পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল মানতে ‘নারাজ’ মমতা ব্যানার্জী, তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ‘ইস্তফাও’ দেবেন না। তিনি বলেছেন, “কেন ইস্তফা দেব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?” সোমবার ভোট গণনা হয়েছে। প্রকাশিত ফল বলছে ২৯৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়ী বিজেপি। তৃণমূলের ঝুলিতে রয়েছে ৮০টি আসন।
তবে ‘হার’ মানতে রাজি নন তৃণমূল সুপ্রিমো তথা পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।
মঙ্গলবার বিকেলে কালীঘাট থেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি, অভিষেক ব্যানার্জী ও দলের অন্যান্য নেতা-নেত্রীরা। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তিনি এই প্রথম গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন। মমতা ব্যানার্জী বলেছেন, “১০০-র বেশি আসন লুট করেছে।”
“ওরা এমনি জিতলে আমার কোনো অভিযোগ থাকত না। ভোটে হার-জিত তো থাকেই। কিন্তু তা তো হয়নি। আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে।”
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
তার কথায়, “আমাদের এই লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে ছিল না। নির্বাচন কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করল। তারা মানুষের অধিকার লুট করেছে।”
নন্দীগ্রামের পরে ভবানীপুরেও শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হারতে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তবে, পরাজয় মেনে নিতে নারাজ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, সব রকম ভাবে ভবানীপুর-সহ নানা জায়গায় গণনাকে প্রভাবিত করা হয়েছে। সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে গণনাকেন্দ্র থেকে ফিরে মমতা বলেছেন, ‘‘ভবানীপুরের জয়-পরাজয় বড় বিষয় নয়। ব্যক্তিগত জায়গা থেকে দেখছি না। আমি মনে করি, সামগ্রিক ভাবে যা হয়েছে, আমার কেন্দ্রে জয়-পরাজয়ের চেয়ে সেটা অনেক বড়। আমাকে অশ্লীল ভাবে অপমান করা হয়েছে, এমনকি ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত অশোভন ব্যবহার করা হয়েছে। ওখান থেকে সিইও-কে জানিয়েছিলাম। ডিইও, আরও-কে জানাচ্ছি, বলেছিলেন ওঁরা। পরিকল্পনামাফিক এটা করা হল, ২০ হাজারের বেশি ব্যবধান নামিয়ে এখানে আনা হল।’’
বিবিসি বলেছে,সব রেকর্ড ভাঙল ভোটদানের হার। পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ – দেশের স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে কোনোদিন কোনো নির্বাচনে এত বেশি হারে ভোট পড়েনি।
পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য বরাবরই অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি ভোট পড়ে, কিন্তু শহর-গ্রামাঞ্চল নির্বিশেষে ৯০ শতাংশর কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পড়া ওই রাজ্যের জন্যও একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
জাতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে (শতাংশের হিসেবে) সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, আর তা ছিল ৮৪.৭২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে চুরমার।
অনেকেই অবশ্য এত বেশি ভোটদানের হারের সঙ্গে ভোটার তালিকার ‘নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআরের সম্পর্ক টানছেন।
বহু পর্যবেক্ষকই বলছেন, এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়ায় তালিকা আগের তুলনায় অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়েছে – কাজেই এখন ভোটদানের শতকরা হার বাড়াতে পাটিগণিতের হিসেবেই অস্বাভাবিক কিছু নেই।
তবে দ্বিতীয় আর একটা যুক্তি হল, এসআইআরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র কারণে যেহেতু লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারেরও নাম বাদ পড়েছে – তাই তালিকায় নাম থাকা অনেকের মনেও এই ভয়টা ঢুকে গিয়েছিল যে ‘এবারের ভোট দিতেই হবে, নইলে সামনে আমাদেরও নাম বাদ পড়তে পারে’! অর্থাৎ আগামী দিনে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার আতঙ্কেও ভুগেছেন বহু মানুষ।
সম্ভবত এটাও একটা বড় কারণ যে বহু মানুষ এবারের ভোটটা দিতে নিজের কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন, ভিনারাজ্য থেকে দলে দলে গাঁয়ে ফিরেছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা। আসল কারণটা যাই হোক, ভোটদানের শতকরা হিসেবে ২০২৬-র নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি রেকর্ড গড়েছে যা ভাঙা হয়তো বেশ কঠিন হবে।
হাওড়ার বেলুড় এলাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রোড শো।
আমি পদত্যাগ করব না: মমতা
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এবার মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে অস্বীকার করলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। গতকাল মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) কালীঘাটের বাসভবন থেকে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি এই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি।
মমতা বলেন, “আমি রাজভবন কেন যাব? আমরা তো হারিনি। জোর করে দখল করে কেউ যদি ভাবে আমাকে গিয়ে পদত্যাগ করতে হবে, সেটা হবে না। আমরাই জিতেছি, আমরা হারিনি। আমি চেয়ারের কেয়ার করি না। আমি যাব না আর। আমি সব তথ্য প্রমাণ রেখে দিয়েছি। আমি সিইও ও আরও-কে সব জানিয়েছি। অভিযোগ কাকেই বা করব। সবাই তো বিক্রি হয়ে গিয়েছে।”
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “এই নির্বাচনে ভিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারই। আমাদের ১০০ আসন জোর করে লুট করা হয়েছ।”
সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন অভিষেক ব্যানার্জি, ফিরহাদ হাকিম, ডেরেক ও‘ব্রায়েন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, কল্যাণ ব্যানার্জিরা।
শুরুতেই মমতা বলেন, “১০০ আসন জোর করে লুট করা হয়েছে। এসআইআর করে ভোটারদের নাম কাটা হয়েছে। এরকম কোনো ভোটে দেখিনি। আমি ভোটে হারিনি। কেন পদত্যাগ করব? আমরা হারিনি, তাই রাজভবন কেন যাব?”
তিনি বলেন, “দিল্লি থেকে কায়দা করেছে, প্রথম রাউন্ড কাউন্টিং হওয়ার সাথে সাথে দেখিয়ে দিয়েছে। আমি আগেই বলেছিলাম , ওরা কিন্তু প্রথমে বিজেপির ট্যালি দিয়ে শুরু করবে। ভোটের কাউন্টি হয় ১৪ থেকে ১৮ রাউন্ড। প্রথম ২-৩ রাউন্ড ওরা গণনা করবে প্ল্যান করেই, যাতে ছেলেদের মনোবল ভেঙে যায়, বিজেপির গু-ারা যেন সাহস পায়।”
তৃণমূলনেত্রীর সাফ কথা, “আমাদের লড়াইটা বিজেপির সঙ্গে ছিল না। আমাদের লড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, যিনি কালো ইতিহাস তৈরি করেছেন। এই নির্বাচনে ভিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারই। মানুষের অধিকার লুট করেছেন, ইভিএম লুট করেছেন। ভোটের পর ইভিএমে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চার্জ! কী করে সম্ভব? নির্বাচনের দুদিন আগে আমাদের লোকদের গ্রেপ্তার করল। সব জায়গায় তল্লাশি করল। আইসি, ওসি. এসডিও, ডিএম সব বদলে দিল। বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে সঙ্গে নিয়ে খেলাটা খেলল। বিজেপি আর কমিশনের গট আপ সেটিং।”
মমতার অভিযোগ, “সব পরিকল্পনা করে করা হয়েছে। ভোটের আগে আধিকারিকদের বদল করা হয়েছে। ভোটের দিন দুয়েক আগেই আমাদের একাধিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তর থেকে দক্ষিণে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকাতেই ছিল না, ছিল বিজেপি গুন্ডাদের দাপট। তৃণমূল কর্মীদের উপর ক্রমাগত অত্যাচার করা হয়েছে।”
তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, ‘“কাউন্টিং থেকে আমাকে মারতে মারতে বের করা হয়েছে। যেভাবে আমার উপর অত্যাচার হয়েছে, একজন মহিলা হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আমি ধারণা করতে পারি। প্রথমে আমার গাড়ি থামানো হয়, পরে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। পেটে লাথি, পিঠে ধাক্কা মারা হয়েছে। হিস্ট্রি উইল রিপিট। উই উইল বাউন্স ব্যাক।”
মমতা ইঙ্গিতপূর্ণভাবে জানান, “আমরা অ্যাকশন নেব, সেটা এখনই জানাচ্ছি না। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি তৈরি হবে।, যে কমিটিতে পাঁচ জন সাংসদ ছাড়াও আরও পাঁচ জন থাকবেন।’”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে মমতা বলেন, “ইন্ডিয়া জোটকে আরো শক্তিশালী করাই হবে লক্ষ্য। এখন আমি মুক্ত পাখি। মানুষের সেবায় কাজ করব। রাস্তায় ছিলাম। রাস্তায় থাকব।”
তিনি বলেন, “বিরোধী ঐক্য শক্তিশালী করতে বুধবার অখিলেশ আসছে। একে একে সবাই আসবে। সোনিয়াজি, রাহুলের সঙ্গে কথা হয়েছে।”
সংবাদ শিরোনাম
কারচুপির অভিযোগ: পরাজয় মেনে নেননি মমতা
-
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: - আপডেট সময় ১২:১৭:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- 412
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























