ঢাকা ০২:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় যুক্তরাজ্য : ব্রিটিশ হাইকমিশনার Logo ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলের সদর দপ্তর পরিদর্শন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের Logo ১৯ কার্গো এলএনজি আসছে ঘাটতির আশংকা নেই Logo দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের প্রতি সহায়তার আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo বিএনপি সরকারের উদ্যোগ : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু Logo বাংলাদেশের বিপক্ষে শক্তিশালী স্কোয়াড ঘোষণা করল অস্ট্রেলিয়া Logo ফোন নীরবে যে ৪ কাজ করে Logo ডেঙ্গু প্রতিরোধ ঘর থেকেই শুরু হোক Logo মনের জটিল জট খোলার মতো ১০টি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিনেমা

ফরিদপুরে আলুবোখারা চাষে হাবিবুরের বাজিমাত: স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিদেশি এই ফল

বিদেশি ও দামি মসলা জাতীয় ফল ‘আলুবোখারা’ চাষ করে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান। বোয়ালমারী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের লোকনাথ গ্রামের বাসিন্দা মৃত মকসেদ মোল্লার ছেলে হাবিবুর তার বাড়ির পাশে এই ফলের বাগান করে শুধু নিজেই সফল হননি, বরং পুরো এলাকায় সাড়া ফেলেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে তার এই অনন্য বাগান দেখতে এবং নিচ্ছেন চাষের পরামর্শ।
রাগ করে গাছ কেটেও আজ সফলতার শীর্ষে
কয়েক বছর আগে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২৫টি আলুবোখারার চারা পেয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। প্রথমে চাষপদ্ধতি ও পরিচর্যা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে রাগের মাথায় ১৮টি গাছ কেটেই ফেলেছিলেন তিনি। তবে ভাগ্যিস বাকি ৭টি গাছ রেখে দিয়েছিলেন! রোপণের দুই বছর পর থেকেই সেই গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করে। ৫ বছরের মাথায় এসে চলতি বছরে প্রতিটি গাছে এসেছে বাম্পার ফলন।
হাবিবুরের স্ত্রী মোসাম্মৎ জেসমিন বেগম জানান, গত এক-দেড় মাসে তারা প্রায় ৫ থেকে ৬ মণ আলুবোখারা বিক্রি ও বিলি করেছেন। এতেই আয় হয়েছে দেড় লাখ টাকার ওপরে। গাছে এখনো যে পরিমাণ ফল আছে, তাতে সব মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি। খরচ বাদে লাভের অঙ্কটা দাঁড়িয়েছে কয়েকগুণ।
বাজারে চড়া দাম ও ব্যাপক চাহিদা
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা ও পরিপক্ব আলুবোখারা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাবিবুর রহমান জানান, ফল সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করতে পারলে প্রতি কেজির দাম ১ হাজার টাকারও বেশি পাওয়া সম্ভব। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে খয়েরি ও কালো রঙের ঝুলে থাকা ফলগুলো দেখতে প্রতিদিন মানুষ ভিড় করছেন। অনেকে বাগান থেকেই সরাসরি কিনে নিচ্ছেন, আবার অনেকে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে সংগ্রহ করছেন।
হাবিবুরের ছেলে মো. জহির রহমান বলেন, “প্রথম দিকে আম্মু আর আমি ভাবতাম আব্বু এগুলো কী গাছ লাগাচ্ছেন! কিন্তু এখন প্রচুর ফলন আর চড়া দাম দেখে আমাদের পুরো পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে গেছে।”
ফলন ও পরিচর্যা পদ্ধতি
উপসহকারী কৃষি অফিসার অভিজিৎ বিশ্বাস জানান, পোলাও, বিরিয়ানি, আচার ও চাটনি তৈরিতে আলুবোখারা একটি অপরিহার্য উপাদান। এর পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়:
ফুল ও ফল আসার সময়: সাধারণত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে গাছে ফুল আসে এবং জুন মাসের দিকে ফল পুরোপুরি পরিপক্ব হয়।
রং ও বৈশিষ্ট্য: কাঁচা অবস্থায় ফলটি গাঢ় সবুজ থাকে। পাকলে উজ্জ্বল খয়েরি এবং পুরোপুরি পেকে গেলে কালো জামের মতো লালচে-কালো রঙ ধারণ করে। ফলটি অত্যন্ত নরম ও রসালো।
ফলন: ৫-৬ বছর বয়সী একটি গাছ থেকে গড়ে ১০-১৫ কেজি আলুবোখারা পাওয়া যায়। প্রতিটি ফলের ওজন হয় ১০-১২ গ্রাম।
মাটি ও পরিচর্যা: উঁচু জমি ও দোআঁশ মাটি যেখানে পানি জমে না, তা আলুবোখারা চাষের জন্য উপযুক্ত। সাধারণ সবজির মতোই এতে স্বল্প সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয়, বাড়তি কোনো ঝক্কি নেই।
নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে উদ্দীপনা
হাবিবুর রহমানের এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন স্থানীয় তরুণ ও অন্য চাষিরা। বাগান দেখতে আসা আব্দুর রহিম নামের এক তরুণ বলেন, “৩৩ বছর বয়সে জীবনে প্রথম আলুবোখারা গাছ ও ফল দেখলাম। কাঁচা খেতেও এটি দারুণ সুস্বাদু। আমিও দ্রুত এর বাগান শুরু করব।” আরেক সফল উদ্যোক্তা আকাশ সাহা বাগান পরিদর্শনে এসে নিজের পরিবারের জন্য আলুবোখারা কেনেন আচার তৈরির উদ্দেশ্যে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি অফিসার আলভীর রহমান বলেন, “ইরাক, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের কিছু এলাকায় আলুবোখারা চাষ হলেও এখন আমাদের দেশেও এর সফল চাষ সম্ভব হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে হাবিবুর রহমানকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান হাবিবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “একেবারে আনকমন একটি বাগান করে তিনি সফল হয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সবসময় তার পাশে থাকবে।”
উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান এই সামান্য কয়েকটি গাছের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এবার আরও বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আলুবোখারার বাগান তৈরির কার্যক্রম শুরু করেছেন। তার এই উদ্যোগ দেশের মসলা জাতীয় ফলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ফরিদপুরে আলুবোখারা চাষে হাবিবুরের বাজিমাত: স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিদেশি এই ফল

আপডেট সময় ০৯:৪৯:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বিদেশি ও দামি মসলা জাতীয় ফল ‘আলুবোখারা’ চাষ করে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান। বোয়ালমারী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের লোকনাথ গ্রামের বাসিন্দা মৃত মকসেদ মোল্লার ছেলে হাবিবুর তার বাড়ির পাশে এই ফলের বাগান করে শুধু নিজেই সফল হননি, বরং পুরো এলাকায় সাড়া ফেলেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে তার এই অনন্য বাগান দেখতে এবং নিচ্ছেন চাষের পরামর্শ।
রাগ করে গাছ কেটেও আজ সফলতার শীর্ষে
কয়েক বছর আগে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২৫টি আলুবোখারার চারা পেয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। প্রথমে চাষপদ্ধতি ও পরিচর্যা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে রাগের মাথায় ১৮টি গাছ কেটেই ফেলেছিলেন তিনি। তবে ভাগ্যিস বাকি ৭টি গাছ রেখে দিয়েছিলেন! রোপণের দুই বছর পর থেকেই সেই গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করে। ৫ বছরের মাথায় এসে চলতি বছরে প্রতিটি গাছে এসেছে বাম্পার ফলন।
হাবিবুরের স্ত্রী মোসাম্মৎ জেসমিন বেগম জানান, গত এক-দেড় মাসে তারা প্রায় ৫ থেকে ৬ মণ আলুবোখারা বিক্রি ও বিলি করেছেন। এতেই আয় হয়েছে দেড় লাখ টাকার ওপরে। গাছে এখনো যে পরিমাণ ফল আছে, তাতে সব মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি। খরচ বাদে লাভের অঙ্কটা দাঁড়িয়েছে কয়েকগুণ।
বাজারে চড়া দাম ও ব্যাপক চাহিদা
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা ও পরিপক্ব আলুবোখারা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাবিবুর রহমান জানান, ফল সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করতে পারলে প্রতি কেজির দাম ১ হাজার টাকারও বেশি পাওয়া সম্ভব। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে খয়েরি ও কালো রঙের ঝুলে থাকা ফলগুলো দেখতে প্রতিদিন মানুষ ভিড় করছেন। অনেকে বাগান থেকেই সরাসরি কিনে নিচ্ছেন, আবার অনেকে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে সংগ্রহ করছেন।
হাবিবুরের ছেলে মো. জহির রহমান বলেন, “প্রথম দিকে আম্মু আর আমি ভাবতাম আব্বু এগুলো কী গাছ লাগাচ্ছেন! কিন্তু এখন প্রচুর ফলন আর চড়া দাম দেখে আমাদের পুরো পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে গেছে।”
ফলন ও পরিচর্যা পদ্ধতি
উপসহকারী কৃষি অফিসার অভিজিৎ বিশ্বাস জানান, পোলাও, বিরিয়ানি, আচার ও চাটনি তৈরিতে আলুবোখারা একটি অপরিহার্য উপাদান। এর পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়:
ফুল ও ফল আসার সময়: সাধারণত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে গাছে ফুল আসে এবং জুন মাসের দিকে ফল পুরোপুরি পরিপক্ব হয়।
রং ও বৈশিষ্ট্য: কাঁচা অবস্থায় ফলটি গাঢ় সবুজ থাকে। পাকলে উজ্জ্বল খয়েরি এবং পুরোপুরি পেকে গেলে কালো জামের মতো লালচে-কালো রঙ ধারণ করে। ফলটি অত্যন্ত নরম ও রসালো।
ফলন: ৫-৬ বছর বয়সী একটি গাছ থেকে গড়ে ১০-১৫ কেজি আলুবোখারা পাওয়া যায়। প্রতিটি ফলের ওজন হয় ১০-১২ গ্রাম।
মাটি ও পরিচর্যা: উঁচু জমি ও দোআঁশ মাটি যেখানে পানি জমে না, তা আলুবোখারা চাষের জন্য উপযুক্ত। সাধারণ সবজির মতোই এতে স্বল্প সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয়, বাড়তি কোনো ঝক্কি নেই।
নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে উদ্দীপনা
হাবিবুর রহমানের এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন স্থানীয় তরুণ ও অন্য চাষিরা। বাগান দেখতে আসা আব্দুর রহিম নামের এক তরুণ বলেন, “৩৩ বছর বয়সে জীবনে প্রথম আলুবোখারা গাছ ও ফল দেখলাম। কাঁচা খেতেও এটি দারুণ সুস্বাদু। আমিও দ্রুত এর বাগান শুরু করব।” আরেক সফল উদ্যোক্তা আকাশ সাহা বাগান পরিদর্শনে এসে নিজের পরিবারের জন্য আলুবোখারা কেনেন আচার তৈরির উদ্দেশ্যে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি অফিসার আলভীর রহমান বলেন, “ইরাক, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের কিছু এলাকায় আলুবোখারা চাষ হলেও এখন আমাদের দেশেও এর সফল চাষ সম্ভব হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে হাবিবুর রহমানকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান হাবিবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “একেবারে আনকমন একটি বাগান করে তিনি সফল হয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সবসময় তার পাশে থাকবে।”
উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান এই সামান্য কয়েকটি গাছের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এবার আরও বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আলুবোখারার বাগান তৈরির কার্যক্রম শুরু করেছেন। তার এই উদ্যোগ দেশের মসলা জাতীয় ফলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।