ঢাকা ০১:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo পুঁজিবাজার প্রাতিষ্ঠানিক ও পুরোপুরি কাগজবিহীন করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর Logo ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের শক্তি : মাহদী আমিন Logo রাজনৈতিক পরিচয়ে কারো প্রতি বৈষম্য হবে না : ৪৯তম বিসিএস প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo শাপলা এখন শরীয়তপুরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকায়নের অংশ Logo বিনিয়োগ, এলএনজি সরবরাহ ও দক্ষতা উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দেশে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে: প্রধানমন্ত্রী Logo দল ছেড়ে ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় রোনালদো Logo কতদিন পরপর ফোন বদলাবেন? Logo মিষ্টি ভালো লাগলেও কম খাবেন যারা Logo ‘দুনিয়াদারি হোক যাই ভেতরে রবের জিকির চাই’, মিশা সওদাগর

যে কোন মূল্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে বুঝতে হবে যুদ্ধ ক্ষতি ছাড়া কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনা। এতে নিজেদের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি বিশ্বেরও ক্ষতি হয়। মানবতার বিপর্যয় ঘটে। বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, সে নিজে যুদ্ধে জড়িয়ে কখনো বিজয় অর্জন করতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় নিয়ে তাকে ফিরতে হয়েছে। আফগানিস্তানে বিশ বছর যুদ্ধ করে রাতের রাতের আঁধারে পালিয়ে আসতে হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের নামে মুসলমান নিধনে সফল হতে পারেনি। ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প নিজে তার অনুসারিদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন। তারা ট্রাম্পের এই হুমকিকে ৯ কোটি মানুষের একটা দেশকে ধ্বংস করার যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ট্রাম্পের এই হুমকিকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলেছেন। এখন বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য যুদ্ধ বন্ধের অন্যকোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বিষয়টি উপলব্ধি করেছে, তেমনি ইরানও উপলব্ধি করেছে। শান্তি আলোচনাকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে যেসব সমস্যা আলোচনাকে অনিশ্চিয়তার দোলাচালে ফেলেছে, তা আলাপ-আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এ ব্যাপারে রিজিড বা গোঁ ধরে বসে থাকলে হবে না। তাতে কোনো পক্ষের লাভ হবে না। উভয় পক্ষেরই ছাড়ের মানসিকতা থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বিপাকে পড়ে যুদ্ধবিরতির জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে, তেমনি ইরানকেও বুঝতে হবে, এ যুদ্ধের মাপকাঠিতে ইরান যে জিতেছে, তা সারাবিশ্ব জানে। ফলে উভয় পক্ষকেই সংযত ও সংযমের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের উপর সর্বাত্মক হামলা চালায়। ইরান প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটিসহ ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালায়। ইরান একাই দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারণা ছিল, এই যৌথ হামলায় ইরান দ্রুত ভেঙে পড়বে এবং যুদ্ধ স্বল্প সময়ে শেষ হয়ে যাবে। তাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণ করে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক ঘাঁটিসহ ইসরাইলে এমন হামলা শুরু করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো রকমে যুদ্ধ থেকে পালাতে বা বের হওয়ার জন্য পথ খুঁজতে বাধ্য হন। ঘাঁটিগুলো এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প একদিকে মুখে বড় বড় কথা বলে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে আসছিলেন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে যুদ্ধবিরতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রা¤প প্রশাসন পাকিস্তানকে বলে আসছিল, যাতে সে ইরানকে বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর ব্যবস্থা করে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। পাকিস্তান মুসলিম দেশ এবং ইরানের প্রতিবেশী হওয়ায় ওয়াশিংটন মনে করে, তার মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সেটা সহজে মেনে নেবে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই গোপন তৎপরতা চালান। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার ফোনে কথা বলেন। এরপর তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করেন। গত মঙ্গলবার রাতে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। অথচ এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রা¤প হুমকি দিয়েছিলেন, তার কথা না শুনলে ইরানের পুরো সভ্যতা ধূলিস্যাৎ করে দেবেন। যুদ্ধবিরতির নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেই শান্তি আলোচনায় বসার জন্য পাকিস্তান প্রস্তুতি নিয়েছে। ইসলামাবাদে গতকাল শুক্রবার বা আজ শনিবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদের শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানে ইরানি রাষ্ট্রদূত সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, বৃহ¯পতিবার রাতের মধ্যে তাদের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। পরে সেই পোস্ট ডিলিট করে দেয়া হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি সফরে আছেন। তারও পাকিস্তানে পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট সূচি নিশ্চিত করেনি হোয়াইট হাউস। এদিকে, সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, লেবাননে ইসরাইলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানে কোনো শান্তি আলোচনায় অংশ নেবেনা ইরান। সংস্থাটি জানায়, ইরানের কোনো আলোচক দল ইসলামাবাদে পৌঁছায়নি এবং আলোচনায় যোগ দেয়ারও পরিকল্পনা নেই। কিছু মার্কিন গণমাধ্যমে ইরানি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে পৌঁছেছে এমন খবরও তারা নাকচ করেছে। ফার্স নিউজের দাবি, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামাবাদে আলোচনায় না বসার বিষয়ে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে তেহরান। উল্লেখ্য, শান্তি আলোচনায় তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তার দেয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ওপর ইসলামাবাদের বৈঠকে আলোচনা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ১৫ দফা তুলে ধরবে। এখন পুরো বিশ্ব যুদ্ধবিরতির আলোচনা অনুষ্ঠান সফল হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এটা এখন পরিস্কার, ইহুদীদের প্রতিনিধিত্ব করা ইসরাইল এবং খ্রিস্টানদের প্রতিনিধিত্ব করা যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নামে মূলত মুসলমান নিধন মিশন নিয়ে বহু আগেই নেমেছে। একশ্রেণীর মার্কিন বুদ্ধিজীবী মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সেটি নবম ক্রুসেড। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মিকি ওয়েইনস্টেইন বলেন, এগারো থেকে তেরো শতক পর্যন্ত আটটি ক্রুসেড হয়েছিল। আমরা এখন এর নবম সংস্করণ দেখছি। আরব উপদ্বীপে বোকো হারাম, ইসলামিক স্টেট, তালেবান, আলকায়দাÑ তারা শিয়া বা সুন্নি, যাই হোক না কেন, সবাই এটাকে এমনভাবেই দেখবে যে, আমরা বিশাল মুসলিম জাতির ওপর হামলা করছি। তার এ কথা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ইরানে হামলার নেপথ্যে রয়েছে, হামলা চালিয়ে নির্বিচারে মুসলমান নিধন। ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিন এবং লেবাননে হামলা চালিয়ে মুসলমান নিধন করে চলেছে। গাজায় দীর্ঘদিন নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। এখনো সেখানে হত্যা অব্যাহত আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকেও ইরানযুদ্ধে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা তার আহ্বান সাড়া না দিলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ন্যাটো যদি তার কোনো কাজে না লাগে, তাহলে এমন জোটের সদস্য থেকে লাভ কি! যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে সমগ্র পরাশক্তিদের নিয়ে ইরান তথা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন, তা তাদের পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়। তবে ইরানে হামলা চালিয়ে তারা বুঝে গেছে, এটা এত সহজ নয়। ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েও পাল্টা হামলা চালিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, তাকে ধ্বংস করা যাবে না। ফলে ভয়ংকর আগ্রাসী হয়েও লক্ষ্য অর্জন করতে না পেরে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেজ গুটিয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তান নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে বহু আগে থেকেই নেপথ্যে জোরালো কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনীর মধ্যস্থতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। শেহবাজ শরীফ যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, তুরস্ক, মিশর, চীন, রাশিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সাথে নিরন্তর কথা বলেন এবং সফল হন। তার এই ভূমিকা দেশ এবং বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রা¤প তাদের নাম উল্লেখ করে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ইরানও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, নেপথ্যে চীন ও রাশিয়া তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে যায় এমন এক প্রস্তাবে উভয় দেশ ভেটো দেয়ায় তা ভেঙে যায়। অন্যদিকে, মুসলমান নিধন তথা ইরানে ইসরাইলের হামলার ইন্ধন ভারতও দিয়ে আসছিল। যুদ্ধ শুরুর দুইদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইল সফর করেছিলেন। মোদি ও নেতানিয়াহু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেছিলেন। এতে মোদি নিজ দেশেই সমালোচিত হয়েছেন। বিরোধীদলের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, মোদির কারণে ভারত বিশ্বদরবারে ধিক্কৃত হচ্ছে। এখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় যুদ্ধে অংশ না নিয়েও ভারত ঠকে গেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। আমরা মনে করি, যুদ্ধ কোন দিন কোন সমস্যার সমাধান নয়। তাই যে কোন মূল্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

পুঁজিবাজার প্রাতিষ্ঠানিক ও পুরোপুরি কাগজবিহীন করার আহ্বান অর্থমন্ত্রীর

যে কোন মূল্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে

আপডেট সময় ০৩:৩৮:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে বুঝতে হবে যুদ্ধ ক্ষতি ছাড়া কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনা। এতে নিজেদের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি বিশ্বেরও ক্ষতি হয়। মানবতার বিপর্যয় ঘটে। বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, সে নিজে যুদ্ধে জড়িয়ে কখনো বিজয় অর্জন করতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় নিয়ে তাকে ফিরতে হয়েছে। আফগানিস্তানে বিশ বছর যুদ্ধ করে রাতের রাতের আঁধারে পালিয়ে আসতে হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের নামে মুসলমান নিধনে সফল হতে পারেনি। ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প নিজে তার অনুসারিদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন। তারা ট্রাম্পের এই হুমকিকে ৯ কোটি মানুষের একটা দেশকে ধ্বংস করার যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ট্রাম্পের এই হুমকিকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলেছেন। এখন বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য যুদ্ধ বন্ধের অন্যকোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বিষয়টি উপলব্ধি করেছে, তেমনি ইরানও উপলব্ধি করেছে। শান্তি আলোচনাকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে যেসব সমস্যা আলোচনাকে অনিশ্চিয়তার দোলাচালে ফেলেছে, তা আলাপ-আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এ ব্যাপারে রিজিড বা গোঁ ধরে বসে থাকলে হবে না। তাতে কোনো পক্ষের লাভ হবে না। উভয় পক্ষেরই ছাড়ের মানসিকতা থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বিপাকে পড়ে যুদ্ধবিরতির জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে, তেমনি ইরানকেও বুঝতে হবে, এ যুদ্ধের মাপকাঠিতে ইরান যে জিতেছে, তা সারাবিশ্ব জানে। ফলে উভয় পক্ষকেই সংযত ও সংযমের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের উপর সর্বাত্মক হামলা চালায়। ইরান প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটিসহ ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালায়। ইরান একাই দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারণা ছিল, এই যৌথ হামলায় ইরান দ্রুত ভেঙে পড়বে এবং যুদ্ধ স্বল্প সময়ে শেষ হয়ে যাবে। তাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণ করে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক ঘাঁটিসহ ইসরাইলে এমন হামলা শুরু করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো রকমে যুদ্ধ থেকে পালাতে বা বের হওয়ার জন্য পথ খুঁজতে বাধ্য হন। ঘাঁটিগুলো এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প একদিকে মুখে বড় বড় কথা বলে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে আসছিলেন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে যুদ্ধবিরতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রা¤প প্রশাসন পাকিস্তানকে বলে আসছিল, যাতে সে ইরানকে বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর ব্যবস্থা করে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। পাকিস্তান মুসলিম দেশ এবং ইরানের প্রতিবেশী হওয়ায় ওয়াশিংটন মনে করে, তার মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠালে ইরান সেটা সহজে মেনে নেবে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই গোপন তৎপরতা চালান। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার ফোনে কথা বলেন। এরপর তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করেন। গত মঙ্গলবার রাতে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। অথচ এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রা¤প হুমকি দিয়েছিলেন, তার কথা না শুনলে ইরানের পুরো সভ্যতা ধূলিস্যাৎ করে দেবেন। যুদ্ধবিরতির নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেই শান্তি আলোচনায় বসার জন্য পাকিস্তান প্রস্তুতি নিয়েছে। ইসলামাবাদে গতকাল শুক্রবার বা আজ শনিবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদের শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানে ইরানি রাষ্ট্রদূত সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, বৃহ¯পতিবার রাতের মধ্যে তাদের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। পরে সেই পোস্ট ডিলিট করে দেয়া হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি সফরে আছেন। তারও পাকিস্তানে পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট সূচি নিশ্চিত করেনি হোয়াইট হাউস। এদিকে, সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, লেবাননে ইসরাইলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানে কোনো শান্তি আলোচনায় অংশ নেবেনা ইরান। সংস্থাটি জানায়, ইরানের কোনো আলোচক দল ইসলামাবাদে পৌঁছায়নি এবং আলোচনায় যোগ দেয়ারও পরিকল্পনা নেই। কিছু মার্কিন গণমাধ্যমে ইরানি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে পৌঁছেছে এমন খবরও তারা নাকচ করেছে। ফার্স নিউজের দাবি, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামাবাদে আলোচনায় না বসার বিষয়ে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে তেহরান। উল্লেখ্য, শান্তি আলোচনায় তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তার দেয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ওপর ইসলামাবাদের বৈঠকে আলোচনা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ১৫ দফা তুলে ধরবে। এখন পুরো বিশ্ব যুদ্ধবিরতির আলোচনা অনুষ্ঠান সফল হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এটা এখন পরিস্কার, ইহুদীদের প্রতিনিধিত্ব করা ইসরাইল এবং খ্রিস্টানদের প্রতিনিধিত্ব করা যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নামে মূলত মুসলমান নিধন মিশন নিয়ে বহু আগেই নেমেছে। একশ্রেণীর মার্কিন বুদ্ধিজীবী মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সেটি নবম ক্রুসেড। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মিকি ওয়েইনস্টেইন বলেন, এগারো থেকে তেরো শতক পর্যন্ত আটটি ক্রুসেড হয়েছিল। আমরা এখন এর নবম সংস্করণ দেখছি। আরব উপদ্বীপে বোকো হারাম, ইসলামিক স্টেট, তালেবান, আলকায়দাÑ তারা শিয়া বা সুন্নি, যাই হোক না কেন, সবাই এটাকে এমনভাবেই দেখবে যে, আমরা বিশাল মুসলিম জাতির ওপর হামলা করছি। তার এ কথা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ইরানে হামলার নেপথ্যে রয়েছে, হামলা চালিয়ে নির্বিচারে মুসলমান নিধন। ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিন এবং লেবাননে হামলা চালিয়ে মুসলমান নিধন করে চলেছে। গাজায় দীর্ঘদিন নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। এখনো সেখানে হত্যা অব্যাহত আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকেও ইরানযুদ্ধে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা তার আহ্বান সাড়া না দিলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ন্যাটো যদি তার কোনো কাজে না লাগে, তাহলে এমন জোটের সদস্য থেকে লাভ কি! যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে সমগ্র পরাশক্তিদের নিয়ে ইরান তথা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন, তা তাদের পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়। তবে ইরানে হামলা চালিয়ে তারা বুঝে গেছে, এটা এত সহজ নয়। ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েও পাল্টা হামলা চালিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, তাকে ধ্বংস করা যাবে না। ফলে ভয়ংকর আগ্রাসী হয়েও লক্ষ্য অর্জন করতে না পেরে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেজ গুটিয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তান নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে বহু আগে থেকেই নেপথ্যে জোরালো কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনীর মধ্যস্থতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। শেহবাজ শরীফ যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, তুরস্ক, মিশর, চীন, রাশিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সাথে নিরন্তর কথা বলেন এবং সফল হন। তার এই ভূমিকা দেশ এবং বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রা¤প তাদের নাম উল্লেখ করে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ইরানও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, নেপথ্যে চীন ও রাশিয়া তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে যায় এমন এক প্রস্তাবে উভয় দেশ ভেটো দেয়ায় তা ভেঙে যায়। অন্যদিকে, মুসলমান নিধন তথা ইরানে ইসরাইলের হামলার ইন্ধন ভারতও দিয়ে আসছিল। যুদ্ধ শুরুর দুইদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইল সফর করেছিলেন। মোদি ও নেতানিয়াহু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করেছিলেন। এতে মোদি নিজ দেশেই সমালোচিত হয়েছেন। বিরোধীদলের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, মোদির কারণে ভারত বিশ্বদরবারে ধিক্কৃত হচ্ছে। এখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় যুদ্ধে অংশ না নিয়েও ভারত ঠকে গেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। আমরা মনে করি, যুদ্ধ কোন দিন কোন সমস্যার সমাধান নয়। তাই যে কোন মূল্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।