এ ছাড়া মৌসু-মি ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সয়াবিন কিনেন। ফলে সয়াবিন বিক্রি করতেও চাষিদের কোনো অসুবিধা হয় না। রায়পুরের মেঘনা উপকূলীয় বিশাল চরাঞ্চলে জেগে ওঠা উত্তর চরবংশী, দক্ষিণ চরবংশী, উত্তর চর আবাবিল ও দক্ষিন চরআবাবিল ইউনিয়নে সয়াবিন চাষ হয়। বিশেষ করে চরইন্দুরিয়া, চরজালিয়া, চরখাসিয়া, চরকাছিয়া, চরলক্ষ্মী ও কানিবগার সদর চর এলাকায় কয়েক হাজার একর জমিতে সয়াবিনের চাষ হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ, হাজীপাড়াসহ আটটি ইউনিয়নে চাষ হয় সয়াবিনের। সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে রামগতি ও কমলনগর উপজেলায়ও অনেক এলাকায় সয়াবিনের আবাদ করা হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এই জেলায় উর্বর মাটি সয়াবিন চাষের জন্য উপযোগী। এখানকার মাটি দোআঁশ জাতীয়। এ মাটিতে একবার লাঙল চালালেই তা সয়াবিন চাষের উপযোগী হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতিবছর ফলন লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আবাদের উপযুক্ত সময়। সয়াবিন খেতে খুব একটা সার দিতে হয় না। খেতে নিড়ানি দিয়ে আগাছাও পরিষ্কার করা লাগে না। গাছ বড় হলে এক-দুবার কীটনাশক দিতে হয়। চারা গজানোর ১৩০-১৩৫ দিনের মধ্যে ফসল ঘরে চলে আসে।
আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল লক্ষ্মীপুর 
























