রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর সংবাদভিত্তিক চ্যানেল বিটিভি নিউজ-এ নিয়োগ, বদলি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, চ্যানেলটির বর্তমান কার্যক্রমে আওয়ামী রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব বাড়ছে। বিশেষ করে, আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু সংবাদকর্মীর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এই প্রভাব আরও জোরদার করতে চট্টগ্রাম টিভি থেকে দুজন সংবাদকর্মীকে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, পূর্বে শিল্পী সম্মানীভিত্তিক চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাদ পড়া কিছু রিপোর্টারকে পুনর্বহালের প্রক্রিয়াও চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আলাদাভাবে যাত্রা শুরু করা বিটিভি নিউজ অল্প সময়েই দর্শকদের নজর কাড়ে। শুরুতে চ্যানেলটির চিফ নিউজ এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বিটিভির নিজস্ব কর্মকর্তা মুন্সি ফরিদুজ্জামান। তবে জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে তাকে সরিয়ে বাংলাদেশ বেতার-এর একজন কর্মকর্তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই বদলির পেছনে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়নি। তবে বিটিভির অভ্যন্তরীণ কিছু সূত্র বলছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কিছু ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
বদলির পর চ্যানেলটির কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে, বর্তমান নেতৃত্ব কাঠামোতেও আওয়ামী সম্পৃক্ততার প্রশ্ন উঠেছে। চ্যানেলটির প্রধান বার্তা সম্পাদকসহ কয়েকজন নির্বাহী প্রযোজকের অতীত কর্মজীবন নিয়েও আলোচনা চলছে, বিশেষ করে তারা পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে কর্মরত রিপোর্টারদের একটি বড় অংশই পূর্ববর্তী সময়ে শিল্পী সম্মানীভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকের ছাত্রলীগের রাজনীতির সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে, বর্তমান চিফ নিউজ এডিটর নিজ কর্মস্থলে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নতুন একজনকে বসানোর চেষ্টা চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিটিভি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
“জন্ম থেকে জলছি মাগো তোমার এই ভাঙা সংসারে”
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিধান রায়ের ৩০ বছরের সংগ্রাম, বৃদ্ধ মাকে নিয়ে টোং ঘরে মানবেতর জীবন
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে মানবজীবনের এক হৃদয়স্পর্শী সংগ্রামের নাম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিধান চন্দ্র রায়। জন্ম থেকেই চোখে আলো নেই, জীবনের পথে ছিল না জমি, ছিল না ভিটেমাটি, ছিল না নিরাপদ আশ্রয়। তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। গত তিন দশক ধরে বৃদ্ধ মাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় একটি টোং ঘরে কাটছে তার জীবন।
“জন্ম থেকে জলছি মাগো তোমার এই ভাঙা সংসারে”—এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে তার জীবনের সমস্ত বেদনা। দুঃখ যার সঙ্গী, তার আবার সুখ কোথায়! তবুও হাল ছাড়েননি বিধান। অভাব, অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারকে সঙ্গী করেই লড়ে যাচ্ছেন প্রতিটি দিন।
মঙ্গলবার সরেজমিনে উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নের পালেরখণ্ড গ্রামে গিয়ে জানা যায়, মৃত লক্ষীকান্ত রায়ের ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (৬০) জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। পিতার কোনো পৈত্রিক ভিটেমাটি না থাকায় তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় একটি ছোট টোং ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন। তার সঙ্গী একমাত্র ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মা শান্তি রানী রায়।
মা-ছেলের এই ছোট সংসারে নেই কোনো বিলাসিতা, নেই স্বস্তি। টোং ঘরের সামনেই ছোট্ট দোকান সাজিয়ে শিশুদের জন্য চকলেট, বিস্কুটসহ কিছু ক্ষুদ্র পণ্য বিক্রি করেন বিধান। সেই সামান্য আয় দিয়েই কোনোমতে চলে দু’জনের সংসার। কোনো দিন দু’বেলা খাবার জোটে, আবার কোনো দিন অভুক্ত থেকেও কাটাতে হয় দিন।
চোখে দেখতে না পারলেও বিধানের মেধা ও অনুভূতির শক্তি বিস্ময়কর। হাতে টাকা নিয়ে স্পর্শেই বুঝে ফেলতে পারেন কত টাকার নোট। মানুষের মুখ না দেখেও অনুভব করেন তাদের কণ্ঠ, আচরণ ও মন। জীবনের কঠিন বাস্তবতাই যেন তাকে দিয়েছে অন্য এক দৃষ্টি।
বিধান চন্দ্র রায়ের জীবনের আরেকটি করুণ অধ্যায় তার মা। ছোটবেলায় মায়ের আঁচল ধরে বড় হওয়া সেই সন্তান আজও বৃদ্ধ মায়ের হাত ছাড়েননি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মা শান্তি রানী এখন নিজের চলাফেরাতেই কষ্ট পান, তবুও ছেলেকে আগলে রেখেছেন স্নেহে, মমতায়, সংগ্রামে। মা-ছেলের এই সম্পর্ক যেন দারিদ্র্যকেও হার মানায়। স্থানীয়রা জানান, আগে টোং দোকানে কিছুটা বিক্রি হলেও এখন আর তেমন বেচাকেনা নেই। সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সমাজসেবক আলী আমীন মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে ২৫ কেজির এক বস্তা চাল দিয়ে আসছেন। সরকারি সহায়তা হিসেবে মা শান্তি রানী বয়স্ক ভাতা এবং বিধান প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে তা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব।
সম্প্রতি খাল খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে যেখানে তারা বসবাস করতেন সেই টোং ঘরটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর থেকে আরও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় পরিবারটি। স্থানীয়দের সহযোগিতায় পাশেই পলিথিন টানিয়ে অস্থায়ীভাবে রাত কাটাচ্ছেন মা-ছেলে। ঝড়, বৃষ্টি বা বন্যা এলে কোথায় যাবেন—এই আতঙ্কেই কাটছে প্রতিটি দিন।
বিধান রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বাবার কোনো ভিটা মাটি পাইনি। সরকারি জায়গায় ৩০ বছর ধরে এভাবেই থাকি। জন্ম থেকে যুদ্ধ করে দিন পার করছি। নিজের সুখের কথা ভাবি না। শুধু চাই, বৃদ্ধ মাকে নিয়ে যদি একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতাম, তাহলে আর চিন্তা থাকত না।” তার এই আকুতি শুধু একটি ঘর নয়, এটি নিরাপত্তার আবেদন, মর্যাদার আবেদন, শেষ বয়সে মায়ের মুখে একটু নিশ্চিন্ত হাসি দেখার আবেদন। স্থানীয় গ্রামবাসীরা বলেন, ভূমিহীন এই পরিবারটির জন্য সরকারি অর্থায়নে একটি ঘর নির্মাণ এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও এগিয়ে আসা উচিত। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাবিবুল্লাহ বলেন, “জিউধরা ইউনিয়নে খাল খনন প্রকল্প চলমান থাকায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বিধান রায়ের বসবাসকৃত ঘরটি সরানো হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি। আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।” বিধান রায়ের গল্প কেবল একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে এখনো একজন সন্তান বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তিন দশক ধরে টোং ঘরে থাকে, অথচ স্বপ্ন দেখে শুধু একটি ঘরের।
সংবাদ শিরোনাম
বিটিভি নিউজ: নিয়োগ, বদলি ও পুনর্বহাল ঘিরে প্রশ্ন
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৭:২৭:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
- 185
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























